‘মার্কিন প্রেসিডেন্ট স্পষ্টতই উন্মাদ’: ট্রাম্পের মন্তব্যে তার মানসিক সুস্থতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে
গত ৭ এপ্রিল মঙ্গলবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যাল নেটওয়ার্কে লেখেন, 'আজ রাতে আস্ত একটি সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যাবে, যা আর কখনোই ফিরে আসবে না।' এই সাবেক ব্যবসায়ীর প্রতিটি হুমকির মতোই এবারও তার এই কথিত আলোচনার কৌশল ও বাড়িয়ে বলার অভ্যাস নিয়ে জল্পনাকল্পনা শুরু করেন বিশ্লেষকরা।
আর এর মধ্যেই একটি নতুন বাস্তবতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ট্রাম্প আশা করেছিলেন, ইরান সরকার ভেঙে পড়বে। কিন্তু এর পরিবর্তে তারা বিশ্ব অর্থনীতিকেই বিপর্যস্ত করে তুলছে।
ইরানের এমন প্রতিরোধে হতাশ ট্রাম্প এবার নিজের বক্তব্যের ওপর থেকে সব ধরনের লাগাম সরিয়ে ফেলেছেন। তার মধ্যে এখন আর কোনো আত্মনিয়ন্ত্রণ বা প্রেসিডেন্টসুলভ গাম্ভীর্যের লেশমাত্র নেই।
৫ এপ্রিল তিনি হুমকি দিয়ে বলেন, 'ওই শয়তানের দল, হরমুজ প্রণালি খুলে দে, তা না হলে তোদের জায়গা হবে নরকে।'
সোমবার হোয়াইট হাউসে বেশ জনপ্রিয় এক সংবাদ সম্মেলনে একজন সাংবাদিক সরাসরি প্রশ্ন করে বসেন: 'এই যুদ্ধ চলতে থাকার মধ্যে যারা বলছেন যে আপনার মানসিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা দরকার, তাদের সমালোচনার জবাবে আপনি কী বলবেন?'
ট্রাম্প এই প্রশ্নে খুব একটা বিচলিত হলেন না। তিনি উত্তর দিলেন, 'আমি এমন কিছু শুনিনি।
তবে যদি এমনটা হয়, তবে আপনাদের আমার মতো আরও মানুষ লাগবে। কারণ, আমি আসার আগে বহু বছর ধরে বাণিজ্যসহ সব বিষয়ে আমাদের দেশকে ঠকানো হয়েছে।'
ধনকুবের ট্রাম্প তার মানসিক সক্ষমতা নিয়ে করা প্রশ্নটি যেন এড়িয়েই গেলেন।
গত জানুয়ারিতে প্রতিনিধি পরিষদ থেকে পদত্যাগ করা ট্রাম্পের সাবেক মিত্র মার্জোরি টেলর গ্রিন মঙ্গলবার সকালে এক্সে (সাবেক টুইটার) তার উদ্বেগের কথা খুব স্পষ্টভাবে তুলে ধরেন।
তিনি লেখেন, '২৫তম সংশোধনী!!! আমেরিকার মাটিতে একটি বোমা পড়েনি। আমরা একটি আস্ত সভ্যতাকে ধ্বংস করতে পারি না। এটি চূড়ান্ত অশুভ ও উন্মাদনা।'
ম্যাসাচুসেটসের ডেমোক্র্যাট প্রতিনিধি জিম ম্যাকগভার্ন বলেন, 'ক্যাবিনেট বা মন্ত্রিসভা এমন এক ব্যক্তির জন্য ২৫তম সংশোধনী প্রয়োগ করবে না, যিনি স্পষ্টতই উন্মাদ হয়ে গেছেন।'
কানেকটিকাটের ডেমোক্র্যাট সিনেটর ক্রিস মারফি গত রবিবারই প্রায় একই ধরনের ভাষা ব্যবহার করেছিলেন।
তিনি বলেন, 'আমি যদি ট্রাম্পের ক্যাবিনেটে থাকতাম, তাহলে ইস্টার ছুটির পুরোটা সময় আমি ২৫তম সংশোধনী নিয়ে সাংবিধানিক আইনজীবীদের সঙ্গে কথা বলে কাটাতাম। এই ব্যক্তি পুরোপুরি পাগলামি শুরু করেছেন। তিনি এরই মধ্যে হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করেছেন এবং আরও হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করতে চলেছেন।'
