বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় খোলার আশা
রিক্রুটিং এজেন্সি সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে প্রায় দুই বছর বন্ধ থাকার পর, নতুন সরকারের অধীনে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য পুনরায় খোলার নতুন আশা তৈরি হয়েছে।
মালয়েশিয়ার পুত্রজায়ায় শ্রম অভিবাসন বিষয়ে অনুষ্ঠিত একটি দ্বিপক্ষীয় বৈঠক শেষে বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) এক যৌথ বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, মালয়েশিয়ার বিভিন্ন খাতের চাহিদা অনুযায়ী শ্রমবাজার খোলার প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে দুই দেশ একমত হয়েছে। একই সঙ্গে একটি সুষ্ঠু, নৈতিক ও স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, অভিবাসন ব্যয় কমানো এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য বন্ধ করতে কাঠামোগত চ্যালেঞ্জগুলো নিয়ে কাজ করবে দুই দেশ। এছাড়া, নির্ভরযোগ্য ও যোগ্য রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে কর্মী পাঠানো এবং বর্তমানে আটকে পড়া কর্মীদের নিয়োগ দ্রুত সহজতর করার বিষয়েও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
১০০টি রিক্রুটিং এজেন্সির একটি সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে হাজার হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া এবং ২০২৪ সালের মে মাসের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রায় ১৮ হাজার কর্মীকে পাঠাতে ব্যর্থ হওয়ার অভিযোগের প্রেক্ষাপটে এই নতুন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
তবে এই খাতের সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, আগের সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়া চললে আবারও পুরনো সিন্ডিকেট সক্রিয় হতে পারে। কারণ ওই চুক্তিতে যোগ্য এজেন্সি বেছে নেওয়ার ক্ষমতা মালয়েশিয়াকে দেওয়া হয়েছিল।
গতকালের বৈঠকে মালয়েশিয়ার প্রতিনিধিদলের নেতৃত্বে ছিলেন দেশটির মানবসম্পদ মন্ত্রী রামানান রামাকৃষ্ণান। বাংলাদেশের পক্ষে নেতৃত্ব দেন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী। তার সঙ্গে ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন।
বৈঠকের পর বাংলাদেশি প্রতিনিধিদল মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এ সময় আনোয়ার ইব্রাহিম বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে সুবিধাজনক সময়ে মালয়েশিয়া সফরের আমন্ত্রণ জানান।
মানব পাচার সংক্রান্ত আইনি মামলা নিয়ে আলোচনা
বাংলাদেশে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর শ্রমবাজার নিয়ে আলোচনার উদ্দেশ্যে প্রথম সফর হিসেবে বুধবার মালয়েশিয়া পৌঁছান আরিফুল হক চৌধুরী ও মাহদী আমিন।
মন্ত্রী পর্যায়ের ওই বৈঠকের পর এক যৌথ বিবৃতিতে জানানো হয়, মালয়েশিয়া সকল দেশের কর্মীদের জন্য একটি প্রযুক্তি-নির্ভর ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ভিত্তিক নিয়োগ পদ্ধতি চালু করার উদ্যোগ নিয়েছে। এই ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমানো, অভিবাসন ব্যয় হ্রাস করা এবং নিয়োগের যাবতীয় খরচ যাতে নিয়োগকর্তারাই বহন করেন তা নিশ্চিত করা।
এটি আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) 'এমপ্লয়ার পে প্রিন্সিপাল' [নিয়োগকর্তার খরচ প্রদান] নীতির সাথে সংগতিপূর্ণ, যার ফলে কর্মীদের জন্য এটি কার্যত 'শূন্য অভিবাসন ব্যয়' নিশ্চিত করবে। বাংলাদেশ এই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সহযোগিতার বিষয়ে তাদের পূর্ণ সমর্থন ও প্রস্তুতির কথা জানিয়েছে।
