অতিরিক্ত দামের কারণে আটকে গেল মার্কিন প্রতিষ্ঠানের সাথে বাংলাদেশের এলএনজি চুক্তি
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের জেরে বিদ্যমান দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহকারীদের কাছ থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল। এজন্য যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক কমোডিটি ট্রেডার 'গানভর ইউএসএ এলএলসি'র কাছ থেকে দীর্ঘমেয়াদে এলএনজি ক্রয়ের উদ্যোগ নিয়েছিল বাংলাদেশ। তবে কোম্পানিটির চাওয়া উচ্চমূল্যের কারণে চুক্তিটি আপাতত থমকে গেছে।
এর আগে গত ২৮ জুলাই অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি সরকার থেকে সরকার পর্যায়ে (জি-টু-জি) চুক্তি এবং দ্বৈত-বেঞ্চমার্ক মূল্য নির্ধারণ কাঠামোর আওতায়, গানভর-এর সাথে ১৩ বছর মেয়াদী একটি এলএনজি সরবরাহ চুক্তির প্রস্তাবে নীতিগত অনুমোদন দেয়। এই কাঠামো অনুযায়ী প্রথম দিকে এশিয়ান স্পট এলএনজি বেঞ্চমার্কের (জেকেএম) সাথে দাম যুক্ত থাকবে এবং পরবর্তীতে অপেক্ষাকৃত সাশ্রয়ী যুক্তরাষ্ট্রের 'হেনরি হাব' সূচকে স্থানান্তরিত হবে।
তবে গত ৭ আগস্ট সরকারি ক্রয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির (সিসিজিপি) বৈঠকে প্রস্তাবটি চূড়ান্ত অনুমোদন পায়নি। কর্মকর্তারা এর কারণ হিসেবে গানভরের অতিরিক্ত দাম চাওয়াকে দায়ী করেছেন। কমিটি অনুমোদন না দেওয়ায় গানভরের সঙ্গে এলএনজি বিক্রয় ও ক্রয় চুক্তি (এসপিএ) স্বাক্ষর স্থগিত রাখা হয়েছে।
গানভরের প্রস্তাব কী ছিল
প্রস্তাবিত চুক্তি অনুযায়ী, গানভর ২০২৬ সালে ৫ কার্গো, ২০২৭ সালে ৬ কার্গো এবং ২০২৮ সালে ৩ কার্গো এলএনজি সরবরাহ করবে। অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির নীতিগত অনুমোদনের পর পেট্রোবাংলার সঙ্গে তাড়াহুড়ো করে করা আলোচনায় কোম্পানিটি ২০২৬–২৮ মেয়াদের জন্য 'জেকেএম + ০.৮৭৫ ডলারে প্রতি এমএমবিটিইউ দাম নির্ধারণ করে।
তবে জ্বালানি বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, গানভর শুরুতে জেকেএম + ০.১০ ডলার প্রতি এমএমবিটিইউ দরপ্রস্তাব করেছিল। তবে সরকারি ক্রয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিতে পাঠানো প্রস্তাবে গানভরের প্রাথমিক কোটেশনের চেয়ে বেশি দাম ধরা হয়, যা সরকারকে সূচক-সংযুক্ত মূল্য কমানোর বিষয়ে ফের ভাবতে বাধ্য করে।
সরকারি ক্রয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি উত্থাপিত প্রস্তাব পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ২০২৯ থেকে ২০৩৮ সাল পর্যন্ত গানভর প্রতি বছর ১০ কার্গো করে এলএনজি সরবরাহ করবে। এ সময়ের মূল্য নির্ধারিত হয়েছে 'হেনরি হাব' মূল্যসূচকের ১২১ শতাংশের সাথে প্রতি এমএমবিটিইউ-তে ৫.২০ ডলার যোগ করে।
কর্মকর্তাদের মতে, গানভরের প্রাথমিক প্রস্তাব ছিল ২০২৬-২৮ মেয়াদের জন্য জেকেএম + ০.১০ ডলার প্রতি এমএমবিটিইউ এবং ২০২৯ থেকে ২০৩৮ সালের ডেলিভারির জন্য ১২২ শতাংশ হেনরি হাব + ৫.৩৫ ডলার প্রতি এমএমবিটিইউ।
অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি-র প্রাথমিক অনুমোদনের পর পেট্রোবাংলার সঙ্গে দর কষাকষিতে গানভর ২০২৯ পরবর্তী সময়ের জন্য তাদের প্রস্তাবিত হেনরি হাব সূচকের ১২২ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১২১ শতাংশ এবং প্রিমিয়াম ৫.৩৫ ডলার থেকে কমিয়ে ৫.২০ ডলারে রাজি হয়।
