হাওরের নিম্নাঞ্চলে বন্যার পূর্বাভাস, বোরো ধান ঘরে তোলা নিয়ে শঙ্কায় কৃষকেরা
নেত্রকোণার ধনু নদীর পাশের খালিয়াজুড়ির কাদিরপুর হাওরে এবার প্রায় তিন একর জমিতে বোরো ধানের আবাদ করেছিলেন পলাশ সরকার। এর মধ্যে অল্প কিছু জমির ধান কাটতে পারলেও প্রায় আড়াই একরের মতো জমির বেশিরভাগ ধান এখন কোমরসমান পানির নিচে তলিয়ে রয়েছে।
তিনি টিবিএসকে বলেন, "আর দুই-এক দিন এভাবে বৃষ্টি হলে জমি পুরোপুরি ডুবে যাবে। তখন আর ধান কাটা সম্ভব হবে না। যেগুলো কেটেছি সেগুলোও শুকাতে পারছি না। আর তিন-চার দিন এমন থাকলে কাটা ধানও নষ্ট হয়ে যাবে।"
শ্রমিক সংকটে ধান কাটা সম্ভব হচ্ছে না জানিয়ে তিনি বলেন, "চার-পাঁচ দিন আগেই ধান কাটতে পারতাম। কিন্তু শ্রমিক নেই। যে হারে বজ্রপাত হচ্ছে, তার মধ্যেও ঝুঁকি নিয়ে ধান কাটছি। কিছু করার নেই। আমাদের বছরে একটাই ফসল হয়। এ ফসলেই সারা বছর চলে। এখন যদি এগুলো নষ্ট হয়ে যায়, আমাদের আর কিছু থাকবে না।"
তার এই পরিস্থিতি হাওরাঞ্চলজুড়ে চলমান বৃহত্তর সংকটেরই প্রতিচ্ছবি। টানা বৃষ্টি ও পানির উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে বোরো ধান কাটার কাজ ব্যাহত হচ্ছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই) জানিয়েছে, এখনো প্রায় অর্ধেক ফসল মাঠে রয়ে গেছে এবং এর প্রায় ১৭ শতাংশ প্লাবিত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, আগামী তিন থেকে চার দিন হাওরাঞ্চলের নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। এতে হাওরের একমাত্র ফসল ঘরে তোলা নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েছেন কৃষকরা।
ভারী বৃষ্টি ও নদীর পানি বৃদ্ধিতে বন্যার ঝুঁকি বাড়ছে
পাউবোর বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র মঙ্গলবার সন্ধ্যায় এক বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, মৌলভীবাজারের মনু নদী মৌলভীবাজার পয়েন্টে প্রাক-মৌসুমি বিপদসীমার ১১০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এছাড়া নেত্রকোণার ভুগাই-কংস নদী জারিয়াঝাঞ্জাইল পয়েন্টে প্রাক-মৌসুমি বিপদসীমার ২৮ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে পানি বইছে।
'ভারী থেকে অতিভারী' বৃষ্টিপাতের প্রভাবে সিলেট, হবিগঞ্জ, নেত্রকোণা ও মৌলভীবাজার জেলার নিম্নাঞ্চলে বন্যা হতে পারে বলে আভাস দিয়েছে সংস্থাটি।
পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওর অববাহিকার প্রধান নদ-নদীগুলোর পানি সমতল বেড়েছে। এ সময়ে সিলেট-সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার-হবিগঞ্জ এবং নেত্রকোণা-কিশোরগঞ্জ অঞ্চলে ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। আগামী তিন দিন একই ধরনের বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে।
সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলার সুরমা-কুশিয়ারা অববাহিকার নদীগুলোর পানি আগামী তিন দিনে উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে। এর মধ্যে দ্বিতীয় ও তৃতীয় দিনে এসব নদী ও উপনদীগুলো বিপদসীমা অতিক্রম করতে পারে।
একইভাবে মনু, খোয়াই ও জুড়ি নদীর পানি আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জের নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে।
সারিগোয়াইন-যাদুকাটা অববাহিকাতেও পানি দ্রুত বাড়ছে। বিশেষ করে যাদুকাটা নদী আগামী তিন দিনে বিপদসীমা ছাড়িয়ে যেতে পারে এবং সারিগোয়াইন নদী সতর্কসীমায় পৌঁছাতে পারে।
অন্যদিকে, নেত্রকোণার ভুগাই-কংস ও সোমেশ্বরী নদীতেও পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকবে। ভুগাই-কংস নদী আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বিপদসীমা অতিক্রম করতে পারে এবং সোমেশ্বরী নদী দ্বিতীয়-তৃতীয় দিনে সতর্কসীমায় পৌঁছানোর পাশাপাশি কিছু পয়েন্টে বিপদসীমা ছাড়াতে পারে।
নেত্রকোণা ও কিশোরগঞ্জের ধনু-বাউলাই অববাহিকায়ও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এ অঞ্চলের নদীগুলো আগামী তিন দিনে সতর্কসীমায় পৌঁছাতে পারে এবং বাউলাই নদীর কিছু পয়েন্টে বিপদসীমা অতিক্রমের আশঙ্কা রয়েছে।
সার্বিকভাবে, টানা ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ ও নেত্রকোণা জেলার নদীতীরবর্তী নিম্নাঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এদিকে আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, আগামী ৩-৪ তারিখ পর্যন্ত সিলেট অঞ্চলসহ সারাদেশে বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে। সিলেট অঞ্চলে ১-২ তারিখ পর্যন্ত ভারী বৃষ্টিপাতের আশঙ্কা রয়েছে। এতে নদীর পানি আরও বাড়তে পারে এবং বোরো ধান ঘরে তোলা নিয়ে কৃষকদের সংকট আরও ঘনীভূত হচ্ছে।
