উৎপাদন খরচ বাড়লেও আগের দামেই ধান-চাল কিনবে সরকার
চলতি বোরো মৌসুমে ডিজেল সংকট ও লোডশেডিংয়ের কারণে কৃষকের উৎপাদন খরচ বাড়লেও সরকার আগের বছরের দামেই ধান-চাল কেনার ঘোষণা দিয়েছে।
সরকার অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে কেজিপ্রতি ৩৬ টাকা দরে ৫ লাখ টন ধান এবং ৪৯ টাকা দরে ১২ লাখ টন সিদ্ধ চাল কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ধান-চালের পাশাপাশি কেজিপ্রতি ৪৮ টাকা দরে ১ লাখ টন আতপ চাল এবং ৩৬ টাকা দরে ৫০ হাজার টন গম কেনা হবে।
বুধবার (২২ এপ্রিল) সচিবালয়ে খাদ্য পরিকল্পনা ও পরিধারণ কমিটির (এফপিএমসি) সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
গত বছরও বোরো মৌসুমে এই একই দামে ধান, চাল ও গম কেনা হয়েছিল। তবে তখন সাড়ে ৩ লাখ টন ধান ও ১৪ লাখ টন সিদ্ধ চাল কেনার সিদ্ধান্ত হয়েছিল। এবার ধান সংগ্রহ দেড় লাখ টন বাড়ানো হয়েছে।
কমিটি সূত্রে জানা যায়, আগামী ৩ মে থেকে ধান ও গম সংগ্রহ শুরু হবে এবং ১৫ মে থেকে চাল সংগ্রহ শুরু হবে। এই কার্যক্রম চলবে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গত বছরের তুলনায় এ বছর কৃষকের উৎপাদন খরচ বেড়েছে। সেচ, সার ও হারভেস্টার ভাড়ায় বেশি খরচ হওয়ায় ধানের দাম না বাড়লে কৃষক লোকসানে পড়বেন।
বাংলাদেশ কৃষি অর্থনীতিবিদ সমিতির সাবেক সভাপতি ও ইউনিভার্সিটি অব গ্লোবাল ভিলেজের সাবেক উপাচার্য ড. জাহাঙ্গীর আলম খান বলেন, "ডিজেল সংকটের কারণে কৃষক বেশি দামে ডিজেল কিনে সেচ দিয়েছেন। লোডশেডিংয়েও সেচ খরচ বেড়েছে। হারভেস্টার ভাড়াও বেড়েছে। ভারী বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতার কারণে প্রায় ১০ শতাংশ ফলন কমতে পারে। এতে উৎপাদন খরচ আরও বাড়বে।"
তিনি বলেন, "সরকার নির্ধারিত দামে কৃষকের লোকসান হতে পারে। কেজিতে আরও ২-৩ টাকা বাড়ালে হয়তো লোকসান হবে না।"
কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত মৌসুমের তুলনায় এ বছর তাদের উৎপাদন খরচ বেড়েছে। ডিজেল সংকটে অনেকেই বেশি দামে জ্বালানি কিনেছেন। শ্রমিক খরচ ও সেচ ব্যয়ও বেড়েছে।
নওগাঁ সদর উপজেলার হাঁসাইগাড়ি ইউনিয়নের কৃষক আজাহার আলী ১০ বিঘা জমিতে বোরো চাষ করেছেন। তিনি বলেন, প্রতি বিঘায় ২০-২৫ মণ ধান উৎপাদন হয় এবং খরচ প্রায় ২০ হাজার টাকা। সার ও কীটনাশকের দাম বেড়েছে। জ্বালানি খরচও প্রায় দেড়গুণ হয়েছে।
সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জ উপজেলার কৃষক তিতন মিয়া বলেন, "সরকারি দাম বাড়লেও ডিজেল পাওয়া যাচ্ছে না। খুচরা বাজার থেকে বেশি দামে কিনতে হচ্ছে।"
সুলেমানপুর গ্রামের কৃষক সিরাজুল ইসলাম বলেন, "এ বছর প্রতি কিয়ার জমিতে ধান কাটতে ২ থেকে আড়াই হাজার টাকা নেওয়া হচ্ছে, যা গত বছর ছিল ১,৭০০ থেকে ১,৮০০ টাকা। ডিজেল সংকটের কারণে কৃষকদের বেশি খরচে ধান কাটাতে হচ্ছে।"
বর্তমান মজুত ও আমদানির ব্যাপারে সিদ্ধান্ত
সভা শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, দেশে বর্তমানে পর্যাপ্ত চালের মজুত রয়েছে। সরকারি গুদামে ১৭ থেকে ১৮ লাখ মেট্রিক টন চাল রয়েছে। জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তার জন্য কমপক্ষে ১৩ লাখ মেট্রিক টন চালের নিরাপত্তা মজুত রাখা বাধ্যতামূলক।
তিনি বলেন, প্রয়োজনে এ মজুত ২৪-২৫ লাখ মেট্রিক টনে উন্নীত করার সক্ষমতা সরকারের রয়েছে এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা সমন্বয় করা হবে।
মন্ত্রী বলেন, "দেশে বছরে প্রায় ৪ কোটি ২৪ লাখ মেট্রিক টন চালের চাহিদা রয়েছে। অনুকূল আবহাওয়ায় এবার ভালো ফলনের আশা করা হচ্ছে, তাই আপাতত চাল আমদানির প্রয়োজন নেই।"
তবে গমের ক্ষেত্রে দেশ আমদানিনির্ভর। বছরে প্রায় ৮০ লাখ মেট্রিক টন গমের চাহিদা থাকলেও দেশে উৎপাদন ৮ থেকে ১০ লাখ টন। এ কারণে সরকার জি-টু-জি ও উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে ৮ লাখ মেট্রিক টন গম আমদানির পরিকল্পনা নিয়েছে। ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রায় ৭ লাখ মেট্রিক টন গম আমদানির বিষয়ে সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে।
মন্ত্রী আরও জানান, চট্টগ্রাম, সিলেট ও খুলনা অঞ্চলে আতপ চালের চাহিদাকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। কোথাও ঘাটতি হলে অন্য এলাকা থেকে সংগ্রহ করে সরবরাহ নিশ্চিত করা হবে। দেশে খাদ্যের ঘাটতি না হয়, সে বিষয়ে সরকার সতর্ক রয়েছে।
- প্রতিবেদনটিতে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করেছেন দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড-এর সিলেট প্রতিনিধি দেবাশীষ দেবু এবং বগুড়ার খোরশেদ আলম।