কিন্তু একই সাথে তারা ২০২৬-২৮ মেয়াদের জন্য জেকেএম-সংযুক্ত এলএনজির দাম প্রাথমিক প্রস্তাবিত জেকেএম + ০.১০ ডলার থেকে বাড়িয়ে জেকেএম + ০.৮৭৫ ডলার প্রতি এমএমবিটিইউ করে ফেলে।
গানভর কেন দাম বাড়াল
পেট্রোবাংলা এবং জ্বালানি বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, গানভর ২০২৬-২৮ সালের জন্য জেকেএম-সংযুক্ত এলএনজির দাম বাড়িয়েছিল, কারণ ওই সময়ে বিশ্ববাজারে এলএনজি সরবরাহে ঘাটতির পূর্বাভাস রয়েছে। আবার ২০২৯ সাল থেকে অনেকগুলো নতুন এলএনজি অবকাঠামো প্রকল্প চালু হলে আন্তর্জাতিক বাজারে দর কমে আসবে—এমন আশঙ্কায় তারা ২০২৯ পরবর্তী সময়ের জন্য হেনরি হাব-ভিত্তিক দর কিছুটা কমাতে সম্মত হয়।
পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা বলছেন, ইরান যুদ্ধ ও হরমুজ প্রণালিতে নৌ-চলাচল ব্যাহত হওয়ার পর—বিশ্ব জ্বালানি বাজার প্রচণ্ড অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছে। এর ফলে অন্তত ২০২৮ সাল পর্যন্ত এলএনজির বাজার চড়া থাকবে বলে তারা মনে করছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পেট্রোবাংলার এক কর্মকর্তা টিবিএস-কে বলেন, "গানভর সুযোগটি কাজে লাগাচ্ছে, কারণ বর্তমান সংকটের মধ্যে বিশ্বের খুব কম কোম্পানিই দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি চুক্তিতে যেতে চাচ্ছে।"
জ্বালানি বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, তারা সূচক-সংযুক্ত প্রিমিয়াম ও হেনরি হাব মাল্টিপ্লায়ার উভয়ই কমানোর চেষ্টা করছেন। কিন্তু বর্তমানের এই সংকুচিত সরবরাহের বাজারে গানভর কোনো বড় ছাড় দিতে নারাজ।
যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বাজারে বিপুল পরিমাণ শেল গ্যাস উত্তোলনের ফলে দাম কম থাকায় সাধারণত হেনরি হাব-ভিত্তিক এলএনজি, জেকেএম-ভিত্তিক এলএনজির চেয়ে অনেক সাশ্রয়ী হয়। তবে কর্মকর্তারা বলছেন, প্রস্তাবিত ১২১ শতাংশ হেনরি হাব মাল্টিপ্লায়ার সাধারণ বাজারের চেয়ে কিছুটা বেশি।
দীর্ঘমেয়াদি মার্কিন এলএনজি চুক্তিগুলোতে সাধারণত ১১৫ শতাংশ হেনরি হাবের সাথে প্রতি এমএমবিটিইউ-তে প্রায় ৫ থেকে ৬ ডলার তরলীকরণ চার্জ যুক্ত থাকে।
অন্যান্য সরবরাহকারীদের সঙ্গে দর তুলনা
বাংলাদেশের প্রথম দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি সরবরাহকারী কাতার-এনার্জি বর্তমানে প্রতি এমএমবিটিইউ এলএনজি ১০.১১৪ ডলার দরে বছরে ১.৮ থেকে ২.৫ মিলিয়ন টন (এমটিপিএ) সরবরাহ করে থাকে।
দীর্ঘমেয়াদী দ্বিতীয় সরবরাহকারী ওমানের–ওকিউ ট্রেডিং লিমিটেড (পূর্বনাম- ওমান ট্রেডিং ইন্টারন্যাশনাল) ২০১৯ সালে বাংলাদেশে এলএনজি সরবরাহ শুরু করে। তারা ১০ বছর মেয়াদী চুক্তির আওতায় প্রতি এমএমবিটিইউ ৯.৪৪৪ ডলারে ১ থেকে ১.৫ এমটিপিএ এলএনজি সরবরাহ করে, যার মেয়াদ শেষ হবে ২০২৮ সালে।
অন্যদিকে, ভারতের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান–গ্যাস অথরিটি অব ইন্ডিয়া লিমিটেড ২০২৪ সালে কাতার-এনার্জি ট্রেডিংয়ের সাথে ৫ বছর মেয়াদী একটি চুক্তি করে, যেখানে দর নির্ধারিত হয়েছিল ১১৫ শতাংশ হেনরি হাব + ৫.৬০ ডলার প্রতি এমএমবিটিইউ।
এ ছাড়া গুজরাট স্টেট পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন' টোটাল-এনার্জিসের সাথে ২০২৬ সাল থেকে সরবরাহের উদ্দেশ্যে ১০ বছর মেয়াদী চুক্তিতে ১১৯ শতাংশ হেনরি হাব + ৪.৪০ ডলার প্রতি এমএমবিটিইউ দর নির্ধারণ করেছে।
