এমআরটি লাইন–১ প্রকল্পের অচলাবস্থা নিরসনে জাইকারে সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছে সরকার
জাপানের ঋণে বাস্তবায়নাধীন বিমানবন্দর থেকে কমলাপুর পর্যন্ত এমআরটি লাইন–১ প্রকল্প ঘিরে সৃষ্ট অচলাবস্থা নিরসনে জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি (জাইকা)-এর সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছে সরকার।
দরপত্রের অস্বাভাবিক উচ্চমূল্যকে কেন্দ্র করে প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থা ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল) এবং জাইকার মধ্যে মতবিরোধের কারণে দেড় বছরের বেশি সময় ধরে প্রকল্পটির কাজ কার্যত স্থবির হয়ে আছে।
স্থবিরতা কাটিয়ে দ্রুত প্রকল্প বাস্তবায়ন কাজ শুরু করতে গতকাল (১০ মার্চ) অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগে (ইআরডি) জাইকার সঙ্গে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন ইআরডির অতিরিক্ত সচিব ড. মোহাম্মদ মিজানুর রহমান। এতে ইআরডির কর্মকর্তাদের পাশাপাশি জাইকা, ডিএমটিসিএল এবং সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
এমআরটি–১ প্রকল্পের অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রকল্প পরিচালক মো. সারওয়ার উদ্দিন খান দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, এমআরটি–১ এর বিভিন্ন প্যাকেজে অনুমোদিত ব্যয় প্রস্তাবের তুলনায় ঠিকাদারদের দর প্রস্তাবে যে বেশি ব্যয় এসেছে, তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।
তিনি বলেন, 'ঠিকাদারদের দরপত্র কতটুকু কমানো সম্ভব, তা নির্ধারণ করতে আরও আলোচনা হবে। আলোচনার ভিত্তিতেই এমআরটি–১ প্রকল্পের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।'
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইআরডির এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, জাইকার সঙ্গে ইতোমধ্যে ঋণচুক্তি সই হওয়ায় অস্বাভাবিক দর প্রস্তাব নিয়ে খুব বেশি দর-কষাকষির সুযোগ সীমিত।
তিনি বলেন, 'তবে আলোচনার মাধ্যমে যতটা সম্ভব ব্যয় কমানোর চেষ্টা করা হবে। সরকার চায় প্রকল্পের কাজ দ্রুত শুরু হোক।'
সূত্র জানায়, বিমানবন্দর থেকে কমলাপুর পর্যন্ত এমআরটি লাইন–১ নির্মাণকাজের জন্য পাওয়া দরপত্রগুলো প্রত্যাশার তুলনায় অনেক বেশি হওয়ায় ডিএমটিসিএল সেগুলো বাতিল করে নতুন আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বানের সুপারিশ করেছিল। তবে জাইকা এখন পর্যন্ত এ প্রস্তাবে সম্মতি দেয়নি।
ডিএমটিসিএলের মূল্যায়ন প্রতিবেদন অনুযায়ী, মূল উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনায় (ডিপিপি) সরকার এমআরটি লাইন–১ প্রকল্পের ব্যয় অনুমোদন করেছিল ৫২,৫৬১.৪৩ কোটি টাকা। কিন্তু জাপানি পরামর্শক ও ঠিকাদাররা এই প্রকল্পের সংশোধিত ব্যয় প্রস্তাব করেছে ৯৬,৪২২.৭০ কোটি টাকা, যা প্রায় ৮৩ শতাংশ বেশি।
ডিপিপিতে ডিপো, ভূগর্ভস্থ ও উড়াল টানেল স্টেশন, বৈদ্যুতিক ও যান্ত্রিক কাজ এবং রোলিং স্টকসহ কনট্রাক্ট প্যাকেজগুলোর ব্যয় ধরা হয়েছিল ৩৭,৬৫৫.৬৬ কোটি টাকা (কনটিনজেন্সিসহ)। এখন তা প্রস্তাব করা হয়েছে ৮০,০৯৯.৭৯ কোটি টাকা।
ডিএমটিসিএলের কর্মকর্তারা জানান, আমিনবাজার থেকে ভূগর্ভস্থ রেললাইন নির্মাণে তিনটি প্যাকেজ রয়েছে। প্যাকেজ–৪ (আমিনবাজার থেকে মিরপুর–১), প্যাকেজ–৫ (মিরপুর–১ স্টেশনের পূর্ব পাশ থেকে কচুক্ষেত স্টেশন) এবং প্যাকেজ–৬ (কচুক্ষেত স্টেশন থেকে ভাটারা ট্রানজিশন সেকশন)। এই তিনটি প্যাকেজের জন্য প্রকল্প প্রস্তাবে ব্যয় ধরা হয়েছিল ১৩,৯৬৬.২ কোটি টাকা। কিন্তু ঠিকাদারদের দর প্রস্তাব অনুযায়ী এই ব্যয় এখন দাঁড়াচ্ছে ৩০,৮৬৫ কোটি টাকা।
