বান্দরবানে ন্যায্যমূল্যের অভাব ও পাইকার সংকটে বাগানেই পচছে আম
বান্দরবানের রোয়াংছড়ি উপজেলার কয়েকটি এলাকায় বাগানে বাগানে পচে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে আম। মূলত দাম কম ও পাইকার ব্যবসায়ীরা না আসায় বিক্রি না হওয়ার কারণে বাগানে পচে এভাবে নষ্ট হচ্ছে বলে জানিয়েছেন চাষিরা।
রোয়াংছড়ি উপজেলা সদর থেকে রুমা উপজেলা সদরের দূরত্ব ১৫ কিলোমিটার। এই সড়কের পাশে বম, খিয়াং ও মারমা সম্প্রদায়ের এলাকায় প্রচুর পরিমাণে রাংগোয়ে প্রজাতির আম বাগান রয়েছে। এসব এলাকা থেকে প্রত্যেক বছর পাইকার ব্যবসায়ীরা বাগান হিসাবে আম কিনে থাকেন। কোনো চাষির আম কাঁচা অবস্থায় বিক্রি হয়ে থাকে। কিন্তু এ বছর মৌসুমের শেষ দিকে এসেও ব্যবসায়ীরা আম কিনতে আসছেন না।
পাইকার ব্যবসায়ী হিসাবে যারা আসছেন, তারাও কম দামে কিনতে চাচ্ছেন। এতে বাগানের পরিচর্যা, কীটনাশক, স্প্রে করা ও মজুরি খরচও উঠবে না বলে জানান চাষিরা।
সম্প্রতি সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, রোয়াংছড়ি-রুমা সড়কের উভয় পাশে প্রচুর আমের বাগান। বেশির ভাগই মিয়ানমার প্রজাতির রাংগোয়ে। এছাড়া রয়েছে আম্রপালি, রুপালি ও বারি জাতের আম। রাস্তার পাশের বাগানগুলোতে প্রচুর আম পড়ে আছে। এর কোনটা পচে গেছে, কোনটা আবার ভালো অবস্থায় রয়েছে। দাম কম হওয়ায় কৃষকরা আম বিক্রি না করে বাগানগুলো এমনি ফেলে রেখেছেন। তবে চাহিদা থাকায় আম্রপালি, রুপালি ও বারি আমগুলো গাছ থেকে সংগ্রহ করে বাজারে নিয়ে বিক্রি করা হয় বলে জানান চাষিরা।
রোয়াংছড়ি সদর ইউনিয়নের সুয়ানলু পাড়ার আম চাষি ভানসা বম বলেন, "প্রত্যেক বছর পাইকাররা এসে বাগান হিসাবে আম কিনে নিয়ে যায়। এ বছর দাম কম হওয়ায় এখনও বিক্রি করা যায়নি। দুজন পাইকার ব্যবসায়ী এসেছিল। একজন প্রথমে ৬০ হাজার টাকা চেয়েছিল। দাম কম হওয়ায় তখন বিক্রি করা হয়নি। পরে একজন ব্যবসায়ী ৫০ হাজার টাকার বেশি দাম দিতে চাচ্ছে না। অথচ গত বছর এই এক বাগানই আড়াই লাখ টাকায় বিক্রি হয়েছিল। যেভাবে ফল ধরেছে, এ বছর তিন লাখ টাকায় বিক্রি হওয়ার কথা। অথচ সেই বাগানের দাম ৫০ হাজারের বেশি উঠছে না।"
তিনি আরও বলেন, "যে কারণে লোকসান হলেও এত কম দামে বিক্রি করব না। বাগানে রাংগোয়ে, রুপালি ও বারি প্রজাতির আম রয়েছে। রাংগোয়ে প্রজাতির আমই বেশি। রুপালি ও বারি আম সাপ্তাহিক বাজারে নিয়ে বিক্রি করা হয়। আমের মুকুল আসার সময় একবার স্প্রে করলে মজুরিসহ ১০ হাজার টাকা খরচ হয়। এভাবে মোট ৬০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে।"
ভানসা বম জানান, তবে রাংগোয়ে আম শুরুর দিকে কাঁচা অবস্থায় ৮০ মণ বিক্রি করেছি। প্রথম ধাপে মণপ্রতি ১৮০০ টাকা এবং দ্বিতীয় ধাপে মণপ্রতি ১৫০০ টাকা করে বিক্রি হয়েছে। একেক ব্যবসায়ী একেক দামে কিনেছে। কাঁচা অবস্থায় কেউ কেউ এর চেয়েও বেশি দাম পেয়েছে।
