ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০ শিক্ষকের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা প্রত্যাহারের দাবি শিক্ষক সমিতির
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর বিভিন্ন সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০ জন শিক্ষকের বিরুদ্ধে যে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি। বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) রাতে শিক্ষক সমিতির সভাপতি মো. নিজামুল হক ভূঁইয়া ও সাধারণ সম্পাদক জিনাত হুদা স্বাক্ষরিত এক বিবৃতিতে এই দাবি জানানো হয়।
বিবৃতির বিষয়টি শুক্রবার (৩১ জুলাই) দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে নিশ্চিত করেছেন অধ্যাপক জিনাত হুদা।
বিবৃতিতে শিক্ষক সমিতি জানায়, গত ২৮ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেট কর্তৃক বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অধ্যাপককে স্থায়ী বহিষ্কার এবং ছয়জন শিক্ষককে একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম থেকে অব্যাহতি প্রদানের যে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে, সমিতি তার তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছে।
এতে বলা হয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান। এটি রাষ্ট্রযন্ত্রের কোনো নির্দেশনা অনুযায়ী নয়, বরং 'ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আদেশ, ১৯৭৩'-এর আইন অনুযায়ী পরিচালিত হয়। উল্লিখিত আইন অনুযায়ী, কোনো শিক্ষক, কর্মকর্তা বা কর্মচারীর অপরাধ অনুসন্ধান কমিটি ও ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক সম্পূর্ণভাবে প্রমাণিত হওয়ার আগে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তাদের কোনো শাস্তি প্রদানের ক্ষমতা রাখে না।
বিবৃতিতে আরও উল্লেখ করা হয়, ১৯৭৩-এর আইন অনুযায়ী তথ্যানুসন্ধান কমিটি, তদন্ত কমিটি এবং ট্রাইব্যুনাল গঠনের মাধ্যমে এসব শিক্ষককে আত্মপক্ষ সমর্থন, স্বীয় বক্তব্য প্রদান এবং অভিযোগ উত্থাপনকারীদের মুখোমুখি বা সরাসরি সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে বক্তব্য খণ্ডন করার বিন্দুমাত্র সুযোগ দেওয়া হয়নি। এটি পরিষ্কারভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন, দীর্ঘ ঐতিহ্য, মানবাধিকার এবং সমান অধিকার প্রাপ্তির চরম লঙ্ঘন।
বিবৃতিতে অভিযোগ করা হয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পূর্ববর্তী 'অনির্বাচিত' প্রশাসন মব সৃষ্টির মাধ্যমে একটি একপাক্ষিক নীতি অনুসরণ করেছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন ও বিধিমালা উপেক্ষা করে প্রায় ৭০-৮০ জন শিক্ষককে একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম থেকে বিরত রাখা হয়েছে এবং বিভিন্ন 'ট্যাগিং'-এর মাধ্যমে তাদের সামাজিকভাবে অসম্মানিত করার নীতি গ্রহণ করা হয়েছে, যা মূলত মানসিক ও অর্থনৈতিক নিপীড়নের নামান্তর।
শিক্ষক সমিতি দাবি করে, পূর্ববর্তী প্রশাসন নির্বাচিত সিনেট, সিন্ডিকেট ও শিক্ষক সমিতিকে অকার্যকর করার মাধ্যমে এ ধরনের আইনবহির্ভূত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিল। নির্বাচিত শিক্ষক প্রতিনিধিদের জোরপূর্বক বিরত রেখে একতরফাভাবে যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হচ্ছে, তা কখনোই সুবিচার নিশ্চিত করবে না। বর্তমান প্রশাসন দুই বছর আগে শাস্তিপ্রাপ্ত শিক্ষককে পুনরায় শাস্তি প্রদান করে শাস্তির মাত্রা দ্বিগুণ করেছে বলেও বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, বিশ্ববিদ্যালয় মূলত বিভিন্ন মত, পথ ও দর্শনের বৈচিত্র্য এবং সমন্বয়ে পরিচালিত জ্ঞানার্জনের প্রতিষ্ঠান। রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে অতীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রজ্ঞাবান ও জ্যেষ্ঠ শিক্ষকদের শাস্তি প্রদানের ঘটনা বিরল। কেবল মুক্তিযুদ্ধকালীন ১৯৭১ সালে জাতিগত নিধনের প্রক্রিয়া হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে মেধাশূন্য করার লক্ষ্যে নৃশংস বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছিল।
বিবৃতিতে বলা হয়, রাজনৈতিক পটপরিবর্তন একটি স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া। কিন্তু এর পরিপ্রেক্ষিতে ভিন্নমত দমন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংকোচনের নীতি এবং শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে শিক্ষকসমাজের মধ্যে যে আতঙ্ক, ভীতি ও অনিরাপত্তার সংস্কৃতি সৃষ্টি করা হলো, ভবিষ্যতের জন্য তা একটি অশুভ দৃষ্টান্ত হিসেবে থেকে যাবে।
উল্লেখ্য, বিএনপিপন্থী শিক্ষকদের সংগঠন সাদা দলের ভোট বর্জনের ফলে ২০২৪ সালের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির কার্যকর পরিষদের সব পদে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছিল আওয়ামীপন্থী শিক্ষকদের সংগঠন নীল দল। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর শিক্ষক সমিতির আর কোনো নতুন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি।