সংশ্লিষ্টরা জানান, জাপানের ঋণের শর্ত অনুযায়ী এসব প্রকল্পে জাপান থেকেই পরামর্শক নিয়োগ দিতে হয়। আর এই পরামর্শকরাই দরপত্রের নথি প্রস্তুত করেন, যা অনেক সময় এমনভাবে তৈরি করা হয় যে কার্যত জাপানি ঠিকাদার ছাড়া অন্যদের অংশগ্রহণের সুযোগ থাকে না।
সংশ্লিষ্টরা জানান, কাগজে এটি ওপেন টেন্ডার বলা হলেও বাস্তবে দেখা যায় একই দুই–তিনটি কোম্পানি বারবার দরপত্রে প্রথম ও দ্বিতীয় অবস্থান অর্জন করছে। ফলে কাগজে ওপেন টেন্ডার হলেও বাস্তবে এটি সীমিত প্রতিযোগিতার কাঠামো হয়ে দাঁড়িয়েছে, যেখানে নতুন বা বিকল্প যোগ্য প্রতিষ্ঠান বাজারে প্রবেশের সুযোগ পায় না।
এ ছাড়া সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিয়ে প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য অক্ষুণ্ণ রেখে বিদ্যমান কার্যপরিধি সংশোধন বা পুনর্নির্ধারণের প্রস্তাবও দিয়েছিল ডিএমটিসিএল।
কর্মকর্তারা জানান, এ বিষয়টি নিয়ে গত কয়েক মাস ধরে ডিএমটিসিএল ও জাইকার মধ্যে টানাপোড়েন চলছে। বাংলাদেশের পক্ষ বর্তমান দরপত্র বাতিল করে নতুন আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র আহ্বানের পক্ষে। তবে জাইকা বলছে, তাদের ক্রয় নির্দেশিকা অনুযায়ী দরপত্র মূল্যায়ন প্রক্রিয়া সঠিকভাবে সম্পন্ন হয়েছে এবং বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি ও ভূগর্ভস্থ নির্মাণের ঝুঁকির কারণে ব্যয় বেশি হওয়া স্বাভাবিক।
আন্তর্জাতিক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে প্রতিযোগিতা বাড়াতে জাইকার ঋণচুক্তিতে সংশোধনের প্রস্তাবও দেয় ডিএমটিসিএল। এতে ঋণচুক্তির কৌশলগত শর্ত, জাপানি ঠিকাদার ও সরবরাহকারীদের জন্য কর অব্যাহতি, প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মীদের আয়ের ওপর করমুক্ত সুবিধা এবং প্রকল্প সংশ্লিষ্ট আমদানি ও পুনঃরপ্তানিতে কর ও শুল্ক অব্যাহতির বিষয়গুলো পুনর্বিবেচনা করে দরপত্র প্রক্রিয়া আরও উন্মুক্ত করার সুপারিশ করা হয়।
এ ছাড়া, প্রাক-যোগ্যতা ছাড়া 'ওয়ান স্টেজ, টু এনভেলপ' পদ্ধতি প্রয়োগের মাধ্যমে অধিক যোগ্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করার সুপারিশও করে ডিএমটিসিএল।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. শামসুল হক বলেন, কোনো প্রকল্প যদি অতিমূল্যায়িত হয়, তাহলে তা পুনর্মূল্যায়ন করা ন্যায্য।
তিনি বলেন, 'আমরা জনগণের টাকা ঋণ হিসেবে নিচ্ছি। তাই সাশ্রয়ী মূল্যে প্রকল্প বাস্তবায়ন করা আমাদের ন্যায্য অধিকার। জাপানের মতো দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের উন্নয়ন অংশীদারত্ব রয়েছে, তবে জনস্বার্থ রক্ষায় অতিমূল্যায়িত প্রকল্পের পুনর্মূল্যায়ন করা যৌক্তিক।'
তিনি আরও বলেন, আগের সরকারের সময়ে বিদ্যুৎ খাতে যে অযৌক্তিক চুক্তিগুলো হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে, সেগুলোও সরকার ইতোমধ্যে পুনর্মূল্যায়ন করছে।
অধ্যাপক ড. মো. শামসুল বলেন, 'জাইকার ঋণে অনেক দেশে মেট্রোরেল প্রকল্প হয়েছে, সেগুলোর ব্যয় আমাদের চেয়ে অনেক কম। যদি অতিমূল্যায়িত প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়, তাহলে সেখান থেকে আমাদের সুফল কম আসবে এবং একই সঙ্গে ঋণের বোঝা বাড়বে।'
