গণপিটুনিতে তোফাজ্জল হত্যা: ২৮ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট গ্রহণ, ২২ জনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ফজলুল হক মুসলিম হলে চোর সন্দেহে তোফাজ্জল নামের এক মানসিক ভারসাম্যহীন যুবককে পিটিয়ে হত্যার মামলায় ২৮ জনের বিরুদ্ধে পুলিশের দেওয়া সম্পূরক চার্জশিট গ্রহণ করেছেন আদালত। একই সঙ্গে পলাতক ২২ জনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির আদেশ দেওয়া হয়েছে।
মঙ্গলবার (১০ মার্চ) দুপুরে শুনানি শেষে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. জুয়েল রানার আদালত এ আদেশ দেন।
ঢাকা মহানগর পুলিশের প্রসিকিউশন বিভাগের উপপরিদর্শক জিন্নাত আলী এ তথ্য নিশ্চিত করে বলেন, আদালত পুলিশের দেওয়া সম্পূরক চার্জশিট আমলে নিয়েছেন এবং মামলাটি বিচারের জন্য বদলির নির্দেশ দিয়েছেন।
২০২৫ সালের ১৮ ডিসেম্বর মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআইয়ের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. হান্নানুল ইসলাম ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালতে সম্পূরক চার্জশিট জমা দেন। আজ ১০ মার্চ ওই চার্জশিটের গ্রহণযোগ্যতা শুনানির জন্য তারিখ নির্ধারিত ছিল।
চার্জশিটে নাম আসা আসামিদের মধ্যে রয়েছেন পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী মো. জালাল মিয়া (২৬), মৃত্তিকা, পানি ও পরিবেশ বিভাগের সুমন মিয়া (২১), পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের মো. মোত্তাকিন সাকিন শাহ (২৪), ভূগোল বিভাগের আল হোসেন সাজ্জাদ (২৩) এবং ফজলুল হক মুসলিম হলের আবাসিক শিক্ষার্থী মো. আহসান উল্লাহ ওরফে বিপুল শেখ (২৪), ওয়াজিবুল আলম (২২), মো. ফিরোজ কবির (২৩), মো. আব্দুস সামাদ (২৪), মো. সাকিব রায়হান (২২), মো. ইয়াছিন আলী গাইন (২১), মো. ইয়ামুজ্জামান ওরফে ইয়াম (২২), মো. ফজলে রাব্বি (২৪), শাহরিয়ার কবির শোভন (২৪), মো. মেহেদী হাসান ইমরান (২৫), মো. রাতুল হাসান (২০), মো. সুলতান মিয়া (২৪), মো. নাসির উদ্দীন (২৩), মো. মোবাশ্বের বিল্লাহ (২৫), শিশির আহমেদ (২২), মো. মহসিন উদ্দিন ওরফে শাফি (২৩), আব্দুল্লাহিল কাফি (২১), শেখ রমজান আলী রকি (২৫), মো. রাশেদ কামাল অনিক (২৩), মো. মনিরুজ্জামান সোহাগ (২৪), মো. আবু রায়হান (২৩), রেদোয়ানুর রহমান পারভেজ (২৪), রাব্বিকুল রিয়াদ (২৩) ও মো. আশরাফ আলী মুন্সী (২৬)।
আসামিদের মধ্যে মো. আহসান উল্লাহ ওরফে বিপুল শেখ ও ওয়াজিবুল আলম জামিনে রয়েছেন। পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী মো. জালাল মিয়া, ভূগোল বিভাগের আল হোসেন সাজ্জাদ, পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের মো. মোত্তাকিন সাকিন শাহ এবং মৃত্তিকা, পানি ও পরিবেশ বিভাগের সুমন মিয়া গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে রয়েছেন। বাকি ২২ জন পলাতক থাকায় তাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন আদালত।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা হান্নানুল ইসলাম জানান, আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী আগে অব্যাহতি পাওয়া আটজনের বিরুদ্ধেও পুনরায় তদন্ত করা হয়েছে। আগের তদন্ত কর্মকর্তার তদন্তে উঠে আসা ২১ জনসহ মোট ২৮ জনের বিরুদ্ধে সম্পূরক চার্জশিট দাখিল করা হয়েছে। এ ঘটনায় এদের বাইরে আর কাউকে আসামি হিসেবে পাওয়া যায়নি।
এর আগে গত বছরের ১ জানুয়ারি শাহবাগ থানার পুলিশ পরিদর্শক আসাদুজ্জামান ২১ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে চার্জশিট জমা দেন। তবে অন্য আসামিদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে নাম আসা আটজনকে অব্যাহতি দেওয়ায় মামলার বাদীপক্ষ নারাজি দেন। পরে আদালত ওই নারাজি আবেদনের শুনানি নিয়ে ২৬ ফেব্রুয়ারি অধিকতর তদন্তের নির্দেশ দেন।
সম্পূরক চার্জশিটে তদন্ত কর্মকর্তা উল্লেখ করেন, ঘটনার দিন তোফাজ্জল রাত ৭টা ৪০ মিনিট ১০ সেকেন্ডে হলের মূল ফটক দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করেন। তিন মিনিট ১৮ সেকেন্ড পর তিনি হলের মাঠে ঢোকেন। খেলা পরিচালনা মঞ্চের পাশ দিয়ে মাঠে বসার ৫৭ সেকেন্ড পরই ছাত্ররা তাকে চোর সন্দেহে মারধর শুরু করে। পরে তাকে মূল ভবনের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়।
প্রায় ২৫ মিনিট জেরা ও মারধরের পর একদল ছাত্র বুঝতে পারে যে মোবাইল চুরির সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই। পরে তাকে হলের ক্যান্টিনে খাওয়ানো হয়। তবে খাওয়ার পর আবার তাকে মারধর করা হয়। শিক্ষকরা এসে তাকে উদ্ধার করার চেষ্টা করলে প্রথমে ব্যর্থ হন। পরে রাত ১০টা ৫২ মিনিটে তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
মামলার এজাহারে বলা হয়, ২০২৪ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর রাত পৌনে ৮টার দিকে এক যুবক ফজলুল হক মুসলিম হলের গেটে সন্দেহজনকভাবে ঘোরাফেরা করছিলেন। এ সময় কয়েকজন শিক্ষার্থী তাকে আটক করে হলের মূল ভবনের গেস্টরুমে নিয়ে যান। মোবাইল চুরির অভিযোগ তুলে তাকে মারধর করা হয়। পরে তাকে মানসিক রোগী মনে করে ক্যান্টিনে নিয়ে খাওয়ানো হয়।
এজাহারে আরও বলা হয়, ক্যান্টিনে খাওয়ানোর পর তোফাজ্জল হোসেনকে হলের দক্ষিণ ভবনের গেস্টরুমে নিয়ে জানালার সঙ্গে হাত বেঁধে স্টাম্প, হকিস্টিক ও লাঠি দিয়ে বেধড়ক মারধর করা হয়। এতে তার মৃত্যু হয়।
ঘটনার পর ২০২৪ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর শাহবাগ থানায় মামলা করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের এস্টেট অফিসের সুপারভাইজার মোহাম্মদ আমানুল্লাহ। পরে ২৫ সেপ্টেম্বর নিহতের ফুফাতো বোন মোসাম্মৎ আসমা আক্তার ফজলুল হক মুসলিম হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক শাহ মুহাম্মদ মাসুমসহ ১৫ জনের বিরুদ্ধে আদালতে আরেকটি মামলা করার আবেদন করেন। আদালত বাদীর জবানবন্দি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের করা মামলার সঙ্গে একসঙ্গে তদন্তের নির্দেশ দেন।
