ঢাকা বিমানবন্দরে কার্গো জট, নতুন করে বাড়ছে নিরাপত্তা উদ্বেগ
ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আবারও আমদানি পণ্যের চালান জমে যাচ্ছে, কারণ অনেক আমদানিকারক নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পণ্য খালাস করছেন না। এতে পণ্যজট বাড়ছে এবং নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
ঢাকা কাস্টমস হাউস সতর্ক করে জানিয়েছে, পণ্য খালাসে বিলম্বের কারণে বিমানবন্দরের কার্গো এলাকায় কার্যক্রম পরিচালনায় সমস্যা তৈরি হচ্ছে এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে।
১২ এপ্রিল ঢাকা কাস্টমস হাউজের কমিশনার মো. মসিউর রহমান ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই এবং তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএর কাছে চিঠি দিয়ে আইন অনুযায়ী বিল অব এন্ট্রি দাখিলের ২১ দিনের মধ্যে পণ্য খালাস করার জন্য আমদানিকারকদের আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, এ নির্দেশনা না মানলে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এর আগে ৩০ মার্চ বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের উপ-মহাব্যবস্থাপক (কার্গো আমদানি) মো. জাহিদুজ্জামান বিজিএমইএর সভাপতিকে চিঠি দিয়ে দ্রুত পণ্য খালাসের অনুরোধ জানান।
তিনি সতর্ক করে বলেন, পণ্য খালাসে বিলম্ব বিমানবন্দরের নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে এবং হ্যান্ডলিং কার্যক্রম ব্যাহত করছে।
এদিকে বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, ঈদের সময় লম্বা ছুটির কারণে পণ্য খালাসে কিছুটা বিলম্ব হয়েছে।
তিনি দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, 'এখন কারখানাগুলো পুরোদমে চালু হয়েছে এবং সদস্য কারখানাগুলোকে নিয়ম মেনে দ্রুত পণ্য খালাসের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।'
কাস্টমস কমিশনার তার চিঠিতে বলেন, ২০২৫ সালের কার্গো ভিলেজের অগ্নিকাণ্ড অব্যবস্থাপনার মধ্যে দীর্ঘ সময় পণ্য ফেলে রাখার গুরুতর ঝুঁকিগুলোকে সামনে এনেছে।
তিনি উল্লেখ করেন, অনেক পণ্যচালান এখনও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ঘোষণা বা খালাস করা হচ্ছে না, যা জট সৃষ্টি করছে এবং দুর্ঘটনার আশঙ্কা বাড়িয়ে দিচ্ছে।
কাস্টমস আইন, ২০১৩ অনুযায়ী, কোনো কাস্টমস স্টেশনে পণ্য পৌঁছানোর পর ৫ কার্যদিবসের মধ্যে আমদানিকারক বা তার মনোনীত সিএন্ডএফ এজেন্টকে বিল অব এন্ট্রি দাখিল করতে হবে।
এরপর শুল্ক ও কর পরিশোধসহ সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে ২১ দিনের মধ্যে পণ্য খালাস করতে হবে।
এসব নিয়মাবলি থাকা সত্ত্বেও পণ্য খালাসে বিলম্ব এখনো একটি নিয়মিত ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা। এই পরিস্থিতিতে আমদানিকারক এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের নিয়মগুলো যথাযথভাবে মেনে চলার জন্য নতুন করে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
এদিকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের উপ-মহাব্যবস্থাপক (কার্গো আমদানি) মো. জাহিদুজ্জামান তার চিঠিতে বলেন, গুদামের সীমিত ধারণক্ষমতার কারণে বর্তমানে কিছু পণ্য খোলা জায়গায় রাখা হচ্ছে, যা আবহাওয়ার কারণে ক্ষতির ঝুঁকিতে রয়েছে।
তিনি আরও জানান, অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত আমদানি কার্গো ভবনের জোন-বি এলাকায় সংস্কার কাজ চলছে এবং পাশের স্থাপনাগুলোর মেরামত কাজও শুরু হয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক টিবিএসকে বলেন, অগ্নিকাণ্ডের পর অবকাঠামো উন্নয়ন এবং গুদাম স্থাপনে যে বিলম্ব হয়েছে, তা এই সমস্যাকে বাড়িয়েছে।
তিনি বলেন, 'এত বড় দুর্ঘটনার পরও বেসামরিক বিমান চলাচল মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো পণ্য সংরক্ষণের যথাযথ ব্যবস্থা নেয়নি।' পাশাপাশি তিনি কর্তৃপক্ষগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের অভাব এবং কার্যক্রমে ধীরগতির অভিযোগ করেন।
২০২৫ সালের ১৮ অক্টোবর বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজ এলাকায় অগ্নিকাণ্ডের পর কার্গো ব্যবস্থাপনা নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়ে যায়। ব্যবসায়ীরা এ ঘটনায় প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে অনুমান করেন।
ওই ঘটনার পর দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। পরে কমিটি জানায়, বিমানবন্দরে 'বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড' (বিএনবিসি) অনুসরণ করা হয়নি।
প্রতিবেদনে বলা হয়, অ্যাপ্রোন এলাকায় স্তূপ করে রাখা পণ্যের কারণে অগ্নিকাণ্ডের সময় ফায়ার সার্ভিসের যানবাহন ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে বাধাগ্রস্ত হয়। এছাড়া সঠিক সংরক্ষণ ব্যবস্থাপনার অভাব, দাহ্য পণ্যের জন্য নিরাপত্তা ব্যবস্থার ঘাটতি এবং অগ্নি প্রতিরোধ সুবিধার অপ্রতুলতাও উল্লেখ করা হয়।
তদন্তে দেখা গেছে, প্রতিদিন প্রায় ৪০০ টন পণ্য অ্যাপ্রোন এলাকায় পড়ে থাকে, অথচ এর জন্য কোনো কার্যকর তদারকি ব্যবস্থা নেই।
কমিটি আরও উল্লেখ করেছে, ২০১৩ সাল থেকে বিমানবন্দরে অন্তত সাতটি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে, যা এই ধরনের দুর্ঘটনা প্রতিরোধ ও মোকাবিলায় দুর্বল প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতাকেই ফুটিয়ে তুলেছে।