বৈঠকে কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে মানব পাচারসংক্রান্ত চলমান আইনি মামলাগুলো নিয়েও উভয় পক্ষ বিস্তারিত আলোচনা করেছে। মালয়েশিয়ার পক্ষ থেকে তাদের আন্তর্জাতিক সুনাম ক্ষুণ্ণ করতে পারে এমন ভিত্তিহীন বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত পদক্ষেপগুলো মোকাবিলার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, বাংলাদেশ পক্ষ আইনের শাসন সমুন্নত রাখা, স্বচ্ছ বিচারিক প্রক্রিয়া, জবাবদিহি এবং দ্রুত ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে।
সিন্ডিকেট ফেরার আতঙ্ক
মালয়েশিয়া কর্তৃপক্ষ আগে কর্মী পাঠানোর জন্য সীমিত সংখ্যক এজেন্সিকে অনুমতি দিত, যা সাধারণ মানুষের কাছে 'সিন্ডিকেট' নামে পরিচিত। ২০২১ সালের শেষ দিকে সই হওয়া সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) অনুযায়ী মাত্র ১০০টি রিক্রুটিং এজেন্সিকে কর্মী পাঠানোর সুযোগ দেওয়া হয়েছিল।
মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খোলার সাম্প্রতিক উদ্যোগের মধ্যে এই সিন্ডিকেট ব্যবস্থা আবারও ফিরে আসতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সির (বায়রা) সদস্য আলতাব খান। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তিনি এই ১০০ এজেন্সির সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে মামলাও করেছিলেন।
আলতাব খান বলেন, 'বর্তমান চুক্তি এবং দুই দেশের যৌথ বিবৃতির ভাষা বিশ্লেষণ করলে মনে হয় যে, নিয়োগ প্রক্রিয়া আবারও সীমিত কিছু এজেন্সির মাধ্যমে হতে পারে। এটি হলে অতীতের সেই বিতর্কিত সিন্ডিকেট ব্যবস্থারই পুনরাবৃত্তি হবে।'
তিনি আরও অভিযোগ করেন, 'আগের চুক্তির অপব্যবহার করে মুষ্টিমেয় কিছু এজেন্সিকে বেছে নেওয়া হয়েছিল, যা মূলত চুক্তির শর্তের পরিপন্থী ছিল। চুক্তিতে বলা হয়েছিল, বাংলাদেশ সরকার সকল বৈধ লাইসেন্সধারী এজেন্সির তালিকা দেবে এবং নিয়োগকর্তারা সেই তালিকা থেকে নিজেদের পছন্দমতো এজেন্সি নির্বাচন করবেন। কিন্তু বাস্তবে নির্দিষ্ট কিছু এজেন্সিকে আগে থেকেই ঠিক করে রাখা হয়েছিল।'
মানব পাচার মামলা নিয়ে মালয়েশিয়ার উদ্বেগের বিষয়ে আলতাব খান বলেন, 'এই ইস্যুতে দেশের ভেতরেই মামলা হয়েছে। যেসব অনিয়ম ঘটেছে তা আমাদের দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়। এতে মালয়েশিয়ার বিব্রত হওয়ার কিছু নেই। কোনো অপরাধ হয়ে থাকলে তার বিচার বাংলাদেশেই হবে।'
বায়রার সাবেক যুগ্ম সম্পাদক ফখরুল ইসলাম টিবিএসকে বলেন, 'চলমান মামলা প্রত্যাহার, শূন্য অভিবাসন ব্যয়ের নাটক এবং এ ধরনের কর্মকাণ্ড ইঙ্গিত দিচ্ছে যে বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকারও সিন্ডিকেট ব্যবস্থার দিকেই যাচ্ছে।'
তিনি আরও বলেন, '২০২২ সালে মালয়েশিয়ার তৎকালীন মানবসম্পদ মন্ত্রী সেরি সারাভানান ঢাকায় এসে বিনা খরচে কর্মী নিয়োগের কথা বলেছিলেন। কিন্তু বাস্তবে আমরা কী দেখেছি? আসলে উদ্দেশ্য ছিল সরকারকে ব্ল্যাকমেইল করে সিন্ডিকেট গড়ে তোলা। এবারও তার ব্যতিক্রম নয়। এর আগে ২০১৬ সালেও বলা হয়েছিল কর্মীরা বিনা খরচে যাবে, কিন্তু বাস্তবতা ছিল ভিন্ন।'
বায়রার সাবেক মহাসচিব শামীম আহমেদ চৌধুরী নোমান বলেন, আগে নির্দিষ্ট কিছু যোগ্যতার ভিত্তিতে কয়েক শ আবেদনকারীর মধ্য থেকে সীমিত একটি তালিকা তৈরি করে এজেন্সি নির্বাচন করা হয়েছিল। 'এখন প্রশ্ন হলো—সেই একই মাপকাঠি বজায় থাকবে কি না, নাকি নতুন করে নির্বাচন করা হবে, অথবা বাজার সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে—সেটি এখনো স্পষ্ট নয়।'
নোমান মনে করেন, মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার সবার জন্য উন্মুক্ত হওয়া উচিত। তিনি বলেন, 'যদি সব এজেন্সিকে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য কাজ করার সুযোগ দেওয়া হয়, তবে পরে তাদের পারফরম্যান্স বা দক্ষতার ভিত্তিতে যাচাই-বাছাই বা গ্রেডিং করা যেতে পারে। কিন্তু শুরু থেকেই যদি সুযোগ সীমিত করে দেওয়া হয়, তবে অনেক এজেন্সি তাদের সক্ষমতা প্রমাণের সুযোগই পাবে না।'
