অকাল বন্যার শঙ্কায় হাওরের কৃষক, দ্রুত ধান কাটার আহ্বান, শ্রমিক ও ডিজেল সংকট
ভারতের উজান এলাকা ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বৃষ্টির জেরে সিলেটের নদীগুলোতে পানি বাড়ছে। আগামী সপ্তাহে ভারী বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাসও রয়েছে। ফলে বোরো ধান নিয়ে আরেক দফায় দুশ্চিন্তায় পড়েছেন হাওরের কৃষকরা।
পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা যায়, গত কয়েকদিন ধরে সুরমা-কুশিয়ারা, ধনু-বাউলাই ও ভুগাই-কংস নদীর পানি বাড়ছে। আগামী এক সপ্তাহ এসব নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকতে পারে।
কর্মকর্তারা জানান, মেঘালয় ও অসমসহ উজানের এলাকাগুলোতে বৃষ্টিপাতের কারণেই নদীর পানি বেড়েছে। আগামী কয়েক দিনে পানির স্তর আরও দ্রুত বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। পাশাপাশি স্থানীয় বৃষ্টিপাতের কারণে হাওরের তুলনামূলক নিচু এলাকায় জলাবদ্ধতা তৈরির সম্ভাবনাও রয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে হাওরের বোরো ফসল রক্ষায় যেসব জমির অন্তত ৮০ শতাংশ ধান পেকে গেছে, সেগুলো অবিলম্বে কেটে নেওয়ার জন্য কৃষকদের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছে পাউবো ও কৃষি কর্মকর্তারা।
সুনামগঞ্জ পাউবো-র নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন হাওলাদার বলেন, জেলার নদ-নদীর পানি বাড়তে শুরু করেছে। উজানের পাহাড়ি এলাকায় বৃষ্টিপাত হলে সুরমাসহ সব নদীর পানি দ্রুত বাড়বে।
ধান কাটতে শ্রমিক নিয়োগ, হারভেস্টার মেশিন সরবরাহসহ কৃষকদের সব ধরনের সহায়তা প্রদানের জন্য সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে,' বলেন তিনি।
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, ২৬ এপ্রিল থেকে পরের এক সপ্তাহ সিলেট অঞ্চলের জেলাগুলোতে ভারী বৃষ্টিপাত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে এসব নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকতে পারে এবং হাওরে পানি উঠে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে কৃষকদের ফসল ঘরে তোলা নিয়ে সংকট আরও ঘনীভুত হচ্ছে।
আবহাওয়াবিদ বজলুর রশীদ টিবিএসকে বলেন, বর্তমানে কয়েক জায়গায় বৃষ্টি হচ্ছে। তবে সিলেট ও মেঘালয়সহ ভারত সীমান্তের কিছু জায়গায় বেশি বৃষ্টিপাত হতে পারে।
নেত্রকোনার খালিয়াজুড়ি উপজেলার কৃষক দীপ্র চৌধুরী বলেন, চৈত্র মাস থেকে টানা বৃষ্টির জেরে জমি ইতিমধ্যেই পানিতে তলিয়ে গেছে, বছরের এই সময়ে একেবারেই অস্বাভাবিক।
তিনি বলেন, 'এখন ধনু নদীর পানি বাড়ছে। আমাদের এলাকায় মাত্র ২০-২৫ শতাংশ ধান কাটা হয়েছে। জমিতে পানি থাকায় হারভেস্টার নামানো যাচ্ছে না। আগামী সপ্তাহেও ভারী বৃষ্টিপাত চললে কৃষকেরা ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়বেন।'
দেশের বেশিরভাগ চাল উৎপাদন হয় বোরো মৌসুমে। এর প্রায় ২০ শতাংশই উৎপাদন হয় হাওরভুক্ত সাত জেলায়।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যানুসারে, সুনামগঞ্জ, সিলেট, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া—হাওয়ারভুক্ত এ সাত জেলায় এবার ৯.৬৩ লাখ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের চাষাবাদ হয়েছে। এর মধ্যে হাওরে ৪.৫৫ লাখ হেক্টর এবং হাওরের বাইরে ৫.০৮ 5 লাখ হেক্টর জমিতে ধান চাষ হয়েছে।
এ পর্যন্ত হাওরাঞ্চলে মাত্র ১৮ শতাংশ ধান কেটেছেন কৃষকরা। আর পরিপক্ব হয়েছে আরও প্রায় ১১ শতাংশ ধান। এখনো সফট ডাফ পর্যায়ে ২৬ শতাংশ ও হার্ড ডাফ পর্যায়ে রয়েছে ৪৪ শতাংশ। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে বেশিরভাগ ধানই পরিপক্ব হয়ে যাবে বলে জানিয়েছেন কৃষি কর্মকর্তারা।
বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইন্সটিটিউটের (বিআরআরআই) প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. নিয়াজ মো. ফারহাত রহমান টিবিএসকে বলেন, ধান হার্ড ডাফ থেকে পরিপক্ক হতে চার-পাঁচ দিন সময় লাগবে।
