বেকারি থেকে মৎস্যখাদ্য: বৈচিত্র্যময় চাহিদায় গম আমদানিতে রেকর্ড
অর্থবছর শেষ হতে এখনও প্রায় তিন মাস বাকি থাকতেই গম আমদানিতে অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়েছে বাংলাদেশ। বেকারি, প্রক্রিয়াজাত খাদ্যশিল্প ও মৎস্য খাদ্য উৎপাদনে বাড়তি চাহিদা এবং বিশ্ববাজারে দাম কমার কারণে আমদানিতে এ বৃদ্ধি ঘটেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
খাদ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, চলতি অর্থবছরের বাকি তিন মাসে আরও প্রায় ১০–১৫ লাখ টন গম আমদানি হতে পারে।
সরকারি ও বেসরকারি—দুই খাতেই গম আমদানি হয়। খাদ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে সরকারি খাতে ৫.৮৩ লাখ টন এবং বেসরকারি খাতে ৬১.৬০ লাখ টন গম আমদানি হয়েছে। এ সময়ে মোট আমদানি দাঁড়িয়েছে ৬৭.৪৩ লাখ টনে। এর আগের অর্থবছরে ৬২.৩৫ লাখ টন গম আমদানি হয়েছিল।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তনের পাশাপাশি বেকারি পণ্য, প্রক্রিয়াজাত খাবার ও মৎস্য খাদ্যে গমের ব্যবহার বৃদ্ধির কারণে চাহিদা বেড়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কম থাকায় প্রতিষ্ঠানগুলো প্রয়োজনের চেয়েও বেশি গম কিনেছে।
খাদ্য অধিদপ্তরের সংগ্রহ বিভাগের পরিচালক মো. মনিরুজ্জামান বলেন, "মানুষের খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন হচ্ছে। ফলে গত কয়েক বছরে গমের চাহিদা বেড়েছে। এ বছর আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি গম আমদানি হয়েছে।"
দেশে গমের বার্ষিক চাহিদা প্রায় ৭০–৮০ লাখ টন। এর বাইরে স্থানীয়ভাবে বছরে প্রায় ১০–১২ লাখ টন গম উৎপাদন হয়। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে ১১.১৪ লাখ টন গম উৎপাদন হতে পারে। আগের অর্থবছরে উৎপাদন হয়েছিল ১০.৪১ লাখ টন।
চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে ৩৫.৩৫ লাখ টন গম আমদানি হয়। আর জানুয়ারি থেকে ৮ এপ্রিল পর্যন্ত আমদানি হয়েছে ৩২.০৮ লাখ টন।
সংশ্লিষ্টরা জানান, রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে ২০২২ সালে গমের দাম সর্বোচ্চ পর্যায়ে ওঠে। পরে গত বছরের মাঝামাঝি সময়ে দাম প্রায় অর্ধেকে নেমে আসে। এরপর দাম খুব বেশি বাড়েনি। দাম কমে আসায় বেসরকারি খাতে অতিরিক্ত আমদানি হয়েছে।
বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিরা বলছেন, খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তনের কারণে বেকারি পণ্যের চাহিদা বেড়েছে। এক দশক আগে যেখানে হাতেগোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠান এ খাতে ছিল, এখন সেখানে বড় বড় শিল্পগ্রুপ বিনিয়োগ করছে। হোটেল-রেস্তোরাঁ ও স্ট্রিট ফুডের চাহিদাও বেড়েছে। বর্তমানে নুডলস, বিস্কুট, পাউরুটি, চানাচুর, বিভিন্ন স্ন্যাকস, শুকনা খাবার ও হিমায়িত খাদ্যপণ্য উৎপাদনে গম ব্যবহৃত হচ্ছে। এসব পণ্য দেশে বাজারজাতের পাশাপাশি রপ্তানিও হচ্ছে।
খাদ্যশিল্পে গড়ে ওঠা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে অন্যতম প্রাণ–আরএফএল গ্রুপ। প্রতিষ্ঠানটির খাদ্যপণ্য উৎপাদনে বছরে প্রায় আড়াই লাখ টন গম প্রয়োজন হয়। ২–৩ বছর আগে এ চাহিদা ছিল প্রায় ১.৮০ লাখ টন। প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রতি বছরই এ চাহিদা বাড়ছে।
প্রাণ–আরএফএল গ্রুপের বিপণন পরিচালক কামরুজ্জামান কামাল বলেন, "খাদ্যপণ্যের বাজার দিন দিন বড় হচ্ছে, পাশাপাশি বৈচিত্র্যও বাড়ছে। গমভিত্তিক পণ্যের চাহিদা বাড়ছে এবং এসব পণ্য বিদেশেও রফতানি হচ্ছে।"
মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের উপমহাব্যবস্থাপক তাসলিম শাহরিয়ার বলেন, "গমের চাহিদা অনেক বেড়েছে। আগে প্রায় ৫০ লাখ টন আমদানি হতো, এখন তা প্রায় ৭০ লাখ টনে পৌঁছেছে। খাবারের বৈচিত্র্য ও মানুষের আগ্রহ বাড়ায় আমদানিও বেড়েছে।"
এসি আই অ্যাগ্রোলিংক লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. এফ এইচ আনসারী বলেন, "চালের তুলনায় গমভিত্তিক খাবারের প্রতি মানুষের আগ্রহ বেড়েছে। স্বাস্থ্য সচেতনতার কারণেও গমের চাহিদা বাড়ছে।"
খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন
দেশে বেকারি পণ্যের বাজারের সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান না থাকলেও খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, এর আকার প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা। সারা দেশে প্রায় ৭ হাজার ম্যানুয়াল ও লাইভ বেকারি রয়েছে, যেখানে প্রায় ১০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। শুধু রাজধানীতেই বেকারির সংখ্যা প্রায় হাজারের কাছাকাছি।
গত কয়েক বছরে বড় কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোও এ খাতে উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ করেছে। ফলে গমের ব্যবহার ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে।
বাংলাদেশ রুটি, বিস্কুট ও কনফেকশনারি প্রস্তুতকারক সমিতির সাধারণ সম্পাদক এবং হক বেকারির স্বত্বাধিকারী মো. রেজাউল হক রেজু বলেন, "বেকারি খাত গমের ওপর নির্ভরশীল। করোনার সময় প্রথম দফায় আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হই। এরপর রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়ি। অনেক বেকারি বন্ধ হয়ে যায়, কারণ অধিকাংশ গম ইউক্রেন থেকে আসত। তবে গত এক–দেড় বছরে খাতটি অনেকটা ঘুরে দাঁড়িয়েছে।"
তিনি বলেন, বেকারি খাতে প্রতিনিয়ত বৈচিত্র্য বাড়ছে, ফলে মানুষের চাহিদাও বাড়ছে। ডায়াবেটিসের কারণে অনেকেই ভাত কম খাচ্ছেন। পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের শিশুদের মধ্যে বেকারি পণ্যের প্রতি আগ্রহ বেশি। এতে সামগ্রিকভাবে গমের ব্যবহার বাড়ছে।
বর্তমানে মানুষের খাদ্যাভ্যাসে ভাতের পরিবর্তে গমভিত্তিক খাবারের প্রতি আগ্রহ বাড়ছে। স্বাস্থ্যসচেতনতার কারণে অনেকেই দিনে এক বেলা ভাত পরিহার করছেন। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) খানা আয়–ব্যয় জরিপেও এ প্রবণতা উঠে এসেছে।
সংস্থাটির ২০২৩ সালে প্রকাশিত জরিপ অনুযায়ী, ২০১৬ সালে একজন মানুষ দিনে গড়ে ১৯.৮ গ্রাম গমজাত খাবার গ্রহণ করতেন। ২০২২ সালে তা বেড়ে ২২.৯ গ্রামে দাঁড়ায়; অর্থাৎ ছয় বছরে গমজাত খাবারের ব্যবহার বেড়েছে প্রায় ১৫.৬৫ শতাংশ। এর মধ্যে শহরাঞ্চলে এ হার বেড়েছে প্রায় ২৬ শতাংশ।
অন্যদিকে একই সময়ে মাথাপিছু চাল খাওয়ার হার কমেছে প্রায় ১০.৪৩ শতাংশ।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, চালের দাম বৃদ্ধি এবং গমের দাম কমে যাওয়াও গমের ব্যবহার বাড়ার একটি কারণ।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, তিন বছর আগে মোটা চালের তুলনায় খোলা আটার দাম কেজিতে ৮–৯ টাকা বেশি ছিল। বর্তমানে আটা চালের তুলনায় কেজিতে প্রায় ১৫ টাকা সস্তা।
ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) হিসাবে, বর্তমানে মোটা চালের দাম প্রতি কেজি ৫৫–৬০ টাকা। অপরদিকে খোলা আটার দাম ৪০–৪৫ টাকা। অথচ ২০২৩ সালের একই সময়ে মোটা চালের দাম ছিল ৪৬–৫০ টাকা এবং খোলা আটার দাম ছিল ৫৫–৫৮ টাকা।
ফিড শিল্পে চাহিদা বাড়ছে
গমের উপজাত ভুসি প্রাণী ও পশুখাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়। কিছু ক্ষেত্রে সরাসরি গমও পশুখাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়, তবে সবচেয়ে বেশি ব্যবহার হয় মৎস্যখাদ্যে।
ফিড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশের সাধারণ সম্পাদক এবং পদ্মা ফিড অ্যান্ড চিকস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আনোয়ারুল হক বলেন, "মৎস্যখাদ্যে প্রায় ১৮–২২ শতাংশ গম ব্যবহার হয়। দেশে বাণিজ্যিকভাবে মাছ চাষ বাড়ছে, ফলে ফিডের চাহিদাও বাড়ছে। মাছের ক্ষেত্রে ভাসমান খাদ্যের চাহিদা বেশি।"
তিনি বলেন, "এর প্রভাবে এ খাতে আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় গমের ব্যবহার বেড়েছে। পাশাপাশি পশুখাদ্যেও গমের ব্র্যান ভুসি হিসেবে ব্যবহৃত হয়।"
ভিন্নমত
তবে গম আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান টি কে গ্রুপের পরিচালক মো. শফিউল আতহার তাসলিম বলেন, "গমভিত্তিক খাদ্যপণ্যের বড় বাজার রয়েছে। তবে গমের চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে—এটা বলা যাবে না। এ বছর চাহিদার চেয়েও বেশি আমদানি হয়েছে। কোনো বছর কম, কোনো বছর বেশি আমদানি হয়।"
