মধ্যপ্রাচ্য সংকটে আকাশপথে কার্গো সক্ষমতা কমেছে, ভাড়া বেড়ে হয়েছে তিনগুণ
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংকটের কারণে আকাশপথে রপ্তানি কার্গোর সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। ফলে গত দুই সপ্তাহে ভাড়া দ্বিগুণ, কোথাও কোথাও প্রায় তিনগুণ পর্যন্ত বেড়েছে।
শিল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, খরচ বাড়ার পাশাপাশি ফ্লাইট বিঘ্নিত হওয়ায় ডেলিভারির সময়ও দীর্ঘ হচ্ছে। এর পেছনে কাজ করছে বড় ধরনের সক্ষমতা সংকট।
সংঘাত শুরুর আগে ইউরোপগামী চালানে বিমান সংস্থাগুলো প্রতিকেজিতে ভাড়া নিত প্রায় ২ থেকে ২.২ ডলার। তবে এখন কার্গোর জায়গা সংকটের মধ্যে চাহিদা বাড়ায় সেই ভাড়া বেড়ে প্রতিকেজিতে ৫.৫ থেকে ৬ ডলারে পৌঁছেছে বলে জানিয়েছে ইন্টারন্যাশনাল এয়ার এক্সপ্রেস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (আইএইএবি)।
সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রগামী চালানের ভাড়াও বেড়েছে। আগে যেখানে প্রতিকেজির জন্য ভাড়া ছিল প্রায় ৪.৫০ থেকে ৫ ডলার—এখন তা বেড়ে প্রায় ৭ থেকে ৮ ডলারে দাঁড়িয়েছে।
আইএইএবি'র সভাপতি কবির আহমেদ টিবিএসকে বলেন, ফ্লাইট বিঘ্নিত হওয়ায় কার্গো কার্যক্রম উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
তিনি বলেন, "সাধারণত প্রতিদিন প্রায় ৬০০ থেকে ৭০০ টন কার্গো হ্যান্ডলিং হতো। এখন তা কমে প্রতিদিন প্রায় ৩০০ থেকে ৩৫০ টনে নেমে এসেছে। আগে যেখানে কার্গো পাঠাতে দুই থেকে তিন দিন লাগত, এখন লাগছে ছয় থেকে সাত দিন। ফলে বিমানবন্দরে কার্গো জমে যাচ্ছে এবং জায়গার সংকট তৈরি হচ্ছে।"
তিনি আরও বলেন, উচ্চ ভাড়া ও সক্ষমতা সংকট অন্তত আগামী দুই সপ্তাহ অব্যাহত থাকতে পারে। "তবে সংঘাত আরও দীর্ঘায়িত হলে এর প্রভাব আরও গুরুতর হবে।"
সাধারণত বাংলাদেশের আকাশপথে রপ্তানি হওয়া কার্গোর প্রায় ৬০ শতাংশই দুবাই ও দোহার মতো মধ্যপ্রাচ্যের হাব হয়ে পাঠানো হয়। তবে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) তথ্য অনুযায়ী, এসব গন্তব্যে প্রায় অর্ধেক ফ্লাইট এখনো বন্ধ রয়েছে। এতে কার্গো রপ্তানির সক্ষমতা কমে গেছে।
বিমানবন্দর সূত্রে জানা গেছে, মধ্যপ্রাচ্যের রুটে ফ্লাইট বিঘ্নিত হওয়া শুরু হয় গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে। ১৩ মার্চ পর্যন্ত মোট বাতিল হওয়া ফ্লাইটের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৪৭টি।
মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক বড় বিমান সংস্থাগুলোর মধ্যে এমিরেটস, ইতিহাদ, ফ্লাইদুবাই, এয়ার অ্যারাবিয়া, কাতার এয়ারওয়েজ, গালফ এয়ার ও সৌদিয়া এয়ারলাইন্স কয়েক দিন ধরে তাদের অনেক ফ্লাইট স্থগিত রেখেছে।
জাতীয় পতাকাবাহী বিমান সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সও সংঘাত শুরুর পর মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি গন্তব্যে ফ্লাইট পরিচালনা বন্ধ রেখেছে; ফলে কার্গো পরিবহনের সক্ষমতা সংকট আরও বেড়েছে।
বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপে সরাসরি কোনো ফ্লাইট না থাকায় মধ্যপ্রাচ্যের এসব ট্রানজিট হাবের ওপরই ব্যাপকভাবে নির্ভর করতে হয়।
এদিকে মধ্যপ্রাচ্য এড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে চলাচলকারী বিমান সংস্থাগুলোও ভাড়া বাড়িয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে টার্কিশ এয়ারলাইন্স, মালয়েশিয়া এয়ারলাইন্স, থাই এয়ারওয়েজ, ক্যাথে প্যাসিফিক ও সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্স।
বাংলাদেশের আকাশপথে রপ্তানির প্রায় ৫৬ শতাংশ যায় ইউরোপে, আর প্রায় ২২ শতাংশ যায় যুক্তরাষ্ট্রে।
বাংলাদেশ ফ্রেইট ফরওয়ার্ডার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক পরিচালক নাসির আহমেদ খান টিবিএসকে বলেন, দেশে কার্গো পরিবহনের বড় অংশই যাত্রীবাহী ফ্লাইটের ওপর নির্ভরশীল।
তিনি বলেন, "আমাদের বেশিরভাগ কার্গোই যাত্রীবাহী উড়োজাহাজে যায়। ডেডিকেটেড কার্গো ফ্রেইটার সার্ভিসও কমে গেছে। এখন সপ্তাহে মাত্র একটি নির্ধারিত ফ্রেইটার ফ্লাইট আসে। কিছু অনিয়মিত ফ্রেইটার চলাচল করছে, কিন্তু সংখ্যা পর্যাপ্ত নয়।"
যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নে দুর্বল চাহিদার কারণে বাংলাদেশের রপ্তানি টানা সাত মাস ধরে নেতিবাচক অবস্থায় রয়েছে। এর মধ্যে ইরানকে ঘিরে সংঘাত পরিস্থিতি রপ্তানিতে আরও চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে আরব দেশগুলোতে বাংলাদেশের রপ্তানির পরিমাণ ছিল প্রায় ৯০০ মিলিয়ন ডলার—যা দেশের মোট রপ্তানির প্রায় ২ শতাংশ। তবে নির্দিষ্ট কিছু খাতের জন্য এসব দেশ গুরুত্বপূর্ণ বাজার।
এই রপ্তানির ৬০ শতাংশের বেশি তৈরি পোশাক খাত থেকে আসে। বাকি অংশ আসে মূলত সবজি ও অন্যান্য কৃষিপণ্য থেকে।
ফলে এ অঞ্চলে দীর্ঘমেয়াদি কোনো বিঘ্ন দেখা দিলে বাংলাদেশের শিল্পপণ্য রপ্তানির পাশাপাশি দ্রুত নষ্ট হওয়া কৃষিপণ্যের চালানও প্রভাবিত হতে পারে।
