দেশীয় বাধা দূর না হলে জাপানের সঙ্গে ইপিএ’র সুফল মিলবে না: ব্যবসায়ীরা
বিনিয়োগ ও রপ্তানি বাড়াতে দেশে সরকারি ও বেসরকারি খাতে বিদ্যমান বাধা দূর করা না গেলে জাপানের সঙ্গে স্বাক্ষরিত ইকোনমিক পার্টনারশিপ এগ্রিমেন্টের (ইপিএ) সম্ভাবনা কাজে লাগানো যাবে না; বরং তা কাগজেই থেকে যেতে পারে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা।
গতকাল মঙ্গলবার (৩ মার্চ) এক্সপোর্ট প্রমোশন ব্যুরো (ইপিবি) আয়োজিত 'এক্সপোর্ট পটেনশিয়াল আন্ডার বাংলাদেশ-জাপান ইপিএ: চ্যালেঞ্জেস এন্ড ওয়ে ফরওয়ার্ড' শীর্ষক এক সেমিনারে তারা এসব কথা বলেন।
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) মহাসচিব ড. এ কে এম আসাদুজ্জামান পাটোয়ারী বলেন, "জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশন (জেট্রো)-এর এক গবেষণায় দেখা গেছে, জাপানি বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশে পুনঃবিনিয়োগের আগ্রহ দেখালেও সেই বিনিয়োগ প্রত্যাশিত হারে বাড়েনি। গত বছর মাত্র ৪০ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ এসেছে।"
তিনি বলেন, "আমরা ইপিএ নিয়ে আত্মতুষ্ট থাকতে চাই না। যেসব বাধা রয়েছে সেগুলো চিহ্নিত করে সমাধানের উদ্যোগ নিতে হবে। এগুলো সমাধান করা না গেলে ইপিএর সম্ভাবনা কেবল কাগজে-কলমেই থেকে যাবে।"
সেমিনারটি সঞ্চালনা করেন ইপিবির ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হাসান আরিফ। এতে দুই দেশের ব্যবসায়ী ও বিশেষজ্ঞরা অংশ নেন।
আলোচনায় অংশ নিয়ে অন্যান্য ব্যবসায়ীরাও জাপানের সঙ্গে বাণিজ্য বাড়ানোর ক্ষেত্রে বিদ্যমান বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ তুলে ধরে তা সমাধানের তাগিদ দেন।
অনুষ্ঠান শেষে ড. আসাদুজ্জামান পাটোয়ারী দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, "এনবিআর ও কাস্টমস-সংক্রান্ত বিষয়, নীতিগত অসামঞ্জস্য এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতা বাংলাদেশে জাপানের বিনিয়োগ বাড়ানোর ক্ষেত্রে বড় বাধা।"
তিনি আরও বলেন, রপ্তানির ক্ষেত্রে জাপানের মানদণ্ড অনুযায়ী পণ্যের গুণগত মান বজায় রাখাও একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
অনুষ্ঠানে অন্যান্য বক্তারাও জাপানের মান অনুযায়ী পণ্যের গুণগত মান নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন। তাদের মতে, জাপানে রপ্তানির বড় সম্ভাবনা থাকলেও গুণগত মানের বিষয়টি ঠিকভাবে নিশ্চিত না করলে সেই সম্ভাবনা কাজে লাগানো কঠিন হবে।
বাংলাদেশ ৬ ফেব্রুয়ারি জাপানের সঙ্গে ইপিএ সই করে। এই চুক্তির আওতায় বাংলাদেশের প্রায় ৭,৩৭৯টি পণ্য জাপানের বাজারে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে। অন্যদিকে ধাপে ধাপে এক হাজারের বেশি জাপানি পণ্য বাংলাদেশে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পাবে।
অ্যারোট অ্যাগ্রোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাঞ্চন মিয়া জানান, তারা বাংলাদেশ থেকে জাপানে সবজি রপ্তানি করেন। তবে ঢাকা–নারিতা সরাসরি ফ্লাইট বন্ধ থাকায় বর্তমানে তারা সমস্যার মুখে পড়েছেন।
তিনি বলেন, প্রতি ফ্লাইটে প্রায় এক টন করে সবজি জাপানে রপ্তানি করা হতো। আম রপ্তানির অর্ডারও পাওয়া গেছে এবং গাজর রপ্তানির সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে। কিন্তু সরাসরি ফ্লাইট বন্ধ থাকায় অন্য পথে পণ্য পাঠাতে গিয়ে বাড়তি খরচ হচ্ছে।
তিনি দ্রুত ঢাকা–নারিতা ফ্লাইট চালুর জন্য সরকারের কাছে উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান।
এ ছাড়া জাপানে ব্যবসা সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে ভাষাগত বাধা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং কমপ্লায়েন্স সংক্রান্ত প্রয়োজনীয়তাও বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করেন ব্যবসায়ীরা।
জাপান বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাজার। জাপানে পোশাক রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান উর্মি গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আসিফ আশরাফ বলেন, "জাপানে প্রায় ২৩ বিলিয়ন ডলারের অ্যাপারেল মার্কেট রয়েছে। কিন্তু সেখানে আমরা খুবই সামান্য অংশ পাচ্ছি। জাপানে ম্যান-মেইড ফাইবারের পোশাকের চাহিদা বেশি হলেও আমরা এখনো মূলত কটনভিত্তিক পণ্যে শক্ত অবস্থানে আছি।"
তিনি বলেন, জাপানের বাজার ধরতে হলে রপ্তানিকারকদের ধৈর্য ধরতে হবে। একবার আস্থা তৈরি হলে দাম বেশি হলেও জাপানি ক্রেতারা এখান থেকেই অর্ডার দেবেন।
অনুষ্ঠানে জাপান-বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি তারেক রাফি ভূইয়া (জুন) এবং আরএক্স জাপান লিমিটেডের এক্সিকিউটিভ অফিসার হাজিমে সুজুকি মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন।
হাজিমে সুজুকি বলেন, জাপানে রপ্তানি বাড়াতে হলে বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের অন্তত তিন বছরের কৌশলগত পরিকল্পনা নিয়ে এগোতে হবে।
