জাপানকে ১,০৩৯ পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা দিচ্ছে বাংলাদেশ
জাপানের নতুন সংসদ বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে হওয়া অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি (ইপিএ) অনুমোদনের পরপরই এটি কার্যকর হবে বলে আশা করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা অবশ্য বলেছেন, এই চুক্তির ফলে শুরুতে বাংলাদেশ প্রাথমিকভাবে বছরে প্রায় ২০ কোটি টাকা রাজস্ব হারাতে পারে। তবে এর মাধ্যমে রপ্তানি, সেবা খাত, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের বড় সুযোগ তৈরি হবে।
আজ সোমবার বিকেলে সচিবালয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানানো হয়। জাপানের সাথে ইপিএ বিষয় তুলে ধরতে আয়োজিত এই সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেন বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন ও বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান।
গত শুক্রবার (৬ ফেব্রুয়ারি) জাপানের রাজধানী টোকিওতে এই চুক্তি স্বাক্ষর হয়। বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন ও জাপানের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হোরি ইওয়াও চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। গত বছরের ২৪ মার্চ এই চুক্তি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। ২১টি বিষয়ে সাত দফা আলোচনার পর এ চুক্তি স্বাক্ষর হয়।
চুক্তি কার্যকর হওয়ার দিন থেকে বাংলাদেশ জাপানকে এক হাজার ৩৯টি পণ্য শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার দিয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশকে ৭ হাজার ৩৭৯টি পণ্যে এই সুবিধা দিয়েছে জাপান। উল্লেখ্য, বর্তমানে বাংলাদেশের ট্যারিফ লাইনে ৭ হাজার ৪৫৮টি পণ্য রয়েছে।
বাণিজ্য সচিব বলেন, জাপানকে আরও কিছু পণ্যে বাংলাদেশের বাজারে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার দেওয়া হবে। ডাব্লিউটিওর প্রিন্সিপাল অনুযায়ী ৮০ শতাংশ পণ্যে শুল্ক সুবিধা দিতে হয়। তবে সেটা ৫ থেকে ১৫ বছরে দেওয়া হবে। সেটি ধাপে ধাপে দেওয়া হবে। নির্দিষ্ট পণ্যের ক্ষেত্রে ১৮ বছর পরে এই সুবিধা দেওয়া হবে।
তিনি বলেন, পণ্যের পাশাপাশি সেবার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ১২০টি সেবায় জাপানে শুল্কমুক্তভাবে কাজ করতে পারবে। বাংলাদেশ জাপানের ৯৮টি সেবা উন্মুক্ত করেছে। বর্তমানে ফাইভ স্টার হোটেল ও মোবাইল ফোন সেবা এই দুটো সেক্টর উন্মুক্ত আছে। ফলে সেবা খাতে বাংলাদেশে জাপানের বিনিয়োগ আশা করা হচ্ছে।
মাহবুবুর রহমান বলেন, এই চুক্তির একটি বিশেষ দিক হচ্ছে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক জাপানের বাজারে সিঙ্গেল স্টেজ ট্রান্সফরমেশন সুবিধা পাবে। অর্থাৎ কাপড় আমদানি করে তার থেকে পোশাক তৈরি করে মাত্র ৩০ শতাংশ ভ্যালু অ্যাডিশন করে জাপানে রপ্তানি করা যাবে।
