প্রধানমন্ত্রী হলেন তারেক রহমান, ঐক্য ও স্থিতিশীলতার অঙ্গীকার
প্রবাসে দীর্ঘ নির্বাসন শেষে বিএনপি চেয়ারপারসন তারেক রহমান গতকাল বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেছেন। নির্বাচনের আগে বিভিন্ন সময়ে দেওয়া বক্তব্যের ধারাবাহিকতায় তিনি জাতীয় ঐক্য, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকারও পুনর্ব্যক্ত করেছেন।
বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে খোলা আকাশের নিচে প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার সদস্যদের শপথ পড়ান রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন আহমদ। ভারত, পাকিস্তান, চীনসহ দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত শপথ অনুষ্ঠানে এক অনন্য নজির স্থাপিত হয়।
হালকা বসন্তের বিকেলের বাতাসে অনুষ্ঠানস্থলে এক ধরনের প্রশান্ত আবহ তৈরি হলেও, নতুন প্রধানমন্ত্রী দায়িত্ব গ্রহণ করেন এমন এক সময়ে— যখন দেশ তীব্র অর্থনৈতিক সংকট, বিনিয়োগ স্থবিরতা ও বেকারত্বের চাপে জর্জরিত।
সংসদে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি সংখ্যাগরিষ্ঠতা এবং অভিজ্ঞ ও নবীন মুখের সমন্বয়ে ৪৯ সদস্যের মন্ত্রিসভা গঠন করলেও তারেক রহমানের সামনে পথ যে দুর্গম, তা-ও স্পষ্ট।
সংস্কার বাস্তবায়নের চাপের পাশাপাশি নির্বাচন পরবর্তী সহিংসতা নিয়ন্ত্রণ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা এবং জামায়াত–এনসিপির বিরোধী জোটের সঙ্গে টানাপোড়েন সামাল দেওয়া তার জন্য তাৎক্ষণিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইতোমধ্যে আগামী দিনের রাজপথ উত্তপ্ত রাখার ইঙ্গিত দিয়েছে বিরোধী এই জোট।
প্রধানমন্ত্রীর শপথের পর রাষ্ট্রপতি আলাদাভাবে ২৫ জন মন্ত্রী ও ২৪ জন প্রতিমন্ত্রীকে শপথ পাঠ করান। পরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জন্য ১০ জন উপদেষ্টা নিয়োগ দেওয়া হয়, যাদের মধ্যে পাঁচজন মন্ত্রীর মর্যাদা এবং বাকি পাঁচজন প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায় নিয়োগ পেয়েছেন।
শপথ বাক্য পাঠ করার পর নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁর গুলশানের বাসায় ফেরেন। পরে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে তিনি রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের জিয়া উদ্যানে তার পিতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার কবর জিয়ারত করেন।
আজ বুধবার দুপুর ৩টায় সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী নতুন মন্ত্রিসভার বৈঠক করবেন বলে টিবিএসকে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। এছাড়া সচিবদের সঙ্গেও সৌজন্য বৈঠক হতে পারে বলে জানিয়েছেন মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের কর্মকর্তারা।
প্রধানমন্ত্রী এবং মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের শপথ অনুষ্ঠানের আগে গতকাল সকালে ও দুপুরে কয়েক খণ্ডে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল থেকে নির্বাচিত ও স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যদের শপথবাক্য পাঠ করার প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন। বিএনপি দলীয় এমপিদের শপথ গ্রহণের পর বিএনপির সংসদীয় দলের বৈঠক হয়, সেখানে তারেক রহমানকে সংসদীয় দলের নেতা নির্বাচন করেন বিএনপির আইনপ্রণেতারা।
তবে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে বিএনপি এমপিরা শপথ না নেওয়ায় জামায়াত ও এনসিপি—যারা এখন বিরোধী দলে—মন্ত্রিসভার শপথ অনুষ্ঠান বর্জন করে এবং রাজনৈতিক আন্দোলনের ইঙ্গিত দেয়।
অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপ বাড়ছে
বিশ্লেষকরা বলছেন, নতুন সরকারকে শুরুতেই বহুবিধ অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপ মোকাবিলা করতে হবে। এ সরকারের প্রথম ১০০ দিনের মধ্যেই আগামী অর্থবছরের বাজেট ঘোষণা করতে হবে, যার দিকে তাকিয়ে থাকবে সরকারি-বেসরকারিখাতে কর্মরত কিংবা কর্মহীন সকল মানুষ ও বিনিয়োগকারীরা। নতুন সরকার শপথ নেওয়ার আগেই উত্তপ্ত হতে থাকা রমজানের বাজার স্থিতিশীল করার চ্যালেঞ্জিং কাজ প্রথম দিন থেকেই নিতে হবে তাদের।
