মৃত্যুর আগেই নিজের কফিন তৈরি করে রেখেছেন টংকাবতী ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান পূর্ণচন্দ্র ম্রো
জীবনের শেষ যাত্রার প্রস্তুতি নিয়েছেন বান্দরবানের টংকাবতী ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও বান্দরবান সদর উপজেলার টংকাবতী মৌজার হেডম্যান পূর্ণচন্দ্র ম্রো (৭৮)।
সাড়ে চার বছর আগেই তিনি নিজের জন্য কদম গাছের কাঠ দিয়ে একটি কফিন তৈরি করে বাড়িতে সংরক্ষণ করে রেখেছেন।
রোববার (১৯ জুলাই) টংকাবতী ইউনিয়নের নিজ বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, যত্নসহকারে তৈরি করা সেই কফিনটি ঘরের একপাশে রাখা রয়েছে। স্থানীয়দের কাছেও বিষয়টি কৌতূহলের সৃষ্টি করেছে।
পূর্ণচন্দ্র ম্রো ১৯৮৪ সাল থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত ছয় মেয়াদে মোট ৩০ বছর ধরে টংকাবতী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৭ সালে তার বাবা রেংথম ম্রোরর মৃত্যুর পর তিনি নম্বর টংকাবতী মৌজার হেডম্যানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এরপর প্রায় চার দশক ধরে মৌজাবাসীর সেবায় নিয়োজিত রয়েছেন।
মৃত্যুর আগে নিজের কফিন তৈরি করে রাখা বিষয় জানতে চাইলে পূর্ণচন্দ্র ম্রো বলেন, আর কতদিন? জীবনে যা পাওয়ার ছিল সবই পেয়েছি। এখন আর কোনো চাওয়া-পাওয়া নেই। আমি বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারী। বুদ্ধের শিক্ষা অনুযায়ী কর্মফলে বিশ্বাস করি। মানুষ ভালো কাজ করলে ভালো ফল, আর মন্দ কাজ করলে মন্দ ফল ভোগ করতেই হবে। একদিন সবাইকে চলে যেতে হবে। তাই নিজের ইচ্ছায় সাড়ে চার বছর আগে কদম গাছের কাঠ দিয়ে নিজের কফিন তৈরি করে রেখেছি।
তিনি জানান, তার তিন বোন ও দুই ভাইয়ের মধ্যে এক ছোট বোন ইতোমধ্যে মারা গেছেন। তিনি তিন ছেলে ও দুই মেয়ের জনক। পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন। জীবনে আর কোনো অপূর্ণ ইচ্ছা নেই বলেও জানান তিনি।
পূর্ণচন্দ্র ম্রোর মেজো ছেলে মেনপুং ম্রো বলেন, বাবা সাড়ে চার বছর আগে থেকেই মৃত্যুর জন্য নিজেকে প্রস্তুত করেছেন। নিজের ইচ্ছায় কদম গাছের কাঠ দিয়ে কফিন তৈরি করেছেন। আমরা বাধা দিইনি। কারণ এতে তিনি কষ্ট পেতেন।
টংকাবতী ইউনিয়নের পুনর্বাসন চাকমাপাড়ার কারবারি (গ্রাম প্রধান) আনন্দ মোহন চাকমা বলেন, 'পূর্ণচন্দ্র ম্রো একজন অত্যন্ত সৎ, নীতিবান ও পরোপকারী মানুষ। দীর্ঘদিন চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি বর্তমানে মৌজা হেডম্যান হিসেবেও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি সব সম্প্রদায়ের মানুষের পাশে দাঁড়ান এবং বিচার-সালিশে আত্মীয়-স্বজন বা পরিচিত-অপরিচিত বিবেচনা না করে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার চেষ্টা করেন। আমি তার সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ু কামনা করি।'
টংকাবতি মৌজার পূর্ণচন্দ্র ম্রোর বড় ছেলে মাংয়ং ম্রো বর্তমানে টংকবতি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের দায়িত্বে রয়েছেন।
বাবার কফিন তৈরি করে রাখার বিষয়ে মাংয়ং ম্রো বলেন, 'আমার বাবার বর্তমান বয়স ৭৮ বছর। তিনি বাস্তববাদী মানুষ। তার কাছ থেকেই জীবনের বাস্তবতা মেনে নেওয়ার শিক্ষা পেয়েছি। নিজের ইচ্ছায় কদম গাছের কাঠ দিয়ে কফিন তৈরি করে রেখেছেন। বাড়িতে কফিনটি দেখলে কখনো হাসি পায়, কখনও ভাবনা তৈরি হয়। তবুও বাবার সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ু কামনা করি আমরা।'
নিজের মৃত্যুর আগে নিজের পছন্দের কাঠ দিয়ে কফিন তৈরি রাখা বিষয়ে জানতে চাইলে ম্রোদের সামাজিক সংগঠন ম্রো সোশ্যাল কাউন্সিলে সাবেক সভাপতি ও জেলা পরিষদের সদস্য খামলাই ম্রো বলেন, এটা ব্যতিক্রমী একটা ঘটনা। তবে ম্রো সমাজে সামাজিকভাবে প্রচলিত না হলেও এর আগে আরও কয়েকজন এভাবে করে গেছে। ম্রো সমাজে বয়স্ক ও মুরব্বিদের ব্যক্তি বিশেষের কেউ কেউ নিজের মৃত্যুর আগে ঘরে কফিন তৈরি করে রাখে। বলা যায় মৃত্যুর আগে যে যার একটা ইচ্ছা থাকে এটার সেটারই অংশ।