'পুরোপুরি উন্মাদ বক্তব্য'
যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক মহলে আবারও ২৫তম সংশোধনীর বিষয়টি আলোচনায় উঠে এসেছে।
বিশ্লেষকরা এখন রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার সীমা নিয়ে বিতর্ক করছেন।
১৯৬৭ সালে সংবিধানে যুক্ত হওয়া এই সংশোধনীর মূল উদ্দেশ্য ছিল, প্রেসিডেন্ট বা ভাইস প্রেসিডেন্ট তাদের দায়িত্ব পালনে অক্ষম হলে ক্ষমতার ধারাবাহিকতা যেন বজায় থাকে, তা নিশ্চিত করা।
ক্যাবিনেটের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্য এই সংশোধনীর একটি ধারা প্রয়োগ করে প্রেসিডেন্টকে অযোগ্য ঘোষণা করতে পারেন এবং ভাইস প্রেসিডেন্টের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে পারেন।
প্রেসিডেন্ট চাইলে এই সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ জানাতে পারেন, তবে ক্যাবিনেট চাইলে আবারও ভোট দিয়ে তাদের প্রথম সিদ্ধান্ত বহাল রাখতে পারে।
তবে এই বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা কংগ্রেসের হাতেই থাকে। প্রতিনিধি পরিষদ এবং সিনেট—উভয় কক্ষে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে কংগ্রেস তাকে স্থায়ীভাবে সরিয়ে দিতে পারে।
তবে বর্তমান ক্যাবিনেটের গঠন এবং কংগ্রেসে চরম মেরুকরণের কারণে এমন কোনো পদক্ষেপ নেওয়া বাস্তবে প্রায় অসম্ভব।
ডেমোক্র্যাটরা তাই এখন ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করার আগে কংগ্রেসের সঙ্গে আলোচনা না করার বিষয়টির ওপর বেশি জোর দিচ্ছেন।
ট্রাম্পের বিরুদ্ধে আগে দুটি অভিশংসন বা ইমপিচমেন্ট প্রক্রিয়ায় ব্যর্থ হওয়ার পর তারা ভালো করেই জানেন যে, ট্রাম্প রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের শিকার হওয়ার এই ধারণাটিকে নিজের সুবিধার জন্য কাজে লাগাতে ওস্তাদ।
তবে তার সাম্প্রতিক এই বিস্ফোরক মন্তব্যগুলো সব মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। নিউইয়র্ক টাইমসের ভাষ্যকার এবং সাবেক আইন বিশেষজ্ঞ ডেভিড ফ্রেঞ্চ মঙ্গলবার এক্সে লেখেন, এটি 'পুরোপুরি উন্মাদ বক্তব্য'।
তিনি আরও লেখেন, 'এটি পরিষ্কারভাবে ২৫তম সংশোধনীর আওতায় পড়ে। কিন্তু মানুষ এতটাই অসাড় হয়ে গেছে যে, তারা এটি দেখতেই পাচ্ছে না।'
গত ২৬ মার্চ ট্রাম্প আবারও ক্যামেরার সামনে তার ক্যাবিনেট বা মন্ত্রিসভার বৈঠক ডাকেন।
ইরানের অত্যন্ত সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুত উদ্ধারের জন্য সম্ভাব্য কোনো কমান্ডো অভিযান চালানো হবে কি না, সে বিষয়ে তাকে প্রশ্ন করা হয়।
