মধ্যপ্রাচ্য সংকট: চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জের পাইকারি বাজারে অস্থিরতা
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে চট্টগ্রামের বৃহত্তম পাইকারি ভোগ্যপণ্যের বাজার খাতুনগঞ্জে দামের অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। ব্যবসায়ীরা আন্তর্জাতিক বাজারের অনিশ্চয়তা ও জ্বালানি তেলের সম্ভাব্য মূল্যবৃদ্ধির আশঙ্কার কথা বললেও বাজার সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, যুদ্ধ পরিস্থিতিকে পুঁজি করে কিছু ব্যবসায়ী আগের কেনা পণ্যের দাম বাড়িয়ে দিচ্ছেন। পাশাপাশি কেউ কেউ পণ্য মজুত রেখে বিক্রি কমিয়ে দিচ্ছেন, যা বাজারে চাপ তৈরি করছে।
খাতুনগঞ্জে খোজ নিয়ে জানা যায়, গত শনিবার রাত থেকে হঠাৎ করেই পাম অয়েল, সয়াবিন তেল, চিনি, গমসহ বিভিন্ন ভোগ্যপণ্যের দামে ওঠানামা শুরু হয়। কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে কিছু পণ্যের দাম বেড়ে যায়। তবে পরদিন যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী নাও হতে পারে—এমন ধারণা ছড়িয়ে পড়লে বাজার কিছুটা নিম্নমুখী হয়। তবুও যুদ্ধ শুরুর আগের তুলনায় বেশিরভাগ পণ্যই এখন বাড়তি দামে লেনদেন হচ্ছে।
ব্যবসায়ীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, গত শনিবার বিকাল পর্যন্ত খোলা পরিশোধিত পাম অয়েলের মণপ্রতি (৩৭ দশমিক ৩২ কেজি) দাম ছিল ৫ হাজার ৯০০ টাকা। ইরানে হামলার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর সন্ধ্যার দিকে দাম বেড়ে দাঁড়ায় ৬ হাজার টাকা। পরদিন কিছুটা কমলেও আবার বেড়ে বর্তমানে ৬ হাজার থেকে ৬ হাজার ২০ টাকার মধ্যে লেনদেন হচ্ছে। একইভাবে গমের দাম বেড়ে ১ হাজার ৩০০ টাকায় পৌঁছেছে, যা আগে প্রায় ১৫০ টাকা কম ছিল।
এ ছাড়া খোলা সয়াবিন তেলের মণপ্রতি দাম ১২০ টাকা বেড়ে ৭ হাজার ১৮০ টাকায় উঠেছে। চিনির দামও মণপ্রতি ৭০ থেকে ৮০ টাকা বেড়ে ৩ হাজার ৪৭০ থেকে ৩ হাজার ৪৮০ টাকায় লেনদেন হচ্ছে। বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি হওয়া ডাল ও শুকনো খাদ্যপণ্যের দামও একইভাবে ঊর্ধ্বমুখী রয়েছে। যদিও রমজান শুরুর পর পাইকারি বাজারে এসব পণ্যের দাম কিছুটা কমতে শুরু করেছিল।
খাতুনগঞ্জের একাধিক ব্যবসায়ী জানান, রমজানের মাঝামাঝি সময়ে সাধারণত বাজারে বেচা-কেনা কমে যায়। এখন মূলত ঈদকে সামনে রেখে শুকনো খাদ্য ও মিষ্টিজাতীয় পণ্যের চাহিদা রয়েছে। কিন্তু যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে ভবিষ্যতে দাম বাড়তে পারে এই আশঙ্কায় বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।
চাক্তাই-খাতুনগঞ্জ আড়তদার সাধারণ ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও ভোগ্যপণ্যের আমদানিকারক মো. মহিউদ্দিন টিবিএসকে বলেন, 'কয়েকটি পণ্যের দাম বেড়েছে। তবে অধিকাংশ পণ্যের দাম এখনো স্বাভাবিক পর্যায়ে রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে ভোগ্যপণ্যের সরবরাহ ব্যবস্থায় প্রভাব পড়তে পারে, তখন সব ধরনের পণ্যের দাম বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।'
অন্যদিকে ভোক্তা অধিকারকর্মীরা বলছেন, যুদ্ধকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী বাজারে অস্থিরতা তৈরি করছেন। কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন টিবিএসকে বলেন, 'ব্যবসায়ীরা দাম বাড়ানোর জন্য একটা ইস্যু খোঁজে। যুদ্ধের কারণে একটা ইস্যু পাওয়া গেল। যুদ্ধের কারণে এখানে এতো দ্রুত প্রভাব পড়ার কোনো প্রশ্নই আসে না। জ্বালানি তেল সঙ্কট হলে তখন পরিবহন খরচ মিলিয়ে একটা প্রভাব পড়তে পারে তবে তা এখন না।'
তিনি আরও বলেন, 'প্রশাসনও এই বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না। আমরা খোঁজ নিয়ে জেনেছি, নতুন সরকার এলেও মন্ত্রণালয় থেকে প্রশাসনকে এই সব বিষয়ে এখনো কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি। সরকারকে এই বিষয়ে আরও কঠোর হতে হবে। আমরা তাড়াতাড়ি আশাহত হতে চাই না।'
চট্টগ্রাম কাস্টমসের তথ্যানুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে ১০ লাখ ৩৮ হাজার টন পাম অয়েল এবং ৪ লাখ ৬৩ হাজার টন অপরিশোধিত সয়াবিন তেল আমদানি হয়েছে। একই সময়ে ২ লাখ ৬৯ হাজার টন পরিশোধিত চিনি এবং ১ লাখ ৭ হাজার টন অপরিশোধিত চিনি খালাস হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পর্যাপ্ত আমদানি থাকার পরও বাজারে দামের অস্থিরতা তৈরি হওয়া উদ্বেগজনক।