এদিকে ফ্যামিলি কার্ড চালু, ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফ, সরকারি কর্মচারীদের নতুন বেতন কাঠামো, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি এবং এক কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টিসহ বিএনপির নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নেও বাজেট থেকে সরাসরি বিপুল অর্থ ব্যয় প্রয়োজন হবে।
কিন্তু বিপুল ঋণের ভার, সর্বনিম্ন কর-জিডিপি অনুপাত, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দুর্বল ব্যাংকিংখাতসহ পাহাড়সমান চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে হলে, জনগণ ও ব্যবসায়ীদের উপর করের বোঝা না চাপিয়ে বাড়তি রাজস্ব আহরণের পথ খুঁজে বের করা হবে—তারেক রহমান ও নতুন অর্থমন্ত্রী আমির খসরুর জন্য অন্যতম চ্যালেঞ্জ।
এছাড়া, দীর্ঘদিন ধরে আস্থাহীনতায় ভুগতে থাকা বেসরকারিখাতকে বিনিয়োগে ফেরানোর মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা, জ্বালানি সংকট দূর করাসহ, দেশের প্রধান বন্দরে জট কমানো এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ ফিরিয়ে আনাও জরুরি অগ্রাধিকার হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
শপথ গ্রহণের পর নতুন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী টিবিএসকে বলেন, তাদের সরকার ডি-রেগুলেশন (নিয়ন্ত্রণ শিথিলকরণ), আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমানো ও ব্যাংক ঋণের সুদের হার কমানোর মাধ্যমে ব্যবসার খরচ কমিয়ে বিনিয়োগ পরিবেশ নিশ্চিত করবে। এর মধ্য দিয়ে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
তারেক রহমান তাঁর বক্তব্যে বিভেদ ঘুচিয়ে জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের ওপর জোর দিয়েছেন। শপথ গ্রহণের আগে জামায়াত আমির ড. শফিকুর রহমান, এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম ও ইসলামী আন্দোলনের আমির মুফতি সৈয়দ মো. রেজাউল করিমের বাসায় গিয়ে সাক্ষাৎ করায়—তাঁর রাজনৈতিক দর্শন নিয়ে এক ধরণের আশাবাদ তৈরি করে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক আলতাফ পারভেজ বলেন, ''সংস্কার না করতে পারলে মানুষ ক্ষেপে যাবে, এটাই বড় চ্যালেঞ্জ। একইসঙ্গে জামায়াতের মতো রাজপথে শক্তিশালী অবস্থান নেওয়ার সক্ষমতাসম্পন্ন একটি বিরোধীদলকে শান্ত রাখাও তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।''
অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন টিবিএসকে বলেন, বিএনপি অনেক প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, যার কিছু অবশ্যই প্রথম বাজেটেই অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। "সামাজিক সুরক্ষায় বিএনপির যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, সেগুলো পূরণ করতে না পারলে জনহতাশা তৈরি হবে।"
গবেষণা সংস্থা–সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) এর নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন টিবিএসকে বলেন, নতুন সরকারের সামনে চ্যালেঞ্জ অনেক, কিন্তু সরকারের অর্থনৈতিক সক্ষমতা খুবই খারাপ। বিএনপি সরকারের প্রতি জনগণের উচ্চ প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, যা পূরণ করা খুবই কঠিন।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের সাবেক সিনিয়র সচিব মাহবুব আহমেদ বলেন, "বিএনপি আগামী পাঁচ বছরে ১ কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টির যে অঙ্গীকার করেছে, তা বাস্তবায়নে বেসরকারি ও বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে হবে। এজন্য বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরি করতে হবে।"
সিপিডির অতিরিক্ত পরিচালক (গবেষণা) তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, "নতুন সরকারকে দায়িত্ব নিয়ে শুরুতেই সংশোধিত বাজেট পুনর্মূল্যায়ন করতে হবে, যাতে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রক্ষেপণগুলো বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়। একইসঙ্গে তাদের নির্বাচনী ইশতিহার পূরণে নতুন বাজেট প্রণয়নে বাস্তবসম্মত কর্মপরিকল্পনা নিতে হবে। তা না হলে প্রথম বাজেট দেখেই মানুষের মধ্যে হতাশা চলে আসবে।"
সাবেক কূটনীতিক হুমায়ুন কবির বলেন, "বিএনপির ইশতেহারে যে সমন্বিত অর্থনৈতিক কূটনীতির কথা বলা হয়েছে, তা বাস্তবায়নে পররাষ্ট্র, বাণিজ্য ও অর্থ মন্ত্রণালয় এবং এনবিআর ও বিডার মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় জরুরি।
