সরকার কেন এপ্রিল মাসে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায়নি?
আন্তর্জাতিক বাজারে সম্প্রতি দাম বৃদ্ধি সত্ত্বেও সরকার এপ্রিল মাসের জন্য দেশে জ্বালানি তেলের দাম অপরিবর্তিত রেখেছে। এর মধ্যে দিয়ে সরকার মূল্য সমন্বয়ের পরিবর্তে জনসাধারণের স্বস্তিকেই প্রাধান্য দিয়েছে।
জ্বালানি বিভাগের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, সম্প্রতি বিশ্ব বাজারের সঙ্গে জ্বালানি তেলের দাম আংশিকভাবে সমন্বয়ের কথা ভেবেছিল সরকার। এর ফলে দাম বাড়ত জ্বালানি তেলের। তবে সাধারণ মানুষের ক্রমবর্ধমান কষ্টের কথা মাথায় রেখে আপাতত সেই পরিকল্পনা স্থগিত করা হয়েছ বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
সূত্রগুলো জানিয়েছে, বিপুল পরিমাণ ভর্তুকির চাপ সত্ত্বেও সরকার এপ্রিল মাসের জন্য তেলের বর্তমান দামই বহাল রাখার পক্ষে মত দিয়েছে।
ইরান যুদ্ধের জেরে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর থেকে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার নতুন করে চাপের মুখে পড়েছে। ইরানে মার্কিন-ইসরায়েলি হামলার পর এবং হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১১৬ ডলারে পৌঁছেছে। যেখানে যুদ্ধের আগে এই মূল্য ছিল ৭০ থেকে ৭৫ ডলার।
আরও পড়ুন: এপ্রিলে বাড়ছে না জ্বালানি তেলের দাম
সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার পর বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় পরিস্থিতি সামাল দিতে চলতি অর্থবছরে অতিরিক্ত ২৪ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি বরাদ্দ দিয়েছে সরকার।
এই ভর্তুকির মধ্যে ১৭ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করা হবে এলএনজি আমদানিতে এবং বাকি ৭ হাজার কোটি টাকা যাবে জ্বালানি আমদানিতে, যা মূলত রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের (বিপিসি) ক্রয়কৃত ডিজেলের বাড়তি খরচ মেটাতে ব্যয় হবে।
কর্মকর্তারা বলছেন, বিভিন্ন খাতে মূল্যস্ফীতির চাপ বিবেচনায় জ্বালানির দাম না বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কারণ, এটি না করলে জনগণের ভোগান্তি আরও বাড়ত।
আরেকটি বড় উদ্বেগ হলো বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অনিশ্চয়তা। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেন, এখন দাম বাড়ালেও যুদ্ধের আগে যে স্থিতিশীলতা ছিল, পুনরায় সেই অবস্থায় ফিরতে পারার বিষয়ে কোনো নিশ্চয়তা নেই। আর এতে জনগণের অসন্তোষ আরও বাড়াতে পারে।
দায়িত্ব গ্রহণের দুই সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে সরকার ইতোমধ্যে নজিরবিহীন এক ভূরাজনৈতিক ধাক্কার সম্মুখীন। মার্কিন-ইসরায়েলি জোট ও ইরানের মধ্যে সংঘাতের জেরে হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্বব্যাপী প্রায় ২০ শতাংশ জ্বালানি পরিবহন ব্যাহত হয়েছে।
কর্মকর্তারা বলছেন, যদি ক্রমবর্ধমান ভর্তুকির চাপ সামলাতে সরকারকে দাম বাড়াতেই হতো, তাহলে সম্ভবত ডিজেলের দাম বাড়ানোই সবচেয়ে কার্যকর হতো। কারণ, দেশে এটির চাহিদাই সবচেয়ে বেশি, প্রতি মাসে প্রায় ১২ হাজার থেকে সাড়ে ১২ হাজার টন।
তবে ডিজেলের দাম বাড়ালে দৈনন্দিন জীবনে তাৎক্ষণিক ও ব্যাপক প্রভাব দেখা যেত। এর ফলে পরিবহন খরচ বাড়ত, ভাড়া বাড়ত, যাত্রীদের ভোগান্তি বাড়ত, এমনকি বিবাদে জড়িয়ে পড়ার মতো ঘটনাও ঘটত। এছাড়াও বাড়ত নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দামও।
এমন পরিস্থিতিতে নতুন সরকারের জনসমর্থন কমতো বলেও মনে করেন কর্মকর্তারা।
সম্প্রতি বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত জানিয়েছেন, ইরান সংকটের জেরে বৈশ্বিক মূল্যবৃদ্ধির কারণে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন বর্তমানে প্রায় ১৬৭ কোটি টাকা জ্বালানি ভর্তুকি দিচ্ছে।
দাম অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত জ্বালানি মজুত না করায় উৎসাহী করারও একটি কৌশল।
কর্মকর্তারা বলেন, বর্তমান মূল্য বহাল থাকলে মজুতদারেরা মজুতকৃত জ্বালানি বাজারে ছাড়তে বাধ্য হতে পারে। কারণ, তখন সংরক্ষণের খরচ সম্ভাব্য লাভের চেয়ে বেশি হবে।