ধারণা করা হয়, ইরানের এই ইউরেনিয়াম মজুত ইসফাহান শহরের চারপাশের পাহাড়ে লুকিয়ে রাখা আছে।
ট্রাম্প এই প্রশ্নের জবাবে বলেন: 'আমি বলতে পারব না আমরা কী করতে যাচ্ছি। কারণ আমি যদি বলি, তবে আমাকে বেশি দিন এই আসনে বসে থাকতে হবে না। তারা হয়তো—কী যেন বলে ওটাকে? ২৫তম সংশোধনী? তারা হয়তো ২৫তম সংশোধনী চালু করবে। যেটা তারা [জো] বাইডেনের ক্ষেত্রে করেনি, যা সত্যিই খুব অবাক করার মতো বিষয়।'
এই কথা বলার সময় সেখানে হাসির রোল পড়ে যায়।
কখনোই ধারাবাহিকতার মানদণ্ডে বিচার করা হয়নি
ট্রাম্পের মানসিক সুস্থতার এই প্রশ্নটি যৌক্তিক হলেও, কোনো স্বাধীন ও পেশাদার মূল্যায়ন ছাড়া এর সমাধান করা প্রায় অসম্ভব।
তার পূর্বসূরি জো বাইডেনের উপদেষ্টা বা পরামর্শকরা তাকে একটি সুরক্ষিত আবরণের মধ্যে রেখেছিলেন ঠিকই, কিন্তু তার শারীরিক ও মানসিক দক্ষতার অবনতি সবার চোখেই স্পষ্ট ধরা পড়েছিল।
তবে ধনকুবের ট্রাম্পের বিষয়টি একেবারেই ভিন্ন। ২০১৫ সালে রাজনীতিতে প্রবেশের পর থেকে কখনোই তাকে ধারাবাহিকতার কোনো মানদণ্ডে মাপা হয়নি।
তিনি কখনোই কোনো যুক্তি দাঁড় করানো বা একটি গুছানো ও যৌক্তিক বাক্য তৈরির দক্ষতার কারণে আলোচনায় আসেননি।
বরং তার অসাধারণ রাজনৈতিক প্রবৃত্তি বাদ দিলে, তার বক্তব্যগুলো সবসময়ই উসকানিমূলক কথা, অতিরঞ্জিত গল্প আর তাৎক্ষণিক বুদ্ধির মিশ্রণেই তৈরি।
প্রেসিডেন্ট নিজেই তার এই ধরনটির নাম দিয়েছেন 'দ্য উইভ' বা কথার বুনন।
প্রায় প্রতিদিন সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলে ট্রাম্প প্রমাণ করছেন যে, তিনি নিজেই নিজের সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন এবং পুরোপুরি স্বাধীনভাবেই কাজ করছেন।
বাইডেন আমলের সঙ্গে এখানেই ট্রাম্পের সবচেয়ে বড় পার্থক্য।
বাইডেনকে সবসময় ঘিরে থাকতেন অত্যন্ত অভিজ্ঞ ও প্রবীণ বেসামরিক ও সামরিক উপদেষ্টারা।
হোয়াইট হাউসের রুদ্ধদ্বার বৈঠকে তারা চাইলেই বাইডেনের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করতে পারতেন।
এর প্রমাণ পাওয়া যায় ২০২১ সালের গ্রীষ্মে তড়িঘড়ি করে আফগানিস্তান থেকে সেনা প্রত্যাহারের সময়।
কিন্তু অন্যদিকে ট্রাম্প তার পুরো প্রেসিডেন্সি সাজিয়েছেন এই ধারণার ওপর ভিত্তি করে যে, তিনি একাই সবকিছুর জন্য যথেষ্ট।
তাকে যারা নিয়োগ দেন, তাদের ক্ষেত্রে একমাত্র বিবেচ্য বিষয় হলো পরম আনুগত্য।
পেন্টাগনে পিট হেগসেথ বা এফবিআই-এর প্রধান হিসেবে কাশ প্যাটেলের নিয়োগ দেখলেই তা স্পষ্ট বোঝা যায়।
যোগ্যতা কম থাকা সত্ত্বেও কেবল ট্রাম্পের প্রতি আনুগত্যের কারণেই তারা আজ এই অবস্থানে।
তাহলে আজকের এই দুর্বল ও বিশৃঙ্খল রাষ্ট্রযন্ত্রের মধ্যে ট্রাম্পের আবেগপ্রবণ সিদ্ধান্তগুলোকে বিরোধিতা করার বা সমালোচনা করার সত্যিকারের ক্ষমতা আসলে কার আছে?