জ্বালানি বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, চলমান যুদ্ধে মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর বিশ্ববাজারে এলএনজি বিক্রেতাদের দর কষাকষির শক্তি বেড়ে গেছে। গানভরের অতিরিক্ত মাল্টিপ্লায়ার দাবি করার পেছনে এটাও একটি কারণ।
জ্বালানি নিয়ে অনিশ্চয়তা
বিদ্যমান সরবরাহকারীদের থেকে গ্যাস পাওয়া নিয়ে সংশয় দেখা দেওয়ায় গানভরের প্রস্তাবটি দ্রুত বিবেচনার প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল।
কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশের বৃহত্তম সরবরাহকারী কাতার-এনার্জি সম্প্রতি জানিয়েছে, ২০২৬ সালে তারা চুক্তিকৃত পরিমাণের কেবল অর্ধেক বা ৫০ শতাংশ কার্গো সরবরাহ করতে পারবে।
২০২৬ সালের বার্ষিক সরবরাহ পরিকল্পনা অনুযায়ী, বাংলাদেশের ১১৫ কার্গো এলএনজি আমদানির পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে কাতার-এনার্জির দেওয়ার কথা ছিল ৪০ কার্গো বা মোট আমদানির ৩৪.৮ শতাংশ।
এ ছাড়া ওমানের ওকিউটি-র ১৬ কার্গো, কাতার-এনার্জি ট্রেডিংয়ের ১২ কার্গো, ওকিউ ট্রেডিং এলএলসির ৪ কার্গো এবং মার্কিন প্রতিষ্ঠান এক্সেলারেট গ্যাস মার্কেটিং-এর ১৪ কার্গো সরবরাহ করার কথা ছিল। বাকি অংশের মধ্যে ১২ কার্গো স্বল্পমেয়াদি চুক্তি থেকে এবং ১৭ কার্গো খোলা বাজার (স্পট মার্কেট) থেকে কেনার পরিকল্পনা ছিল।
এর পাশাপাশি ২০২৮ সালে ওমানের সাথে প্রথম দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির মেয়াদ শেষ হচ্ছে। ফলে আগাম বিকল্প ব্যবস্থা নিশ্চিত করার তাগিদ তৈরি হয়েছে।
বছরের শুরুতে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের কারণে পারস্য উপসাগরের এলএনজি রপ্তানি ব্যাহত হয়। ২৮ ফেব্রুয়ারি সংঘাত তীব্র হওয়া এবং হরমুজ প্রণালীতে অচলাবস্থা তৈরির পর ২ মার্চ কাতার-এনার্জি ফোর্স মাজ্যুর (অপরিহার্য বা অনিয়ন্ত্রণযোগ্য কারণ দেখিয়ে চুক্তি স্থগিত করা) ঘোষণা করে। এরপর ৫ মার্চ ওমান এবং ৬ মার্চ যুক্তরাষ্ট্রের এক্সেলারেট এনার্জিও একই পথ অনুসরণ করে।
হরমুজ প্রণালি পরে খুলে দেওয়া হলেও, তবে মধ্যপ্রাচ্যে জ্বালানি অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া এবং পূর্ণ উৎপাদন সক্ষমতায় ফিরতে দেরি হওয়ার কারণে জ্বালানি বিভাগের কর্মকর্তারা মনে করছেন, বৈশ্বিক এলএনজি সংকট আরও ৩ থেকে ৫ বছর স্থায়ী হতে পারে।
এসব বিঘ্নের কারণে বাংলাদেশকে চড়া দামে খোলাবাজার বা স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কিনতে হয়েছে, যা স্বাভাবিকের চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি দাম বাড়িয়ে আমদানি ব্যয় বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন যে, রাস লাফান ইন্ডাস্ট্রিয়াল কমপ্লেক্সে হামলা ও বৈশ্বিক সরবরাহের অনিশ্চয়তার কারণে বর্তমান পরিস্থিতিতে বিক্রেতাদের কাছ থেকে বড় ছাড় আদায় করা বেশ কঠিন।
গানভর চুক্তির পাশাপাশি বাংলাদেশ এখন বিকল্প মাধ্যম হিসেবে প্রথাগত উৎসের বাইরে গিয়ে স্বল্পমেয়াদি এলএনজি সংগ্রহের চিন্তা করছে। সম্ভাব্য এসব উৎস দেশের মধ্যে রয়েছে অস্ট্রেলিয়া, ব্রুনাই, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, আজারবাইজান, কাজাখস্তান, অ্যাঙ্গোলা, নাইজেরিয়া ও আলজেরিয়া।
জ্বালানি বিভাগের কর্মকর্তারা ইঙ্গিত দিয়েছেন, অদূর ভবিষ্যতে দ্রুত অতিরিক্ত এলএনজি পাওয়ার ক্ষেত্রে ইন্দোনেশিয়া, নাইজেরিয়া ও আলজেরিয়া সবচেয়ে সম্ভাবনাময় বিকল্প হতে পারে।
