হাওর অঞ্চলের ৩৭ শতাংশ ধান এখনও কাটা হয়নি: কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর
টানা ভারী বৃষ্টিপাত ও পাহাড়ি ঢলে হাওরাঞ্চলের নদ-নদীর পানি বাড়ছে। সেইসাথে বাড়ছে বোরো ধান নিয়ে কৃষকের দীর্ঘশ্বাস। এখনো ৩৭ শতাংশ বোরো ধান কৃষক কাটতে পারেননি বলে জানিয়েছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। তবে স্থানীয় কৃষকরা এই তথ্যের নির্ভুলতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলছেন, বাস্তবে না কাটা ধানের পরিমাণ আরও অনেক বেশি।
দেশের বেশিরভাগ চাল উৎপাদন হয় বোরো মৌসুমে। এর প্রায় ২০ শতাংশই উৎপাদন হয় হাওরভুক্ত সাত জেলায়। এবার ৫০ লাখ হেক্টর জমিতে ২ কোটি ২৭ লাখ টন চাল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। সুনামগঞ্জ, সিলেট, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া— হাওরভুক্ত এ সাত জেলায় এবার ৯.৬৩ লাখ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের চাষাবাদ হয়েছে। এরমধ্যে হাওরে ৪.৫৫ লাখ হেক্টর জমিতে ধান চাষ হয়েছে।
হাওরে আবাদকৃত জমির মধ্যে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ৬৩ শতাংশ কর্তন হয়েছে। অর্থাৎ এখনো প্রায় ৩৭ শতাংশ জমির ধান কৃষক কাটতে পারেননি। এর মধ্যে হবিগঞ্জে ৪৫ শতাংশ, কিশোরগঞ্জে ৪৭ শতাংশ, সুনামগঞ্জে ৩৮ শতাংশ ও নেত্রকোনায় ৩৫ শতাংশ ধান এখনো মাঠে রয়েছে। বাকি জমির মধ্যে ৮৮ হাজার হেক্টর নিচু এলাকার ঝুঁকিপূর্ণ জমি। এরইমধ্যে ২৮ হাজার হেক্টর জমির ধান পানির মধ্যে নিমজ্জিত হয়েছে। সিলেট বিভাগে নিমজ্জিত হয়েছে ১৩ হাজার ৫৪১ হেক্টর জমি।
আগের চেয়ে বৃষ্টি কমে এলেও পানি বাড়ছে। ধান কাটা এবং শুকানোর জন্য দ্বিগুণ মজুরি দিয়েও শ্রমিক খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। আর জমির কাদামাটির কারণে হারভেস্টর ব্যবহারের সুযোগ নেই। আবার এই কদিন বৃষ্টির কারণে কেটে আনা ধানেও পচন ধরেছে।
কৃষক ও স্থানীয় সংগঠনগুলো বলছে, সরকার যে ক্ষয়ক্ষতির তথ্য দিচ্ছে, বাস্তবে ক্ষতি এর চেয়ে অনেক বেশি। বন্যা ও পাহাড়ি ঢলের কারণে শুধু সিলেট বিভাগের হাওরাঞ্চলেই প্রায় ৪০ হাজার হেক্টর জমির ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। হাওর নিয়ে কাজ করা পরিবেশকর্মী কাসমির রেজা বলেন, টাকার অংকে এ ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা। সরকারের দেওয়া ধান কাটার পরিসংখ্যান নিয়েও দ্বিমত পোষণ করেন কাসমির রেজা। তিনি বলেন, এ পর্যন্ত মাত্র ৩৫-৩৮ শতাংশ ধান কাটা হয়েছে। তিনি অভিগ করেন, 'কৃষি অফিস সবসময়ই কাটার পরিমাণ বাড়িয়ে ও ক্ষতির পরিমাণ কমিয়ে দেখায়। প্রকৃত চিত্র আরও খারাপ।'