একই পাড়ার আরেক আম চাষি লালপিয়ান বম বলেন, "কম-বেশি সবার বাগান থাকার কারণে রাংগোয়ে প্রজাতির আম আগের মতো দাম পায় না। দাম একেবারেই কম। আম্রপালি ও বারি জাতের আমের ভালো চাহিদা আছে, ভালো দামও পাওয়া যায়। আম্রপালি মণপ্রতি চার হাজার টাকায় বিক্রি করেছি। বারি আম মণপ্রতি সাড়ে তিন হাজার থেকে চার হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়েছে। তবে কাঁচা অবস্থায় রাংগোয়ে আম মণে ৮ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি করেছি।"
পরে দামের ব্যাপারে এই আম চাষি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "আমের দাম পাওয়ার জন্য আগে টোল আদায়কারীদের ধরতে হবে। তাদের কারণে আমাদের লোকসান দিতে হচ্ছে। তারা কম হারে টোল আদায় করলে আমাদের লাভ থাকত। আমাদের এই দিকে গত বছর মাত্র তিনজন পাইকার ব্যবসায়ী ঢুকেছিল। তারাও লোকসান খেয়েছে। এ বছর আর আসেনি। তারপরও এই বছর এই এলাকায় কয়েকজন পাইকার ব্যবসায়ী এসেছে। তারাও খুবই কম দামে আম কিনছে।"
তিনি আরও বলেন, "আম নিয়ে যাওয়ার সময় রোয়াংছড়ি বাজার ফান্ডে এক গাড়ি ৫ হাজার টাকা করে টোল দিতে হয়। এরপর শহরের কাছাকাছি হানসামা এলাকায় টোল পয়েন্টে দিতে হয় দেড় থেকে দুই হাজার টাকা। সবশেষ শহর থেকে বের হওয়ার সময় সুয়ালক টোল পয়েন্টে দিতে হয় গাড়িপ্রতি দুই হাজার টাকা করে। মূলত টোল আদায়ের হার বেশি হওয়ার কারণে পাইকার ব্যবসায়ীরা আসে না। যারা আসে, তারাও তিন লাখ টাকার বাগানের দাম দেড় লাখের বেশি দিতে চায় না। তারা তাদের লোকসানের হিসাব করে দাম কমিয়ে রাখে। আর এসব কিছু চাষিদের ওপর দিয়ে চলে যায়।"
আরেক আম চাষি রামসিয়ান বম জানান, তাদের সুয়ানলু পাড়ায় বম সম্প্রদায়ের ৫৪টি পরিবার রয়েছে। কম-বেশি সবারই আম বাগান আছে। এবার মাত্র কয়েক পরিবারের আম বাগান বিক্রি হয়েছে। আশানুরূপ দাম না পাওয়ায় বেশির ভাগ আম চাষি এখনও কারও কাছে বিক্রি করেননি। ব্যবসায়ীরা আসছেন না। যারা আসছেন, তারাও খুব কম দামে কিনতে চাচ্ছেন। আবার শুধুমাত্র রাস্তার পাশে যেসব বাগান আছে, সেগুলো কিনতে চান। একটু ভেতরে হলে কেনার আগ্রহ দেখান না। বাড়তি খরচ তারা করতে চান না।
রামসিয়ান বলেন, "আমার একটা বাগান রয়েছে। ব্যবসায়ীরা কম দাম চাওয়ায় বিক্রি করছি না। গত বছরও বিক্রি হয়নি। তখন মৌসুমের শেষ দিকে আমার স্ত্রী বাগান থেকে পেড়ে বাজারে নিয়ে বিক্রি করেছে। তখন মণপ্রতি ৪০০ থেকে ৬০০ টাকা পর্যন্ত পেয়েছিল। এ বছরও ঝুড়িতে করে বাজারে নিয়ে কেজিদরে বিক্রি করছে। যাতে কিছু খরচ উঠানো যায়। আমার বাবারও তিনটি বড় আম বাগান রয়েছে। ব্যবসায়ীদের কেউ এখনও দেখতেও আসেনি। এ বছর সবারই ভালো আম ধরেছে, কিন্তু দাম পাওয়া যাচ্ছে না। বাগানে আম এমনিতেই পচে যাচ্ছে।"
