ডুবছে খেত, পচছে ফসল: হাওরের ৪৭ হাজার হেক্টর জমির ধানে লোকসান গুনছেন কৃষকরা
হাওরের কৃষক সুমন তরফদার এ বছর প্রায় ১০ একর জমিতে বোরো ধানের আবাদ করেছিলেন। টানা বৃষ্টিতে তার প্রায় ৭ একরের ধান পানিতে ডুবে নষ্ট হয়ে গেছে।
যেসব ধান কাটতে পেরেছিলেন, তার অর্ধেকও রোদের অভাবে শুকাতে পারেননি। সেগুলোতে চারা (গ্যাঁজ) চলে এসেছে। সব মিলিয়ে তিনি এক থেকে দেড় একর জমির ধান এবার সিদ্ধ করতে পারবেন।
নেত্রকোণা জেলার খালিয়াজুড়ি উপজেলার কাদিরপুর হাওরের এ কৃষক টিবিএসকে বলেন, "নিজের জমি। তবুও এবার প্রায় ৩ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। বেশিরভাগ ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। যেটুকু কাটতে পেরেছিলাম, তার অর্ধেক ধানে চারা চলে এসেছে। এগুলো কেউ কিনবে না। অল্প কিছু ধান বাঁচানো যাবে। এবছরের মতো লোকসানে আর কখনো পড়িনি।"
ভেজা ধান কেউ কিনতে চাইছে না জানিয়ে তিনি বলেন, মাঠ থেকে কিছু ধান প্রতিমণ ৫০০–৬০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। কেউ তো শুকাতে পারছে না। যারা কোনোভাবে বৃষ্টির আগে কেটে শুকিয়েছে, তারা কিছুটা বেশি দামে বিক্রি করতে পারছে। অন্য সময়ে মাঠ থেকে কাঁচা ধান ৮০০–৯০০ টাকায় বিক্রি করা যেত।
শুধু সুমন তরফদার নন, এ যেন হাওরের সব কৃষকের গল্প। এপ্রিলের শেষ সপ্তাহে শুরু হওয়া টানা ভারী বৃষ্টিপাতে সুনামগঞ্জ, সিলেট, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, নেত্রকোণা, কিশোরগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া—হাওরভুক্ত এ সাত জেলায় প্রায় ৪৭ হাজার হেক্টরের বেশি জমির ধান তলিয়ে গেছে। শুধু সিলেট বিভাগের চার জেলায় তলিয়ে গেছে প্রায় ৩৪ হাজার হেক্টর জমির ধান। মাঠে এখনো হাওরের প্রায় ২৫ শতাংশ ধান রয়ে গেছে। এ তথ্য কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের।
যদিও কৃষক ও স্থানীয়রা বলছেন, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরও বেশি।
দেশের বেশিরভাগ চাল উৎপাদন হয় বোরো মৌসুমে। এর মধ্যে প্রায় ১০ শতাংশ উৎপাদন হয় হাওরে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, হাওরভুক্ত সাত জেলায় এবার ৯.৬৩ লাখ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের চাষ হয়েছে। এর মধ্যে হাওরে ৪.৫৫ লাখ হেক্টর এবং নন-হাওরে ৫.০৮ লাখ হেক্টর জমিতে ধান চাষ হয়েছে।
মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলার কালনীগড় এলাকার কৃষক বাবুলাল দাস বলেন, "১০ বিঘা জমিতে বোরোর আবাদ করেছি। ধান কাটা প্রায় শেষ। কিন্তু ধান শুকাতে পারছি না। বাড়ির উঠান, রাস্তা বৃষ্টিতে ভেজা, আর মাঠ পানির নিচে। এ কারণে ধান শুকানোর জায়গা পাচ্ছি না। এখন আমার ধানে 'গ্যাঁড়া' (চারা) গজাচ্ছে। এগুলো আর কোনো কাজে আসবে না।"
সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার নলুয়ার হাওর এলাকার কৃষক মাহবুব আলম বলেন, "বৃষ্টির মধ্যে পানিতে নেমে ধান কেটে এনেছি। কিন্তু রোদ না থাকায় শুকাতে পারছি না। রোদের অভাবে ধান পচে যাচ্ছে। ধান নষ্ট হচ্ছে, খড় নষ্ট হচ্ছে। খুব কষ্টে আছি।"
সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার শনির হাওরপাড়ের কৃষাণি সাবানা বেগম বলেন, "৩৬ শতক জমির সেদ্ধ ধান টানা বৃষ্টিতে শুকাতে পারছি না। ধান পচে গন্ধ বের হচ্ছে। ফেলে দেওয়ার অবস্থা। ধানের দিকে তাকালে চোখে পানি আসে।"
এছাড়া সিলেট বিভাগে চলতি মৌসুমে গড়ে ৫৭ শতাংশ জমির বোরো ধান কাটা সম্পন্ন হয়েছে। এর মধ্যে হাওর এলাকায় ৭৫ শতাংশ এবং হাওর নেই এমন এলাকায় ৩৩ শতাংশ ধান কাটা হয়েছে বলে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সিলেট বিভাগের অতিরিক্ত পরিচালক ড. মো. মোশাররফ হোসেন বলেন, "হাওর এলাকার এখনো ডুবে থাকা প্রায় ২৫ শতাংশ ধান সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এছাড়া শুকাতে না পারায় আরও অনেক ধান নষ্ট হবে। এর হিসাব করা হচ্ছে। এত ধান একসঙ্গে শুকানোর কোনো কৃত্রিম ব্যবস্থা আমাদের নেই। তাই প্রকৃতির ওপরই নির্ভর করতে হয়।"
তিনি আরও বলেন, "রোববার থেকে সরকার ধান-চাল সংগ্রহ শুরু করেছে। এতে কৃষকের ক্ষতি কিছুটা কমবে। মিল মালিকরা ধান কিনলে ক্ষতি আরও কমত। কিন্তু এখন পর্যন্ত তারা ধান কেনা শুরু করেনি।"
এদিকে পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওর অববাহিকায় কয়েকটি নদীর পানি ইতোমধ্যে প্রাক-মৌসুমী বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এর মধ্যে সুনামগঞ্জের নলজুর, নেত্রকোনার বাউলাই, ভুগাই-কংস, সোমেশ্বরী ও মগরা এবং হবিগঞ্জের কালনি-কুশিয়ারা ও সুতাং নদীর বিভিন্ন পয়েন্টে পানি বিপদসীমা অতিক্রম করেছে।
একই সময়ে সুরমা-কুশিয়ারা ও ধনু-বাউলাই নদীর পানি বৃদ্ধি পেলেও ভুগাই-কংস নদীর পানি কিছুটা কমেছে।
গত ২৪ ঘণ্টায় উজান ও হাওর অঞ্চলে মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টিপাত হয়েছে এবং আগামী তিন দিনও বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে। এর ফলে সুরমা-কুশিয়ারা নদীর পানি আরও বাড়তে পারে এবং দ্বিতীয় দিনে কিছু পয়েন্টে বিপদসীমা অতিক্রম করে সিলেট ও সুনামগঞ্জের নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে।
অন্যদিকে নেত্রকোনার ভুগাই-কংস, সোমেশ্বরী এবং ধনু-বাউলাই অববাহিকার নদীগুলোর পানি আগামী তিন দিন স্থিতিশীল থাকতে পারে। তবে এসব অঞ্চলের হাওর সংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে বিদ্যমান বন্যা পরিস্থিতি অব্যাহত থাকার আশঙ্কা রয়েছে।
মৌলভীবাজার-হবিগঞ্জ অঞ্চলে মনু, খোয়াই ও জুড়ি নদীর পানি প্রথম দুই দিন স্থিতিশীল থেকে তৃতীয় দিনে বাড়তে পারে। এ সময় জুড়ি নদী সতর্কসীমার কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে।
সার্বিকভাবে, টানা বৃষ্টিপাতের কারণে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওর এলাকার বিভিন্ন নিম্নাঞ্চলে চলমান বন্যা পরিস্থিতি অব্যাহত থাকা এবং কিছু স্থানে নতুন করে বন্যার ঝুঁকি তৈরির আশঙ্কা রয়েছে বলে সংস্থাটি জানিয়েছে।