তিনি বলেন, চুক্তি অনুমোদনের জন্য সংসদে তুলতে হয়। জাপানে ৮ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন হয়েছে। ন্যাশনাল ডায়েট (সংসদ) শিঘ্রই কার্যকর হবে। সংসদ অনুমোদনের পরপরই চুক্তি কার্যকর হবে। তবে বাংলাদেশের দিক থেকে চুক্তি কার্যকর করা নিয়ে তাড়াহুড়ো নেই, কারণ এলডিসি হিসেবে জাপানে ইতিমধ্যে বাংলাদেশ শুল্কমুক্ত সুবিধা পাচ্ছে। জাপান ২০২৯ সাল পর্যন্ত এই সুবিধা বাড়িয়ে দিয়েছে।
মাহবুবুর রহমান বলেন, ইতিমধ্যে অনেক পণ্যই বাংলাদেশে শুন্য শুল্কে প্রবেশ করছে। যেমন খাদ্য পণ্য, তুলা ও সুতায় শূন্য শুল্ক রয়েছে। মেশিনারিজে আছে ১ শতাংশ। এই শূন্য শুল্কের পণ্য ও ১ শতাংশ শুল্কের পণ্য মিলিয়ে জাপনকে এক হাজার ৩৯টি পণ্যে শূন্য শুল্ক সুবিধা দেওয়া হয়েছে। ফলে ইমিডিয়েটলি বাংলাদেশ তেমন কোনো রাজস্ব হারাচ্ছে না।
বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন বলেন, প্রাথমিকভাবে বছরে ২০ কোটি টাকা বা তার কম রাজস্ব কমবে।
এক প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্য উপদেষ্টা বলেন, এই চুক্তির ফলে অর্থনীতির উদার সম্ভাবনা তৈরি হলো। পণ্য, সেবা রপ্তানি ও বিনিয়োগ সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে। বাংলাদেশিদের জাপানে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হলো। এই চুক্তির প্রক্রিয়ার মধ্যেই বাংলাদেশ থেকে জাপানে মানুষ যাওয়া অনেক বেড়েছে। জাপান এখানে অনেক ল্যাংগুয়েজ ইনস্টিটিউট করবে। সেখান থেকে যারা ভাষা শিখবে, তারা দক্ষতা অনুযায়ী সহজেই জাপানে বিভিন্ন চাকরির সুযোগ পাবে।
রমজানে তেমন চ্যালেঞ্জ নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, বন্দরের ধর্মঘট ১৬ তারিখ পর্যন্ত প্রত্যাহার করা হয়েছে। ১২ তারিখে নির্বাচন হবে। দ্রুত পরবর্তী সরকার গঠন করা হবে। আগামী সরকার এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে। ধর্মঘট করা গণতান্ত্রিক অধিকার, সেই অধিকারে শ্রমিকরা ধর্মঘট করতে পারে। ধর্মঘট চলমান থাকলে বাজারে তার নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। এটা অস্বীকার করার কোনো কারণ নেই। তবে রমজানের বাজার স্থিতিশীল রাখার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে ব্যবসায়ীরা যাতে প্রয়োজনীয় পণ্য আমদানি করতে পারে, তার সব ধরনের সহায়তা করা হয়েছে। এবং এতো পরিমাণ আমদানি হয়েছে যে এই পরিমাণ পণ্য রাখার জন্য প্রয়োজনীয় গোডাউন দেশে নেই। যে কারণে পণ্য নিয়ে জাহাজ সমুদ্রে ভাসছে।
তিনি বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকৃত তথ্য সংগ্রহ না করেই এক ধরনের খবর ছড়িয়ে দেওয়া হয়, অস্থিরতা সৃষ্টির জন্য। এই অস্থিরতা বিরাজ করলে অবশ্যই বাজার অস্থির হবে। আমরা মনে করি আগামী রমজান, গত রমজানের থেকেও ভালো হবে। আগামী রমজানে সকল কিছুতেই স্বস্তি থাকবে।
জাপানের সাথে ইপিএর চ্যালেঞ্জ কি জানতে চাইলে বাণিজ্য উপদেষ্টা বলেন, এলডিস উত্তরণের পরে ডাব্লিউটিও ফ্রেমওয়ার্ক অনুযায়ী বাণিজ্য উদার করতে হবে। এই বাণিজ্য উদার করার ক্ষেত্রে দেশের ব্যবসায়ীরা যদি সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে না পারে, তাহলে অবশ্যই জাপানের সাথে করা ইপিএ বাংলাদেশের জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে। এই চুক্তির ফলে ১৮ বছর ধরে বিভিন্ন খাতে সক্ষমতা সৃষ্টির সুযোগ পাওয়া যাবে। সর্বোপরি ভোক্তা উপকৃত হবেন।
