অনুমোদনের তুলনায় অস্বাভাবিক বেশি দর প্রস্তাব, পুনরায় দরপত্রে যাচ্ছে এমআরটি-১, এমআরটি-৫
ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল) রাজধানীর দুটি গুরুত্বপূর্ণ মেট্রোরেল প্রকল্প—এমআরটি লাইন-১ ও এমআরটি লাইন-৫ (নর্দার্ন)—এর ক্রয় প্রক্রিয়া স্থগিত করেছে। দরপত্রে প্রস্তাবিত ব্যয় মূল অনুমোদিত ব্যয়ের প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যাওয়ায় 'অস্বাভাবিক' ব্যয় বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে প্রকল্প প্রস্তাবনায় (ডিপিপি) পূর্ণাঙ্গ সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এই অস্বাভাবিক দরবৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে ডিএমটিসিএল সংশোধিত ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট প্রোফরমা (ডিপিপি) অনুমোদনের পর, এমআরটি লাইন-১ (বিমানবন্দর–কমলাপুর) এবং এমআরটি লাইন-৫ (নর্দার্ন) প্রকল্পের জন্য নতুন করে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র আহ্বান করবে।
ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়া
দরপত্র মূল্যায়নের সময় প্রকল্প ব্যয় হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এমআরটি লাইন-১, যে প্রকল্পে সরকারের অনুমোদিত ব্যয় ছিল ৫২ হাজার ৫৬১ কোটি টাকা; সেখানে দরপত্রে উঠে এসেছে প্রায় ৯৬ হাজার কোটি টাকার প্রস্তাব, যা মূল অনুমানের তুলনায় প্রায় ৯০ শতাংশ বেশি। অন্যদিকে, এমআরটি লাইন-৫ (নর্দার্ন) প্রকল্পে যেসব টানেল প্যাকেজের জন্য ডিপিপিতে বরাদ্দ ছিল ৩ থেকে ৪ হাজার কোটি টাকা, সেগুলোর দর এখন দাঁড়িয়েছে ১১ থেকে ১৫ হাজার কোটি টাকায়।
ফলে দুটি মেট্রোরেল প্রকল্পের মোট ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে সরকারের অনুমোদিত ব্যয়ের তুলনায় প্রায় ৯০ থেকে ১০০ শতাংশ বেশি।
নতুন করে ব্যয় নির্ধারণ ও উন্মুক্ত দরপত্র
ডিএমটিসিএলের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মন্ত্রণালয়ের সম্মতি নিয়েই আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান নিয়োগ দিয়ে এমআরটি-১ ও এমআরটি-৫ (নর্দার্ন) প্রকল্পের নকশা, নির্মাণযোগ্যতা এবং ব্যয় নতুন করে পর্যালোচনা করা হবে। সেই মূল্যায়নের ভিত্তিতে সংশোধিত প্রকল্প ব্যয় সরকারের অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হবে। এর মাধ্যমে মেট্রোরেল প্রকল্পের অস্বাভাবিক ব্যয় নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে বলে আশা করছে সংস্থাটি।
একই সঙ্গে সংশোধিত ডিপিপিতে প্রকৃত অর্থে উন্মুক্ত দরপত্র ব্যবস্থা, স্মার্ট অর্থায়ন কাঠামো, লাইফ-সাইকেল ব্যয়ভিত্তিক পরিকল্পনা, স্থানীয় শিল্পের কার্যকর অংশগ্রহণ এবং উন্নত প্রকল্প গভর্ন্যান্স ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
ডিএমটিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফারুক আহমেদ বলেন, অতিরিক্ত প্রকৌশলগত ও চুক্তিগত শর্ত বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্পে প্রতিযোগিতাকে সীমিত করে ফেলেছে, ফলে সক্ষম আন্তর্জাতিক ঠিকাদাররা অংশ নিতে আগ্রহ হারাচ্ছেন।
তিনি বলেন, "প্রতিযোগিতা যখন সীমিত থাকে, তখন রিয়েল মার্কেট ডাইনামিক্সের বদলে অল্প কয়েকটি দরদাতা মূল্য নির্ধারণ করে। এতে দরপত্রের মূল্য আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক মানদণ্ডের তুলনায় অনেক বেশি হয়ে যায়। প্রতিবেশী দেশগুলোতে একই ধরনের মেট্রো প্রকল্প অনেক কম ব্যয়ে বাস্তবায়িত হয়েছে।"