এদিকে ক্ষতির পরিসংখ্যান নিয়ে কৃষকরাও কর্তৃপক্ষের তথ্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেছেন। সুনামগঞ্জের তাহিরপুরের কৃষক পরিন্দ্র বিশ্বাস বলেন, কৃষি অফিস তো কেবল তলিয়ে যাওয়া জমির হিসেব করছে, কিন্তু যে ধান কেটে আনা হয়েছে তা-ও তো অনেকগুলা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। রোদের অভাবে শুকানো যাচ্ছে না।
শাল্লা উপজেলার ছায়ার হাওরের কৃষক রথীন্দ্র চন্দ্র সরকার বলেন, তিনি তার এক-তৃতীয়াংশ জমিত ধান কাটতে পেরেছেন, বাকি জমির পাকা ধান পানির নিচে। আবার কেটে আনা ধানও শুকাতে পারছেন না। এখন তার ধানে চারা গজাচ্ছে। এগুলো আর কোনো কাজে আসবে না।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, সিলেট বিভাগীয় কার্যালয়ের অতিরিক্ত পরিচালক মো. মোশাররফ হোসেন বলেন, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এখনো চূড়ান্ত হয়নি। পানি বাড়লে ক্ষতি আরও বাড়তে পারে। আবার পানি দ্রুত কমে গেলে নিমজ্জিত জমির সব ধানও নষ্ট হবে না।
তিনি আরও বলেন, এত ধান একসাথে শুকানোর কোনো কৃত্রিম ব্যবস্থা নেই। প্রকৃতির ওপরই তাই নির্ভর করতে হয়। কিছু ধান মিল মালিকরা কিনে নিলে কৃষকের ক্ষতি কিছুটা কমত। কিন্তু এখন পর্যন্ত মিল মালিকরা ধান কেনা শুরু করেননি।
ক্ষয়ক্ষতি বাড়াচ্ছে শ্রমিক সংকট
হাওরাঞ্চলে সাধারণত টাকার বিনিময়ে বা ধানের বিনিময়ে শ্রমিকরা ধান কাটার কাজ করেন। সময় ও ক্ষেত্র বিশেষে কাটা ধানের ছয় বা সাত ভাগের এক ভাগ ধান শ্রমিককে দিতে হয়।
তবে দুর্যোগ মূহূর্তে শ্রমিককে উৎপাদিত ধানের অর্ধেক অংশ দিয়েও ধান কাটানো হয়, যাকে স্থানীয় ভাষায় 'নয়নভাগা' বলে। তবে স্থানীয় কৃষকরা বলছেন, এবার নয়নভাগা দিয়েও শ্রমিক মিলছে না।
বৃহস্পতিবার বিশ্বম্ভরপুর করচার হাওর এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, বৃষ্টি থামায় ধান শুকানোর চেষ্টা করছেন কৃষক ও কৃষাণিরা। বাড়ির ছোট শিশুরাও বড়দের সাহায্য করছে এ কাজে। ধান শুকানোর কাজে ব্যস্ত থাকা কৃষক হোসনা বেগম বলেন, 'এই কদিন বৃষ্টির কারণে কেটে আনা ধানেও পচন ধরেছে। আজ বৃষ্টি থামলেও এগুলো শুকানোর জন্য শ্রমিক পাচ্ছি না। তাই বাড়ির সবাই মিলে কাজে লেগেছি।'
কৃষক মঞ্জুর আহমেদ জানান, তার ১.৮৯ একর জমির মধ্যে মাত্র ০.৫৪ একর জমির ধান এখন পানির ওপরে আছে। কিন্তু শ্রমিক সংকটের কারণে এই ধানও কাটতে পারছেন না। শ্রমিকরা সাধারণত দৈনিক ৭০০-৮০০ টাকা মজুরিতে ধান কাটার কাজ করেন। কিন্তু তিনি ১ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত প্রস্তাব দিয়েও কোনো শ্রমিক পাচ্ছেন না। 'হাওরের পানি যেভাবে বাড়ছে, আরও দুই দিন অপেক্ষা করলেও এখনও পানির ওপরে জমিও তলিয়ে যাবে,' বলেন তিনি।
সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, সিলেট বিভাগীয় কার্যালয়ের অতিরিক্ত পরিচালক মোশাররফ হোসেন বলেন, গত কয়েক বছরে হাওর অঞ্চলের ধান কাটা শ্রমিক থেকে যন্ত্রনির্ভর হয়ে পড়েছিল। কিন্তু এবার আগেভাগে বৃষ্টি শুরু হওয়ায় ঝামেলা তৈরি হয়েছে।
