পাহাড়ি ঢল ও বৃষ্টিতে তলিয়ে যাচ্ছে হাওরের ধান: কাটতে না পেরে দিশেহারা কৃষক
টানা বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে সিলেট অঞ্চলের হাওরগুলোতে বোরো ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে। চোখের সামনে পাকা ফসল তলিয়ে যেতে দেখে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন হাওরাঞ্চলের কৃষকরা। শ্রমিকের অভাব, বৈরী আবহাওয়া এবং জলাবদ্ধতার কারণে অনেক স্থানে ধান কাটা সম্ভব হচ্ছে না। এদিকে, ফসলের ক্ষয়ক্ষতি ও ধান কাটার হার নিয়ে সরকারি পরিসংখ্যানের সঙ্গে কৃষকদের দেওয়া তথ্যের ব্যাপক গরমিল পরিলক্ষিত হচ্ছে।
সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলার ভাণ্ডাবিল হাওরের কৃষক ঝন্টু দাস ৩০ শতকের ৮ কিয়ার জমিতে ধান চাষ করেছিলেন। অর্ধেক ধান কাটতে পারলেও বাকিটা পানির নিচে। ঝন্টু দাস বলেন, "হাওরটি জলে ডুবে আছে। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে শ্রমিকরা ধান কাটতে পারছেন না। ক্ষেতে মেশিনও নামছে না। ফলে এই ধান আর কাটা সম্ভব হবে না। কয়েকদিন পানিতে থাকলেই পচে যাবে। এবার ধান লাগানোর খরচই উঠবে না। আর ধান না পেলে সারা বছর খাবো কী?"
একই আক্ষেপ হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ উপজেলার গুঙ্গিয়াজুড়ি হাওরের কৃষক মতিন মিয়ার। তিনি বলেন, "কেবল ধান কাটা শুরু করেছিলাম। এর মধ্যে ঢল নেমে সব পানির নিচে চলে গেল। ঋণ করে চাষ করেছি, এখন সেই টাকা শোধ করব কীভাবে আর সংসার চালাবো কী করে?"
সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলার জাতগাঁও গ্রামের কৃষক রায়হান উদ্দিন বলেন, "অর্ধেকের বেশি ক্ষেতের ধান পানিতে ডুবে যাচ্ছে। কাটানোর শ্রমিক পাচ্ছি না। যা কাটিয়েছিলাম তা পানিতে এসে নষ্ট করে দিচ্ছে। শুকাতেও পারছি না। এবার ভয়াবহ খারাপ অবস্থার মধ্যে পড়েছি।"
পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)-এর তথ্য অনুযায়ী, সিলেটের সুরমা, কুশিয়ারা, পিয়াইন ও সারিগোয়াইন নদীর পানি সমতল বৃদ্ধি পাচ্ছে। সুনামগঞ্জে গত ২৪ ঘণ্টায় সুরমা নদীর পানি পৌর শহরের ষোলঘর পয়েন্টে ৫০ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়েছে। মৌলভীবাজারের মনু নদী বিপৎসীমার ৭২ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
সিলেট পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী দীপক রঞ্জন দাস বলেন, "পাহাড়ি ঢল ও দেশের অভ্যন্তরে বৃষ্টিপাতে পানি বাড়ছে। উজানে বৃষ্টিবলয় আছে ও বৃষ্টিপাত হচ্ছে, তাই নদ-নদীর পানি আরও বৃদ্ধি পাবে। তবে নদীগুলো এখনও বিপদসীমার নিচে রয়েছে।"
সুনামগঞ্জ পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন হাওলাদার জানান, ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত পাহাড়ি ঢল ও ভারী বর্ষণে বন্যার আশঙ্কা রয়েছে। ১১০টি ক্লোজার বা বাঁধ নিয়ে ঝুঁকি রয়েছে। ভারী বর্ষণে হাওরে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হওয়ার কথা তিনি স্বীকার করেন। বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের কর্মকর্তা পার্থ প্রতীম বড়ুয়া জানিয়েছেন, নেত্রকোণা ও মৌলভীবাজারের বন্যা পরিস্থিতি অব্যাহত থাকতে পারে এবং হবিগঞ্জ, সিলেট ও সুনামগঞ্জে বন্যা ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
