বিশ্ববাজারে দরপতন ও নীতিগত সমন্বয়হীনতায় চাহিদার তুলনায় অনেক বেশি গম আমদানি; বন্দরে জাহাজ জট
২০২৫-২০২৬ অর্থবছরের অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে বাংলাদেশ ২২ লাখ টনেরও বেশি গম আমদানি করেছে। সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের অভাব ও যথাযথ বাজার তদারকি না থাকায় এ সময়ে আগের একই সময়ের তুলনায় গম আমদানি বেড়েছে প্রায় ৫৭.৬৬ শতাংশ।
পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা ছাড়াই আমদানির এই হিড়িক পড়ায় চট্টগ্রাম বন্দরে বড় ধরনের জাহাজ জট তৈরি হয়েছে। বর্তমানে বন্দরে প্রায় ১৫ লাখ টন গম নিয়ে ২৬টি মাদার ভেসেল (বড় জাহাজ) অপেক্ষমাণ রয়েছে বলে জানান আমদানিকারক ও বন্দর কর্মকর্তারা।
বন্দরের উদ্ভিদ সঙ্গনিরোধ কেন্দ্রের তথ্যমতে, মূলত আন্তর্জাতিক বাজারে গমের দাম কমে যাওয়া ও সরকারের সমন্বিত নজরদারির অভাবে গম আমদানিতে হুমড়ি খেয়ে পড়ছেন ব্যবসায়ীরা। এতে বন্দরের লজিস্টিক সেবাগুলোকে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে, স্পষ্ট হয়ে উঠেছে পণ্য খালাস সক্ষমতার কাঠামোগত দুর্বলতা।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, সমস্যাটি গমের ওপর দেশের আমদানিনির্ভরতা নিয়ে নয়, বরং প্রকৃত মাসিক চাহিদার তুলনায় একই সময়ে অতিরিক্ত পণ্যবাহী জাহাজের আগমন নিয়ে।
গমের বার্ষিক চাহিদা প্রায় ৭০ লাখ টন হলেও তার মাত্র ১০ লাখ টন দেশে উৎপাদিত হয়, বাকি ৬০ লাখ টনের জন্য আমদানির ওপর নির্ভর করতে হয়।
আমদানিকারকসহ অন্যরা বলছেন, দেশে প্রতি মাসে গমের চাহিদা যেখানে ৫ থেকে ৬ লাখ টন, সেখানে চাহিদার প্রায় দ্বিগুণ গম একসঙ্গে চলে আমদানি হয়েছে গত কয়েক মাসে।
শিপ হ্যান্ডলিং অ্যান্ড বার্থ অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশনের মতে, চাহিদা ও আমদানির এই ভারসাম্যহীনতা বন্দরের ওপর অসহনীয় চাপ সৃষ্টি করেছে।
বার্থ অপারেটরদের তথ্যমতে, বহির্নোঙরে নোঙর করা বড় জাহাজ থেকে পণ্য খালাসের জন্য বর্তমানে পর্যাপ্ত লাইটার জাহাজ (ছোট জাহাজ) পাওয়া যাচ্ছে না। স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে একটি বড় জাহাজ খালাস করতে যেখানে সর্বোচ্চ ১০-১২ দিন লাগার কথা, সেখানে এখন লাইটার সংকটের কারণে এক মাসেরও বেশি সময় লেগে যাচ্ছে।
এই দীর্ঘসূত্রতার কারণে আমদানিকারকদের প্রতিদিন বিশাল অংকের ডেমারেজ বা জরিমানার টাকা গুনতে হচ্ছে, যা ব্যবসার খরচ বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, বন্দরের এই জট নিরসন না হলে অতিরিক্ত খরচের এই বোঝা শেষপর্যন্ত সাধারণ ভোক্তাদেরই বইতে হবে।
দেশের বৃহত্তম পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জের গম ব্যবসায়ী মো. সুমন টিবিএসকে বলেন, নীতিগত পর্যায়ে দুর্বল সমন্বয়ই এই বিশৃঙ্খলার মূল কারণ। 'আমদানি নিয়ে সরকারের কোনো নিয়ন্ত্রণ বা সঠিক মনিটরিং নেই। একসঙ্গে এত বেশি গম চলে এসেছে যে বন্দরে জাহাজ জট লেগে গেছে। লাইটার জাহাজ না পাওয়ায় মাদার ভেসেলগুলো দিনের পর দিন বসে থাকছে এবং ব্যবসায়ীদের বিশাল অঙ্কের ডেমারেজ গুনতে হচ্ছে।'
'এই অব্যবস্থাপনার কারণে ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং শেষপর্যন্ত এর প্রভাব পড়ছে সাধারণ ভোক্তার ওপর। সরকার যদি নিয়ম করে দিত যে কে কতটুকু আনতে পারবে, তবে আজ এই বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হতো না,' বলেন তিনি।
