বান্দরবানে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি, সারাদেশের সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন
পাহাড়ি ঢল ও অতিবৃষ্টিতে বান্দরবানে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। বিভিন্ন স্থানে পাহাড়ধস ও সড়ক তলিয়ে যাওয়ায় সারা দেশের সঙ্গে বান্দরবানের সড়ক যোগাযোগ পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
পাহাড়ধস ও সড়ক পানিতে ডুবে থাকায় জেলা শহরের সঙ্গে রাঙ্গামাটি, বাঙ্গালহালিয়া-চন্দ্রঘোনা সড়ক এবং রোয়াংছড়ি, রুমা ও থানচি উপজেলার সব ধরনের যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। সাতকানিয়ার বাজালিয়া এলাকায় সড়ক তলিয়ে যাওয়া এবং গাছ উপড়ে পড়ায় বান্দরবান থেকে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারগামী দূরপাল্লার বাস চলাচলও বন্ধ রয়েছে।
স্থানীয়রা জানান, গতকাল শুক্রবার নিম্নাঞ্চলের পানি কিছুটা নামতে শুরু করলেও রাতে আবারও ভারী বৃষ্টি হওয়ায় পরিস্থিতি শোচনীয় হয়ে ওঠে। শনিবার সকালে বান্দরবান-রাঙ্গামাটি সড়কের বাঙ্গালহালিয়ার ব্রিজঘাট এলাকায় একটি বেইলি ব্রিজ সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে। এতে এই সড়কে মোটরসাইকেল ও সিএনজি অটোরিকশাও চলাচল করতে পারছে না। মানুষ জীবন ঝুঁকি নিয়ে পায়ে হেঁটে পারাপার হচ্ছেন।
বান্দরবান সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী সাখাওয়াত হোসেন বলেন, 'দুধপুকুরিয়া এলাকার রাবার ড্যামের বেড়িবাঁধ ভেঙে যাওয়ায় পানির তীব্র স্রোতে ব্রীজঘাট সেতু ভেঙে পড়ে। ফলে শনিবার সকাল হতে এই সড়কে সব ধরনের যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। বান্দরবান সওজ-এর পক্ষ হতে যোগাযোগ পুনস্থাপন করার জন্য আমাদের একটি টিম প্রস্তুত রয়েছে। কিন্তু ওই সড়কের বালাঘাটা ও স্বর্ণমন্দির এলাকায় সড়কে পানি থাকায় আমরা রওনা করতে পারছি না।'
বিদ্যুতের খুঁটি ও লাইনের ওপর গাছ ভেঙে পড়ায় শনিবার সকাল থেকে পুরো জেলা শহর বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়েছে। প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত (বিকাল ৫টা) শহরে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ ছিল। এছাড়া শহরের কিছু এলাকা ছাড়া অধিকাংশ জায়গায় মোবাইল নেটওয়ার্ক ও ইন্টারনেট সেবা কাজ করছে না। ফলে জরুরি যোগাযোগের ক্ষেত্রে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন স্থানীয়রা।
শহরের ফায়ার সার্ভিস, বিদ্যুৎ বিতরণ বিভাগের রেস্ট হাউস, সেনাবাহিনীর ব্রিগেড এলাকা, বেতার এলাকা ও পুলিশ লাইন এলাকায় বন্যার পানি থই থই করছে। বিশেষ করে বালাঘাটার ব্রিগেড এলাকা ও পুলিশ লাইন এলাকায় মানুষ নৌকায় করে জরুরি যাতায়াত করছেন। এছাড়া রুমা, রোয়াংছড়ি, থানচি, লামা ও আলীকদমেও বিদ্যুৎ ও মোবাইল নেটওয়ার্ক বিচ্ছিন্ন রয়েছে।
রোয়াংছড়ি সদর ইউপি চেয়ারম্যান মেহ্লাঅং মারমা বলেন, 'সদরের নিম্নাঞ্চল এলাকার পাড়াগুলো পুরোপুরি ডুবে গেছে। ফোন করে খবর নেব সে উপায়ও নেই। নিজে গিয়ে গিয়ে খবর নিতে হচ্ছে।'
আলীকদম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মনজুর আলম জানান, উপজেলায় দুর্যোগ মোকাবেলায় সমন্বিত সভা করা হয়েছে। উপজেলার চার ইউনিয়নে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সংখ্যা আনুমানিক ১ হাজার ৩৩০টি। কৃষিজমি ও ফসলের ক্ষতির তালিকা কৃষি বিভাগের মাধ্যমে আলাদাভাবে করা হবে।
দুর্গতদের পাশে সরকারি প্রশাসনের পাশাপাশি বিভিন্ন বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাও (এনজিও) কাজ করছে। ব্র্যাক-এর জেলা সমন্বয়ক সুশান্ত বিশ্বাস জানান, ইতিমধ্যে লামায় ৩০০ পরিবার, নাইক্ষ্যংছড়িতে ১০০ পরিবার এবং বান্দরবান সদরের গোয়ালিখোলা এলাকায় ২৬৫ পরিবারকে ৮৮৫ টাকার একটি করে জরুরি খাদ্যসামগ্রী (চাল, ডাল, চিনি, গুড়, লবণ, পেঁয়াজ) প্যাকেজ দেওয়া হয়েছে।
বলিপাড়া নারী কল্যাণ সংস্থার (বিএনকেএস) উপনির্বাহী পরিচালক উবানু মারমা জানান, বান্দরবান পৌরসভা, সদর ইউনিয়ন, জামছড়ি ও কুহালং ইউনিয়ন এবং লামা পৌরসভা, সদর ইউনিয়ন, গজালিয়া ও রূপসীপাড়া ইউনিয়নের বন্যায় দুর্গত ১৬ হাজার পরিবারকে ৫ হাজার টাকা করে বিকাশের মাধ্যমে বিতরণ করা হয়েছে।
সার্বিক বিষয়ে বান্দরবানের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক ও পৌর প্রশাসক এস এম মঞ্জুরুল হক বলেন, সকালে পানি যেটুকু ছিল, তা আরও বাড়ছে। শহরের পৌর এলাকার আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে থাকা ৩ হাজার ৩০০ জন মানুষকে দুপুরে খাবার দেওয়া হয়েছে। রাতে আট হাজারেরও বেশি দুর্গত মানুষের জন্য খাবারের আয়োজন করা হচ্ছে।
বন্যা পরিস্থিতির কারণে জেলার সব পর্যটনকেন্দ্র বন্ধের মেয়াদ আগামী ১৫ জুলাই পর্যন্ত বাড়িয়েছে জেলা প্রশাসন। এই সময়ের মধ্যে স্থানীয় বাসিন্দাদেরও সাবধানে চলাচলের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
