বাংলাদেশে জ্বালানি ঘাটতি মোকাবিলায় বাস্তব পদক্ষেপের বিষয়ে ‘গুরুত্বসহকারে’ ভাবছে জাপান: রাষ্ট্রদূত
আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে মিলে বাংলাদেশের জ্বালানি ঘাটতি মোকাবিলা এবং টেকসই জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে বাস্তব পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়টি 'গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা' করছে জাপান—এ কথা বলেছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত জাপানের রাষ্ট্রদূত শিনিচি সাইদা।
সোমবার (২০ এপ্রিল) তিনি এক কৌশলগত আলোচনায় বলেন, "এই উদ্যোগ শুধু বাংলাদেশকেই নয়, এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের সামগ্রিক স্থিতিশীলতায়ও অবদান রাখবে।"
তিনি আরও বলেন, প্রয়োজনে অংশীদারদের পাশে দাঁড়ানোই জাপানের সহযোগিতার ধরণ। জ্বালানি খাতে গুরুত্ব দিয়ে রাষ্ট্রদূত জানান, বাংলাদেশ বর্তমানে তাৎক্ষণিকভাবে জ্বালানি চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে এবং বিষয়টি জাপান গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে।
তিনি জানান, জাপানের প্রধানমন্ত্রী ইতোমধ্যে বিদ্যমান সহযোগিতা কাঠামো সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছেন এবং সম্প্রতি বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ভার্চুয়াল শীর্ষ বৈঠক করেছেন, যেখানে উভয়পক্ষ জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদারে একটি অভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিতে একমত হয়েছে।
গত ১৫ এপ্রিল জাপানের নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত এশিয়া জিরো এমিশন কমিউনিটি (এজেক) প্লাস অনলাইন শীর্ষ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশের তাৎক্ষণিক জ্বালানি চাহিদা পূরণ ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় উন্নয়ন অংশীদারদের কাছে ২ বিলিয়ন ডলারের তহবিল চান। একই সঙ্গে তিনি এ সময়োপযোগী ও গুরুত্বপূর্ণ সম্মেলন আয়োজনের জন্য জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান।
সোমবারের আলোচনায় জাপানের রাষ্ট্রদূত আরও বলেন, দুই দেশের জ্বালানি কর্তৃপক্ষের মধ্যে চলমান আলোচনার প্রেক্ষাপটে উচ্চপর্যায়ের দ্বিপাক্ষিক যোগাযোগ আরও বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
ইপিএ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটি শুধু শুল্ক কমানোর বিষয় নয়, বরং একটি রূপান্তরমুখী ও ভবিষ্যতমুখী চুক্তি। তিনি উল্লেখ করেন, ইপিএকে ১৫ বছর বা তারও বেশি সময়ের দীর্ঘমেয়াদি কাঠামো হিসেবে তৈরি করা হয়েছে, যা ব্যবসার নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে, বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াবে এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরও গভীর করবে।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, বিভিন্ন উদ্যোগ ও ইপিএর পূর্ণ সুফল পেতে টেকসই রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, আইনের শাসন এবং অনুকূল ব্যবসায়িক পরিবেশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
গত ৬ ফেব্রুয়ারি টোকিওতে বাংলাদেশ ও জাপান দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য সম্পর্ক জোরদারে একটি অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি (ইপিএ) স্বাক্ষর করে, যা কোনো দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রথম ইপিএ।
'অ্যাডভান্সিং বাংলাদেশ-জাপান ইকোনমিক পার্টনারশিপ অ্যাগ্রিমেন্ট (ইপিএ)' শীর্ষক এ আলোচনাটি ঢাকার একটি হোটেলে আয়োজন করে জাপানিজ কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি অ্যাসোসিয়েশন ইন ঢাকা (জেসিআইএডি), জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশন (জেট্রো) এবং জাপান-বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (জেবিসিসিআই)। এতে সহায়তা দেয় এইচএসবিসি।
'ব্যবসার খরচ কমানোই শীর্ষ অগ্রাধিকার'
ইপিএকে 'মাইলফলক চুক্তি' হিসেবে উল্লেখ করে অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, এটি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক রূপান্তর ও ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি প্রচুর বিনিয়োগ প্রয়োজন; কারণ এখানে বড় সংখ্যক তরুণ জনসংখ্যা রয়েছে। দেশে কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা ১০ কোটির বেশি এবং দ্রুত সম্প্রসারিত মধ্যবিত্ত শ্রেণির প্রায় ৪ কোটি ভোক্তার ক্রয়ক্ষমতা বাড়ছে।
মন্ত্রী বলেন, কাঠামোগত সংস্কার এখন সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার, বিশেষ করে ব্যবসা পরিচালনার খরচ কমানো।
তিনি জানান, বর্তমানে দেশের লজিস্টিকস ব্যয় জিডিপির প্রায় ১৬ শতাংশ, যা বৈশ্বিক গড় ১০ শতাংশের তুলনায় অনেক বেশি। এ খরচ কমাতে বন্দর দক্ষতা বাড়ানো, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করা এবং ইউনিটপ্রতি ব্যয় কমানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
তিনি আরও জানান, প্রশাসনিক প্রক্রিয়া ও নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা সহজ করতে সরকার কাজ করছে। সেবা প্রদানে প্রতিবন্ধকতা চিহ্নিত করতে এবং বাস্তবসম্মত সমাধান দিতে বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিদের নিয়ে কমিটি গঠন করা হবে, যাতে ব্যবসা আরও দক্ষভাবে পরিচালনা করা যায়।
তিনি বলেন, শুল্কবহির্ভূত বাধা দূর করাও একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার। আন্তর্জাতিক অংশীদার—বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়ন—যে বাধাগুলোর বিস্তারিত তালিকা দিয়েছে, সেগুলো সমাধানে সরকার ইতোমধ্যেই পদক্ষেপ নিয়েছে।
স্বল্প সময়ের মধ্যে সব চিহ্নিত সমস্যা সমাধানের প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি জাপানি ব্যবসায়ীদেরও অনুরূপ তালিকা দিতে আহ্বান জানান এবং আশ্বস্ত করেন যে, সেগুলোরও দ্রুত সমাধান করা হবে।
তিনি উল্লেখ করেন, জাপানের মানদণ্ড পূরণ করতে পারলে বাংলাদেশের পণ্য বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতায় আরও এগিয়ে যাবে।