কৃষি বিভাগের ধান কাটার পরিসংখ্যান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন হাওর আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ। সরকারি হিসাবে সুনামগঞ্জে ৪৫ শতাংশ ধান কাটা হয়েছে বলা হলেও মাঠের চিত্র ভিন্ন। গত ২৭ এপ্রিল বজ্রপাতে ৩ কৃষকসহ সম্প্রতি মোট ৮ জনের মৃত্যুর পর শ্রমিকরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন, যার ফলে ধান কাটার গতি কমে গেছে।
সুনামগঞ্জ হাওর, নদী ও পরিবেশ রক্ষা আন্দোলনের সভাপতি মিজানুর রহমান বলেন, "জলাবদ্ধতায় অন্তত ৩০ হাজার হেক্টর জমির বোরো ধান নষ্ট হয়ে গেছে। কিন্তু কৃষি বিভাগের পরিসংখ্যানে ক্ষতির পরিমাণ অল্প দেখানো হচ্ছে। তারা বলছে ৫০-৬০ ভাগ ধান কাটা শেষ, যা কোনোভাবেই সঠিক নয়।"
হাওর বাঁচাও আন্দোলনের সহসভাপতি অধ্যাপক চিত্তরঞ্জন তালুকদার বলেন, "পাকা ফসল জলাবদ্ধতায় পচছে, কাটা ধানও পানিতে তলিয়ে নষ্ট হচ্ছে। কিন্তু স্থানীয় কর্তৃপক্ষের কম ক্ষয়ক্ষতির পরিসংখ্যানের কারণে কৃষকরা সরকারি সহায়তা বা ভর্তুকি থেকে বঞ্চিত হবেন। সরকারি কাগজের কলমের তথ্যের সঙ্গে বাস্তবতার মিল নেই।"
তবে সুনামগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. ওমর ফারুক বলেন, "মাঠ পর্যায়ের কর্মীরা তথ্য নিয়েই প্রতিবেদন দিচ্ছেন। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া ও শ্রমিক সংকটের বিষয়টি আমাদের বিবেচনায় আছে।"
সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জ উপজেলায় বোরো ধান কাটতে সহায়তার জন্য রাজনৈতিক দল, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ সর্বস্তরের মানুষের প্রতি অফিসিয়াল চিঠি দিয়ে আহ্বান জানিয়েছেন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আহসান হাবীব। তিনি বলেন, "শ্রমিক সংকট কাটাতে সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এই সংকট মোকাবিলা করতে হবে।" এদিকে জামালগঞ্জে এক কৃষাণীর ধান কেটে দিয়ে সহায়তার হাত বাড়িয়েছে আনসার বাহিনী।
টানা বৃষ্টি ও ঢলে মৌলভীবাজারের কাউয়াদিঘি হাওরেও ধান তলিয়ে গেছে। রাজনগর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আব্দুল্লা আল আমিন জানান, হাওরের ৩২৫ হেক্টর বোরো ধান নিমজ্জিত হয়েছে এবং ৬২ শতাংশ ধান কাটা শেষ হয়েছে। তবে কৃষকরা বলছেন ক্ষতির পরিমাণ আরও বেশি।
রাজনগরের ভুরভুরি বিল পারের কৃষক কয়ছর মিয়া বলেন, "খাল ভরাট হয়ে যাওয়ায় প্রতিবছর জলাবদ্ধতায় ধান নষ্ট হয়। ভুরিজোড়ি খাল খনন না করলে ফসল রক্ষা করা যাবে না।" জগন্নাথপুরের কৃষক নেছার মিয়া জানান, হাঁটু সমান পানিতে নেমে ধান কাটতে হচ্ছে। "শ্রমিক ও তেল সংকটের পর এখন পানি ঢুকে সব শেষ। মায়ার কারণে কষ্টের ফসল নষ্ট হলেও ঘরে তুলছি।"
মৌলভীবাজার পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী খালেদ বিন অলিদ বলেন, "নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ না থাকায় আমরা সেচ পাম্প দিয়ে ধারাবাহিকভাবে পানি সেচ দিতে পারছি না। বিদ্যুৎ পাওয়া সাপেক্ষে সেচ কাজ অব্যাহত আছে।"