জাইকার অর্থায়ন ও সীমিত প্রতিযোগিতা
ডিএমটিসিএলর কর্মকর্তারা জানান, জাপান সরকারের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) অর্থায়নের প্রকল্পে কেবল জাপান থেকেই পরামর্শক নিয়োগ দিতে হয় চুক্তি অনুযায়ী। আর পরামর্শকই প্রতিষ্ঠানই এমনভাবে দরপত্র নথি তৈরি করে, যেখানে জাপান ছাড়া অন্যান্য দেশের ঠিকাদাররা দরপত্রে অংশগ্রহণ করতে পারে না। এর জটিলতার কারণে প্রকল্প দুটির দপরপত্রে জাপানের মাত্র কয়েকটি ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানই অংশ নিচ্ছে।
ডিএমটিসিএলের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, "এর ফলে পরামর্শকদের প্রাক্কলন এবং ঠিকাদারদের দরপত্র উভয়ই মূল প্রকল্পের প্রস্তাবের তুলনায় অনেক বেশি হয়ে যায়।"
এমআরটি-১ প্রকল্পটি ২০১৯ সালে আগের সরকারের আমলে অনুমোদিত হয়। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর দরপত্র প্রক্রিয়া স্থগিত করে ব্যয় ও দরপত্র মূল্যায়নের একটি বিস্তৃত পর্যালোচনা শুরু করা হয়।
ডিএমটিসিএলের মূল্যায়ন প্রতিবেদনে দেখা যায়, সরকার মূল ডিপিপিতে এমআরটি লাইন-১ এর ব্যয় অনুমোদন করেছিল ৫২ হাজার ৫৬১ কোটি ৪৩ লাখ টাকা। কিন্তু, জাপানি পরামর্শক ও ঠিকাদাররা এই প্রকল্পে ব্যয় প্রস্তাব করেছে ৯৬ হাজার ৪২২ কোটি ৭০ লাখ টাকা। ডিপো, টানেল, স্টেশন, রোলিং স্টক এবং ইলেকট্রিক্যাল ও মেকানিক্যাল কাজসহ বড় চুক্তি প্যাকেজগুলোর প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছিল ৩৭ হাজার ৬৫৫ কোটি ৬৬ লাখ টাকা, যা পরে দর প্রস্তাব করা হয় ৮০ হাজার ৯৯ কোটি ৭৯ লাখ টাকা।
এমআরটি-৫ টানেল প্যাকেজ
এমআরটি লাইন-৫ (নর্দার্ন) প্রকল্পের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ টানেল প্যাকেজের দরপত্রে মাত্র দুটি জাপানি কনসোর্টিয়াম অংশ নেয়—তাইসেই–স্যামসাং এর যৌথ উদ্যোগ এবং শিমিজু করপোরেশনের নেতৃত্বাধীন এসএলটিএম যৌথ উদ্যোগ।
প্যাকেজ-৫ এর আওতায় ৩ দশমিক ৫ কিলোমিটার টানেল ও তিনটি ভূগর্ভস্থ স্টেশন রয়েছে। ডিপিপিতে এর ব্যয় ধরা হয়েছিল ৩ হাজার ৪৪২ কোটি ৭১ লাখ টাকা। পরামর্শকরা পরে এটি সংশোধন করে ৫ হাজার ২১২ কোটি ৬০ লাখ টাকা নির্ধারণ করেন। দরপত্রে এসএলটিএম যৌথ উদ্যোগ সর্বনিম্ন দর দেয় ১১ হাজার ১৭৭ কোটি ৬৭ লাখ টাকা, আর তাইসেই–স্যামসাং যৌথ উদ্যোগ দর দেয় ১৪ হাজার ২৫৮ কোটি টাকা।
অন্যদিকে প্যাকেজ-৬, যেখানে ৫ দশমিক ৪৯ কিলোমিটার টানেল ও তিনটি ভূগর্ভস্থ স্টেশন রয়েছে, এর প্রাথমিক ব্যয় ছিল ৪ হাজার ৩৬৪ কোটি ৭৫ লাখ টাকা, যা পরে সংশোধন করে ৬ হাজার ১২৬ কোটি ৩০ লাখ টাকা করা হয়। এখানে সর্বনিম্ন দর—১৫ হাজার ৫২৭ কোটি টাকা—দেয় তাইসেই–স্যামসাং যৌথ উদ্যোগ। আর এসএলটিএম যৌথ উদ্যোগ দর দেয় ১৬ হাজার ৪৩০ কোটি ৪৯ লাখ টাকা।
'সম্ভাব্যতা সমীক্ষাতেই অতিমূল্যায়ন শুরু হয়'
বুয়েটের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অধ্যাপক ড. মো. শামসুল হক বলেন, "বড় অবকাঠামো প্রকল্পে অতিমূল্যায়নের শুরু হয় ফিজিবিলিটি স্টাডি (সম্ভাব্যতা সমীক্ষা) পর্যায় থেকেই। আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী, ফিজিবিলিটির ভিত্তিতে ডিপিপি ও ইঞ্জিনিয়ারিং ডিজাইন হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে পুরো প্রক্রিয়াটি একটি সীমিত বলয়ের মধ্যে পরিচালিত হয়; ফলে ডিপিপি কার্যত বেঞ্চমার্ক (মানদণ্ড) হিসেবে গুরুত্ব হারায়। ডিপিপির পরিবর্তে পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের ইঞ্জিনিয়ারিং এস্টিমেটকে সিদ্ধান্তের মূল ভিত্তি বানানো হয়। কোনো নতুন স্টাডি ছাড়াই বড় অঙ্কের আর্থিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়, যার ফলে টেন্ডারে ৪০–৫০ শতাংশ বা তার বেশি ব্যয়বৃদ্ধি 'স্বাভাবিক' হিসেবে উপস্থাপিত হয়।"
