কুষ্টিয়ায় সাউন্ড বক্স-মাইকসেট বাজালে সামাজিকভাবে বয়কটের ঘোষণা মসজিদ কমিটির
কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার শিলাইদহ ইউনিয়নের বড় মাজগ্রাম এলাকায় সাউন্ড বক্স ও মাইকসেট (গান-বাজনা) ব্যবহারের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে স্থানীয় জামে মসজিদ কমিটি। এই সিদ্ধান্ত অমান্য করলে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে মসজিদ, মাদ্রাসা ও কবরস্থানের সকল ধর্মীয় ও সামাজিক কার্যক্রম থেকে বহিষ্কার বা সামাজিকভাবে বয়কটের হুঁশিয়ারি দিয়ে এলাকায় মাইকিং করা হয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার (২ এপ্রিল) দিনব্যাপী বড় মাজগ্রাম জামে মসজিদ কমিটির পক্ষ থেকে এই ঘোষণা প্রচার করা হয়। এ সংক্রান্ত একটি ৩০ সেকেন্ডের ভিডিও ক্লিপ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়লে গ্রামবাসীর একটি বড় অংশের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে।
ঘটনার প্রেক্ষাপট অনুসন্ধান করে জানা গেছে, বড় মাজগ্রাম জামে মসজিদ থেকে প্রায় ২০০ মিটার দূরে জমারত আলী ও রুপা খাতুন দম্পতির বাড়ি। সম্প্রতি তাদের এতিম নাতি আলিফের (৭) খৎনা অনুষ্ঠান উপলক্ষে ঈদের পরবর্তী বৃহস্পতিবার বাড়িতে সাউন্ড বক্স বাজিয়ে আনন্দ আয়োজন করা হয়। তবে পরিবারটির দাবি, আজান ও নামাজের সময় বক্স বন্ধ রাখা হয়েছিল।
সাউন্ড বক্স বাজানোর সময় স্থানীয় কিছু মুসল্লি অস্বস্তি প্রকাশ করলে বক্সটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। এ নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে তর্ক-বিতর্ক ও উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। এরই প্রেক্ষিতে পরবর্তী শুক্রবার মসজিদ কমিটির আলোচনায় সাউন্ড বক্স ও মাইকসেট বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় এবং বৃহস্পতিবার তা মাইকিং করে প্রচার করা হয়।
ভুক্তভোগী রুপা খাতুন বলেন, 'নাতি ছেলের শখ পূরণ করতে মাত্র একদিন বক্স বাজানো হয়েছে। নামাজ ও আজানের সময় বন্ধ ছিল। শব্দও কম রাখা হয়েছিল। তারপরও শত্রুতা করে মসজিদ কমিটির কিছু লোক প্রভাব দেখিয়ে গ্রামে ঝামেলা করতেছে। বন্ধ হলে সারাদেশে বন্ধ হোক, শুধু এখানে কেন?'
এ বিষয়ে বড় মাজগ্রাম জামে মসজিদের ইমাম ও খতীব মাওলানা ওয়ালীউল্লাহ ফরিদী বলেন, 'গত ২৭ মার্চ জুম্মার নামাজ শেষে মসজিদ কমিটির আলোচনায় সিদ্ধান্ত হয়, বড় মাজগ্রাম মহল্লার অধীনে কোনো বাড়িতে সাউন্ড বক্স বা মাইকসেট বাজালে তাদের ঈদগাহ, মসজিদ ও কবরস্থানের সকল কার্যক্রম থেকে বহিষ্কার করা হবে। এক কথায় সামাজিকভাবে বয়কট করা হবে।'
তিনি আরও যোগ করেন, 'কোরআনে গান-বাজনা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। সম্প্রতি বিয়ে ও খৎনা অনুষ্ঠানে উচ্চ শব্দে গান বাজানো হচ্ছে। এতে অসুস্থ মানুষসহ সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাপন ব্যাহত হওয়ায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।'
তবে মসজিদ কমিটির সভাপতি আমির হোসেনের বক্তব্যে কিছুটা ভিন্ন সুর পাওয়া গেছে। তিনি বলেন, 'সব ধরনের গান-বাজনা বন্ধ বিষয়টি ঠিক সেভাবে নয়। মূলত উচ্চ শব্দে সাউন্ড বক্স ও মাইক বাজানো বন্ধের বিষয়ে সকলে মিলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে মাইকিংয়ে কী প্রচার হয়েছে তা আমি জানি না।'
নাম প্রকাশ না করার শর্তে গ্রামের কয়েকজন বাসিন্দা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী এভাবে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে সামাজিক কর্মকাণ্ডে নিষেধাজ্ঞা বা বহিষ্কারের ঘোষণা দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। শব্দ দূষণ হলে তা প্রশাসন বা আইনের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব, কিন্তু মসজিদ কমিটির এমন চরমপন্থা বাঞ্ছনীয় নয়।
এ বিষয়ে কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক (ডিসি) মো. তৌহিদ বিন হাসান বলেন, 'বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।'