তিনি বলেন, 'পানির কারণে হারভেস্টার মেশিন হাওরে নামতে পারছে না। আবার একসাথে সব ধান কেটে আনার মতো এত শ্রমিকও নেই। আগে অন্যান্য জেলা থেকে মৌসুমি শ্রমিক আনানো হতো। কিন্তু যন্ত্রনির্ভরতার কারণে এবার তা-ও করা হয়নি।'
নদ-নদীর পানি বাড়ছেই
এদিকে হাওরে নদ-নদীর পানির পরিমাণ বাড়ছে। এতে এই অঞ্চলজুড়ে বাড়ছে বন্যার শঙ্কা।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওর এলাকায় নেত্রকোনা ও হবিগঞ্জ জেলার চারটি নদীর পাঁচটি স্টেশনে পানি প্রাক-মৌসুমি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এর মধ্যে নেত্রকোনা জেলার ভুগাই-কংস নদীর জারিয়াজাঞ্জইল পয়েন্টে পানি বিপৎসীমার প্রায় ১০০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে বইছে। এছাড়া এ জেলার সোমেশ্বরীর কমলাকান্দা, মগরার নেত্রকোনা ও আটপাড়া এবং হবিগঞ্জ জেলার সুতাং নদীর সুতাং-রেলওয়ে ব্রিজ পয়েন্টেও প্রাক-মৌসুমী বিপদসীমার উপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে।
উজান ও অভ্যন্তরীণ অঞ্চলে মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে সুরমা-কুশিয়ারা ও ধনু-বাউলাই নদীর পানি বেড়েছে, যদিও এখনো বিপৎসীমার নিচে রয়েছে। তবে আগামী তিন দিনে ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস থাকায় সিলেট, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ জেলার বিভিন্ন নদ-নদীর পানি আরও বাড়তে পারে। এতে কুশিয়ারা, বাউলাই, জুড়ি, মনু ও খোয়াই নদীর পানি কিছু স্থানে বিপৎসীমা অতিক্রম করে হাওরসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি বা অবনতি ঘটাতে পারে।
সংস্থাটির সাত দিনের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ৩০ এপ্রিল থেকে ৭ মে পর্যন্ত উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওর অববাহিকা ও উজানে মোট বৃষ্টিপাত ১৫০-৩৫০ মি.মি. পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। তবে সপ্তাহের শেষ দিকে বৃষ্টিপাত কমে এলে পানি কমে গিয়ে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হতে পারে।
আবহাওযা অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, ৩-৪ মে পর্যন্ত সারা দেশেই বৃষ্টি হতে পারে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সব মিলিয়ে এবার ১০-১৫ শতাংশ (প্রায় ২০ লাখ টন) বোরো উৎপাদন কমে যেতে পারে। তারা বলছেন, এখন হাওরে শ্রমিক নিয়োজিত করতে হবে। আবার যারা ধান শুকাতে পারছেন না, সরকারের উচিত তাদের থেকে ন্যায্যমূল্যে ভেজা ধান কিনে নেয়া।
কৃষি মন্ত্রণালয় বলেছে, তারা হাওরে ধান কাটার জন্য হারভেস্টর, রিপার ও শুকানোর জন্য ড্রায়ার সরবরাহ করেছে। যেখানে হারভেস্টর দেওয়া যাচ্ছে না, সেখানে ম্যানুয়ালি যেন দ্রুত কাটানো যায় তার জন্য লোকবল নিয়োগ করেছে।