তিনি আরো বলেন, "জাইকার অর্থায়নের প্রকল্পে দরপত্র প্রক্রিয়ায় প্রকৃত প্রতিযোগিতা অনুপস্থিত থাকে। বিড ডকুমেন্ট এমনভাবে তৈরি করা হয় যাতে নির্দিষ্ট কয়েকটি কোম্পানি ছাড়া অন্যরা যোগ্যতা অর্জন করতে না পারে। কাগজেকলমে উন্মুক্ত দরপত্র বলা হলেও বাস্তবে এটি সীমিত প্রতিযোগিতার কাঠামো। নির্মাণ শুরুর পর ভ্যারিয়েশন ও নতুন স্কোপ যুক্ত করে খরচ আরও বাড়ানো হয়। এভাবে অতিরিক্ত ব্যয় অনুমোদন একটি প্রাতিষ্ঠানিক রুটিনে পরিণত হয়।"
পুনরায় টেন্ডারই 'একমাত্র বাস্তবসম্মত পথ'
ডিএমটিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফারুক আহমেদ বলেন, দরপত্রের মূল্য নির্মাণযোগ্যতা, চুক্তির কাঠামো, ঝুঁকি বণ্টন এবং ক্রয়পদ্ধতির ওপর নির্ভর করে। তবে অনুমোদিত ডিপিপি ব্যয়ের তুলনায় ৯০–১০০ শতাংশ বেশি দরপত্র গ্রহণযোগ্য বা আইনগতভাবে টেকসই নয়।
তিনি বলেন, "এ ধরনের পরিস্থিতিতে ডিপিপি সংশোধন, নতুন করে অনুমোদন নেওয়া এবং প্রকৃত প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়ায় পুনরায় দরপত্র আহ্বান করাই একমাত্র বাস্তবসম্মত পথ।"
ফারুক আহমেদ স্মার্ট অর্থায়ন মডেলের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন, যাতে মূলধনী ব্যয়ের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়ও সর্বোত্তম করা যায়। পাশাপাশি বিদেশ নির্ভরতা কমাতে ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য স্থানীয় শিল্পের অংশগ্রহণ জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
স্থানীয় সক্ষমতা ও স্মার্ট ঋণ
ডিএমটিসিএলের কর্মকর্তারা জানান, বিদেশি ঋণ আলোচনায় সাধারণত সুদের হার ও গ্রেস পিরিয়ড নিয়েই বেশি আলোচনা হয়, কিন্তু দরপত্র সীমাবদ্ধতা, স্থানীয় উপকরণ ব্যবহারের শর্ত এবং পুনরায় টেন্ডারের সুযোগের মতো বিষয়গুলো নিয়ে পেশাদারভাবে আলোচনা করা হয় না।
"ফলে 'সফট লোন'-এর আড়ালে কঠোর ও ক্ষতিকর শর্ত গৃহীত হয়," বলেন এক কর্মকর্তা। তিনি জানান, এ কারণে 'স্মাট' বৈদেশিক ঋণের কথা বলা হচ্ছে। একই সঙ্গে মেট্রোরেলের অর্থায়নের বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে যুক্ত করার বিষয়টি ডিএমটিএলের বিবেচনায় রয়েছে।
ডিএমটিসিএল ব্যয় কমাতে স্থানীয় যন্ত্রপাতি ও জনবল ব্যবহারের কৌশলও বিবেচনা করছে। এরমধ্যে দেশেই মেট্রোরেলের কোচ, বগি ও যন্ত্রাংশ উৎপাদনের পরিকল্পনাও রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা জানান—ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া বা ভিয়েতনামের মতো দেশগুলো মেট্রো প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে কয়েক বছর ধরে পরিকল্পিতভাবে নিজস্ব মানবসম্পদ তৈরি করেছে। শুরুতে বিদেশি বিশেষজ্ঞ এনেছে, কিন্তু সমান্তরালে স্থানীয় টিম গড়ে তুলেছে। বাংলাদেশে সেই সক্ষমতা তৈরি কখনোই করা হয়নি।
ড. শামসুল হক বলেন, "মেট্রোর খরচ কমানোর সবচেয়ে বড় সুযোগ ছিল লোকাল ম্যানুফ্যাকচারিং ও লোকাল ইঞ্জিনিয়ারিং সক্ষমতা। বাংলাদেশে অবকাঠামো উন্নয়ন হয়েছে, কিন্তু তা হয়েছে নিজস্ব সক্ষমতা তৈরি না করেই। এর আর্থিক ও বৈদেশিক মুদ্রার চাপ ভবিষ্যতে বড় সংকটে রূপ নিতে পারে।"