আম চাষি রামসিয়ান বম আরও জানান, গত বছর আমাদের পাড়ার কিছু আম চাষি বিক্রি করেও ঠকেছেন। ব্যবসায়ীরা দরদাম ঠিক করার পর প্রথমে বিশ-ত্রিশ হাজার করে টাকা দিয়েছিল। তখন আম যা নেওয়ার নিয়ে গেছে। পরে বাকি টাকা আর দিতে আসেনি। একেকজন এক লাখ, দেড় লাখ, কেউ ৫০ হাজার করে মোট প্রায় নয় লাখ টাকা পাবেন। পরে আর কেউ কোনো টাকা পাননি।
যোগাযোগ করা হলে কুতুব উদ্দিন নামে এক আম পাইকার ব্যবসায়ী জানান, এ বছর সুয়ানলু পাড়া থেকে তিনটি আম বাগান কেনা হয়েছে। একটি বাগান ৩৫ হাজার, আরেকটি ৩৬ হাজার এবং বাকি বাগানটি ৭৫ হাজার টাকা দিয়ে কিনেছি। এ পর্যন্ত তিনটি বাগান থেকে ৯ টনের মতো আম সংগ্রহ করেছি। বাগানে আরও ৩০ শতাংশের মতো আম আছে। মৌসুমের শেষ দিকে দাম একটু বাড়তি থাকে, তখন একটু লাভ করতে পারি।
তিনি আরও বলেন, "এ বছর আম ঝরেও যাচ্ছে বেশি। আগে থেকেই বেশি ঝরে গেছে। এভাবে ঝরে না পড়লে ৩৫ হাজার টাকার বাগানের দাম কমপক্ষে ৭০ হাজার, ৩৬ হাজার টাকার বাগানের দাম ৮০ হাজার এবং ৭৫ হাজার টাকার বাগানের দাম ২ লাখ টাকা দিয়ে কিনতে হতো। বাগান থেকে সংগ্রহ করে নিয়ে আসা পর্যন্ত তিনটি জায়গায় টোলের টাকা দিতে হয়। বিশেষ করে রোয়াংছড়ি বাজার এলাকায় গাড়িপ্রতি দুই থেকে তিন হাজার টাকা দিতে হয়। যে কারণে লোকসানের কথা চিন্তা করে ভালোভাবে যাচাই করে কিনতে হয়। তা না হলে চাষিরা আরও দাম পেতেন।"
জেলার অন্যান্য উপজেলাতেও রাংগোয়ে প্রজাতির আমের দাম কম। তবে শুরুর দিকে কাঁচা অবস্থায় যারা বিক্রি করেছেন, তারা কিছুটা লাভ করতে পেরেছেন। এখন মৌসুমের শেষ দিকে কিছুটা বাড়তি দাম পাওয়ার আশা করছেন বলে জানান চাষিরা।
কৃষি বিভাগের মতে, গত এক দশক ধরে বান্দরবানের বিভিন্ন এলাকায় মিয়ানমার প্রজাতির রাংগোয়ে আম বাগান সৃজন করেছেন কৃষকরা। প্রত্যেকেরই কম-বেশি রাংগোয়ে প্রজাতির আমের বাগান রয়েছে। বাণিজ্যিক না হলেও অন্তত সবার ঘরে নিজেদের খাওয়ার মতো রাংগোয়ে আমের গাছ রয়েছে। ফলে স্থানীয়ভাবেও আমের চাহিদা কমে আসছে। ফলে নতুন প্রজাতি ছাড়া আম থেকে আগের মতো অতিরিক্ত লাভ করতে পারছেন না কৃষকরা।
বান্দরবান কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আবু নাঈম মোহাম্মদ সাউফুদ্দিন জানান, জেলায় ২৫ হাজার ৮৬০ একর জমিতে আমের চাষ হয়েছে। তার মধ্যে চাষের ৬০ শতাংশই রাংগোয়ে আম। যেকোনো জিনিসের অতিরিক্ত জোগান থাকলে কৃষকরা দাম কম পেয়ে থাকেন। রাংগোয়ে আম মূলত শুরুর দিকে কাঁচা অবস্থায় একবার ভালো দাম পায়। আরেকবার মৌসুমের শেষ দিকে একটু বাড়তি দাম হয়ে থাকে। এখন তো রাংগোয়ে আমের ভরা মৌসুম চলছে।