ব্যবসায়ীরা আশঙ্কা করছেন, অনিয়ন্ত্রিত আমদানি অব্যাহত থাকলে বাজারে কৃত্রিম বিশৃঙ্খলা তৈরি হতে পারে। এতে বিশ্ববাজারে গমের দাম তুলনামূলক কম থাকলেও অনেক ব্যবসায়ী আর্থিক সংকটের মুখে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন।
তবে নাবিল গ্রুপের আমদানি প্রতিনিধি সাইফুল আলম বলেন, আমদানির এই বৃদ্ধি হয়েছে আংশিক ঋতুভিত্তিক এবং লজিস্টিক-সংক্রান্ত কারণে।
তিনি বলেন, 'রমজানকে সামনে রেখে বাজারদর যাতে নাগালের মধ্যে থাকে, তাই ব্যবসায়ীরা গম আমদানি করছেন। এছাড়া আগস্ট-সেপ্টেম্বরে রাশিয়া ও আর্জেন্টিনায় ঝড়-বৃষ্টির কারণে পণ্য লোড করতে বিলম্ব হয়—যা পরবর্তীতে নভেম্বর-ডিসেম্বরের দিকে আনা হয়। এর ফলে চাহিদা ৬-৭ লাখ টন হলেও ১০-১২ লাখ টন গম এসেছে।'
এই সমস্যার সমাধানে বা স্পষ্ট ব্যাখ্যার জন্য বিভিন্ন সরকারি সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তাদের মধ্যে দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা দেখা গেছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের আমদানি ও রপ্তানি নিয়ন্ত্রক দপ্তর থেকে এ বিষয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলা হয়। কিন্তু কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর আবার বিষয়টির দায়ভার অন্যান্য দপ্তরের দিকে ঠেলে দেয়।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সরেজমিন উইংয়ের পরিচালক মো. ওবায়দুর রহমান মন্ডল টিবিএসকে বলেন, গম এই মুহূর্তে একটি আমদানিনির্ভর পণ্য।
তিনি আরও বলেন, 'আমদানির কারণে বাজারে কোন প্রভাব পড়বে না। কারণ গম তো সারা বছরই আমদানি করতে হয়। আমদানির ক্ষেত্রে সরকারের ওপর নির্ভর করে কোন সময় কী পলিসি নিতে হবে। এখন চাহিদাকে কেন্দ্র করে মূলত আমদানি করা হচ্ছে। আমদানিটা আসলে অধিকাংশটাই তো বেসরকারি পর্যায়ে তারা তাদের সক্ষমতা অনুযায়ী এনে গোডাউনে রাখে।'
সম্প্রতি খাতুনগঞ্জ পাইকারি বাজার ঘুরে দেখা গেছে, রাশিয়া ও ব্রাজিলের গম মণপ্রতি ১ হাজার ২৪০ থেকে ১ হাজার ২৬০ টাকায়, কানাডার গম ১ হাজার ৩৭০ থেকে ১ হাজার ৪০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
তবে ব্যবসায়ীরা আশঙ্কা করছেন, বন্দরে দীর্ঘস্থায়ী জট ও ক্রমবর্ধমান লজিস্টিক খরচ আগামী মাসগুলোতে গমের দামকে ঊর্ধ্বমুখী করে তুলতে পারে।
বন্দরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের অক্টোবরে মোট ৪ লাখ ৬৪ হাজার টন গম আমদানি হয়েছে। ২০২৪ সালের অক্টোবরে আমদানির পরিমাণ ছিল ২ লাখ ১৮ হাজার টন। ফলে এক বছরের ব্যবধানে শুধু অক্টোবরেই মাসেই আমদানি প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১১২.৭৭ শতাংশ।
২০২৫ সালের নভেম্বরে এক মাসে সর্বোচ্চ ৯ লাখ ৩৭ হাজার টন গম আমদানি হয়েছে দেশে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১০২.৫ শতাংশ বেশি। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ৮.১১ লাখ টন গম আমদানি হয়েছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১২.২৮ শতাংশ বেশি।
সব মিলিয়ে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে (জুলাই-ডিসেম্বর) বাংলাদেশ ৩২.৪৮ লাখ টনেরও বেশি গম আমদানি করেছে। ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, আমদানির সুপরিকল্পিত কাঠামো ও শক্তিশালী তদারকি না থাকলে বন্দরের জট ও বাড়তি খরচের চাপ দেশের সরবরাহ ব্যবস্থাকে আরও বিপর্যস্ত করে তুলবে।