'তবে এর মধ্যে যদি কারও জমির ৮০ শতাংশ ধান পরিপক্ব হয়ে যায়, তাহলে একদিনও অপেক্ষা করা উচিত নয়। এখনই কেটে ফেলতে হবে,' বলেন তিনি।
ড. নিয়াজ পরামর্শ দেন, যাদের ৬০ শতাংশ বা এর বেশি ধান পরিপক্ব হয়েছে, তারা বৃষ্টি বেশি হলে জমির পাশে নালা করে রাখতে পারেন, যাতে পানি নেমে যায়। আর বাতাস বেশি হলে হেলে পড়ে যাওয়ার শঙ্কা থাকে। তাই চার-পাঁচটি করে গাছ একসাথে বেঁধে দিতে হবে।
সুনামগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক বলেন, সুনামগঞ্জে ছোট-বড় ১৩৭টি হাওর রয়েছে। এবার জেলায় ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে ধান চাষ হয়েছে। এখন পর্যন্ত ২৮ হাজার হেক্টর ধান কৃষকরা ঘরে তুলেছেন। বাকি ধান ঘরে তুলতে আরো সময় লাগবে।
শ্রমিক ও ডিজেল সংকটে দিশেহারা কৃষক
কৃষকরা বলেন, বন্যার ঝুঁকি বাড়লেও শ্রমিক ও ডিজেল সংকটের কারণে তারা দ্রুত ধান কাটতে পারছেন না।
তারা বলেন, হারভেস্টাার মেশিন চালাতে প্রতিদিন ১০০-১২০ লিটার ডিজেল প্রয়োজন হয় এবং পাওয়ার থ্রেসার মেশিনে লাগে ১২-১৫ লিটার। কিন্তু এই পরিমাণ ডিজেল প্রতিদিন পাওয়া যায় না।
ডিজেলের সরবরাহ বাড়াতে সম্প্রতি কয়েকজন কৃষক উপজেলা কৃষি অফিস ও ইউএনওর দপ্তরে লিখিত আবেদন করেছেন।
সুনামগঞ্জ জেলার শান্তিগঞ্জ উপজেলার পাখিমারা হাওরের একজন কৃষক বলেন, তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় ধান কাটায় হারভেস্টার মেশিন ব্যবহার করতে পারছেন না তিনি। আবার শ্রমিকও মিলছে না। ফলে বন্যার শঙ্কা সত্ত্বেও দ্রুত গতিতে ধান কাটতে পারছেন না তিনি।
এই এলাকার হারভেস্টার মেশিনের মালিক ও কৃষক আবদুল কাদির বলেন, 'আমার একটা মেশিন বন্ধ আছে। তেল সংকটের কারণে কৃষকরা ভাড়া নিচ্ছেন না।'
চলতি মাসে জেলার বিভিন্ন উপজেলা কৃষি অফিসের আয়োজনে হারভেস্টার মালিকদের নিয়ে ধান কাটার বিষয়ে সভা করা হয়। সভায় উপস্থিত হারভেস্টার মালিকদের জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, ডিজেলের কোনো সংকট নেই। নির্ধারিত রেটে তারা যেন হাওরে কৃষকদের ধান কাটায় সহায়তা দেন।
কিন্তু বাস্তব চিত্র একেবারেই ভিন্ন। হাওরে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে ধান কাটায় হারভেস্টার ঠিকমতো সেবা দিতে পারছে না। ডিজেল আনতে গেলে অধিকাংশ সময় খালি হাতে ফিরতে হচ্ছে মালিকদের।
তাহিরপুরের একজন কৃষক ও হারভেস্টার মালিক জানান, ডিলারদের কাছ থেকে ডিজেল কেনার জন্য কৃষি অফিস থেকে একটি টোকেন দেওয়া হয়। কিন্তু সেই টোকেন নেওয়া দীর্ঘ প্রক্রিয়া। আবার টোকেন নিয়ে কোনো ডিলারের অনেক সময় ডিজেল পাওয়া যায় না।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সিলেট বিভাগীয় কার্যালয়ের অতিরিক্ত পরিচালক মো. মোশাররফ হোসেন বলেন, ডিজেলের সংকট নেই। তবু সরবরাহ ব্যবস্থায় কিছুটা সমস্যা আছে। এ কারণে কিছু ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
'আমরা এখন কৃষকদের রেশনিংয়ের মাধ্যমে ডিজেল সরবরাহ করছি। সুনামগঞ্জের হাওর অঞ্চলের ধান কাটার জন্য অতিরিক্ত ডিজেল বরাদ্দ চেয়ে আমরা মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেছি। তবে এখনো বরাদ্দ পাওয়া যায়নি,' বলেন তিনি।
কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেছেন, হাওরাঞ্চলের ধান যথাসময়ে কাটার জন্য সর্বাত্মক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
যেসব অঞ্চলে ধান আগে কাটার উপযোগী সেখানে প্রয়োজনে পার্শ্ববর্তী এলাকা থেকে হার্ভেস্টার ও ধান কাটার শ্রমিক এনে ধান কাটার জন্য স্থানীয় প্রশাসনকে নির্দেশ দিয়েছেন মন্ত্রী। এ বিষয়ে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও স্বেচ্ছাসেবকদের সম্পৃক্ত করতে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, 'হাওড়ে পানি ঢোকার আগেই সব ধান কেটে ফেলতে হবে। কোনোভাবেই যেন ফসল নষ্ট না হয়, সেদিকে সর্বোচ্চ নজর দিতে হবে।'