আবহাওয়াবিদ বজলুর রশীদ টিবিএসকে বলেন, "সারাদেশেই আরও কয়েক দিন ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকবে। আসাম-মেঘালয়েও বৃষ্টি হচ্ছে। বিশেষ করে ১-২ তারিখ পর্যন্ত ভারী বৃষ্টিপাত থাকতে পারে।"
১৭% ফসল নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিতে
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই) জানিয়েছে, হাওরাঞ্চলে ইতোমধ্যে ৫৮ শতাংশ ধান কাটা হয়েছে। তবে শ্রমিক সংকট ও জলাবদ্ধতার কারণে জমির ধান পরিপক্ক হলেও কৃষকরা তা কাটতে পারছেন না। মাঠে থাকা ধানের মধ্যে প্রায় ১৭ শতাংশ বন্যার ঝুঁকিতে রয়েছে বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।
দেশের অধিকাংশ চাল উৎপাদন হয় বোরো মৌসুমে, যার প্রায় ২০ শতাংশই আসে হাওরভুক্ত সাত জেলা থেকে।
ডিএই সূত্রে জানা যায়, সুনামগঞ্জ, সিলেট, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া—এই সাত জেলায় এবার ৯.৬৩ লাখ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে হাওরে ৪.৫৫ লাখ হেক্টর এবং নন-হাওর এলাকায় ৫.০৮ লাখ হেক্টর জমিতে চাষ হয়েছে।
কম দাম ও বেশি খরচে কৃষকের ক্ষতি বাড়ছে
সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার বাউসী গ্রামের কৃষক প্রসন্ন কুমার বলেন, "এ বছর ফাল্গুন মাস থেকেই লাগাতার বৃষ্টি হচ্ছে। হাওরের অনেক জায়গায় জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। ফলে ধান কেটে ঘরে তুলতে খরচ দ্বিগুণ হয়ে গেছে। রোদ না থাকায় ধান শুকানো যাচ্ছে না, খলায় পড়ে নষ্ট হচ্ছে। অথচ ধানের দাম খুবই কম—এ অবস্থায় কৃষক পথে বসবে।"
একই এলাকার কৃষক আব্দুল কাইয়ুম বলেন, "বাজারে মিল মালিকেরা ৮০০ টাকা দরে ধান কিনছে। কিন্তু ধান কাটতে একজন শ্রমিককে দিতে হচ্ছে ১০০০-১২০০ টাকা। পানি জমে থাকায় মাঠের অবস্থা খারাপ। প্রতি কিয়ার জমির ধান কাটতে অন্তত আটজন শ্রমিক লাগে। ফলন যদি কিয়ারপ্রতি সর্বোচ্চ ২০ মনও হয়, তবুও লোকসানই হবে।"
সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার লক্ষণশ্রী ইউনিয়নের গোবিন্দপুর গ্রামের কৃষক মো. রেনু মিয়া বলেন, "পাগনা হাওরের চার আনা ধান কাটা হয়েছে। পানি থাকায় মেশিন নামানো যায় না, মানুষও কম। কাটা ধান খলায় পড়ে গন্ধ ধরছে।"
তাহিরপুর উপজেলার শাহাগঞ্জ গ্রামের কৃষক জিয়াউর রহমান বলেন, "শনির হাওরের অর্ধেকের বেশি ধান এখনও বাকি। ২০-২২ কিয়ারের মধ্যে মাত্র আট কিয়ার কাটতে পেরেছি। রোদ না থাকায় শুকাতে পারছি না, আর হাঁটু-উরু পানি থাকায় ক্ষেতেও নামা কঠিন।"
সিলেট সদর সংলগ্ন নালিয়ার কৃষক শামসুল আলম জানান, লাগাতার বৃষ্টির কারণে জমে থাকা পানিতে ধানে পচন ধরেছে। শ্রমিক সংকটের কারণে ধান কাটাও সম্ভব হচ্ছে না।
সুনামগঞ্জ ও সিলেটের বিভিন্ন হাওরের কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অতিবৃষ্টির কারণে এ বছর যে ফলন হবে, তাতে খরচের অর্ধেকও ওঠার সম্ভাবনা কম।
ধান কাটতে বিলম্ব হওয়ায় সহায়তা বাড়াচ্ছে কর্তৃপক্ষ
সুনামগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক বলেন, শতভাগ ধান কাটতে মে মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। তবে টানা বৃষ্টির কারণে কৃষক ও শ্রমিক কেউই ঠিকমতো মাঠে নামতে পারছেন না।
পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মামুন হাওলাদার জানান, চেরাপুঞ্জিসহ উজান এলাকায় ভারী বৃষ্টির কারণে আগামী কয়েক দিন নদীর পানি আরও বাড়তে পারে, যা হাওরে চাপ সৃষ্টি করবে।
সিলেট জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. শামসুজ্জামান বলেন, "আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে আগামী ৮-১০ দিনের মধ্যে সব ধান কাটা সম্ভব হবে। বর্তমানে ধানের সরকারি দর ১৪৪০ টাকা মণ, তবে মে মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকে সরকারি ধান সংগ্রহ শুরু হবে।"
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সরেজমিন উইংয়ের অতিরিক্ত পরিচালক (মনিটরিং ও বাস্তবায়ন) ড. মো. জামাল উদ্দীন টিবিএসকে বলেন, বন্যার ঝুঁকিতে থাকা এলাকাগুলোতে বিভিন্ন জেলা থেকে শ্রমিক সরবরাহ করা হচ্ছে। পাশাপাশি হারভেস্টার দিয়েও সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।
