ভোটের গাড়ির 'জনমত বাক্সে' জমা পড়ল ৪০ হাজার চিরকুট: কেউ চান বিচার, কেউ বাজার নিয়ন্ত্রণ
কেউ ব্যক্তিগত দুঃখের কথা। কেউ চেয়েছেন সব পাবলিক সার্ভিস হয়রানিমুক্ত হোক। কেউ রাষ্ট্রযন্ত্রের সংস্কার চেয়েছেন, আবার কেউ জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবি করেছেন। এসব টুকরো কাগজে উঠে এসেছে নারী-পুরুষের সমতা, শিশুর জন্য নিরাপদ পরিবেশ, মানসম্মত শিক্ষা ব্যবস্থা এবং দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশের আকাঙ্ক্ষা। আবার কোথাও আছে তীব্র ক্ষোভ ও সরকারের কঠোর সমালোচনা।
"দেশের চাবি, আপনার হাতে"—গণভোট ২০২৬ ও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে সচেতনতামূলক প্রচারণার অংশ হিসেবে চালু করা ভোটের গাড়ির 'জনমত বাক্সে' এখন পর্যন্ত ৪০ হাজার ২০৬ জন তাদের মন্তব্য জমা দিয়েছেন। আজ (১০ ফেব্রুয়ারি) প্রধান উপদেষ্টার ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজ থেকে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়।
বিভাগভিত্তিক চিত্র
জনমত বাক্সে জমা পড়া কাগজগুলো পড়লে বোঝা যায়, মানুষ শুধু ভোট দিতে চায় না, তারা কথা বলতে চায়। সবচেয়ে বেশি মন্তব্য এসেছে ঢাকা বিভাগ থেকে—১০ হাজার ২১৬টি। রাজধানীর কোলাহল, সেবাপ্রাপ্তির হয়রানি আর ভোটের দিনের উৎকণ্ঠা উঠে এসেছে এসব মন্তব্যে।
চট্টগ্রামের ৬ হাজার ৬টি মন্তব্যে শ্রমজীবী মানুষের সময়ের হিসাব ও ভোটের দিনে ছুটির আকুতি রয়েছে। রাজশাহীর ৫ হাজার ৭৩৮টি মন্তব্যে উঠে এসেছে শিক্ষা ও বঞ্চনার কথা। খুলনার ৪ হাজার ৬৭৮টি মন্তব্যে জীবনযাত্রার ব্যয় ও বাজারের লাগামহীনতার কথা বলা হয়েছে। রংপুরের ৩ হাজার ৬০৫টি লেখায় আছে দারিদ্র্য ও সম্ভাবনার কথা। এছাড়া বরিশাল, ময়মনসিংহ ও সিলেট থেকেও হাজার হাজার মন্তব্য এসেছে।
ভোটের গাড়িটি দেশের ইউনিয়ন, উপজেলা ও জেলা সদর ছাড়িয়ে প্রায় ২ হাজার ১৬৯টি স্থানে গিয়ে মানুষের মতামত নিয়েছে। হাওর, চর, পাহাড় ও দুর্গম জনপদের মানুষ নিজের হাতে ও নিজের ভাষায় রাষ্ট্রের কাছে কথা বলার সুযোগ পেয়েছেন।
মানুষের বিচিত্র ভাবনা
গাজীপুরের ১০ বছর বয়সী রাফা লিখেছে, "আমার পরামর্শ হলো আমি এ দেশের মাটি ও বাতাসের মাঝে নিরাপদভাবে বেঁচে থাকার পরিবেশ ভবিষ্যৎ বাংলাদেশে দেখতে চাই। এরকম একটা ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ গড়তে নীতি-নির্ধারক তৈরি করার নির্বাচন অনুষ্ঠিত করুন।"
কুমিল্লার দেওয়ান সালাহউদ্দিন ভোটাধিকার নিয়ে লিখেছেন, "মানুষ চায় সুষ্ঠু ভোট দিতে কেন্দ্রে যেতে পারে। কেন্দ্রে দাঙ্গা-হাঙ্গামা করা যাবে না। আমার ভোট আমি দিবো যাকে খুশি তাকে দিবো।"
চট্টগ্রামের গোলাম রাব্বানি প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকরি করেন। তিনি লিখেছেন, "আমি প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকরি করি। আমাকে ভোট দেওয়ার জন্য কোম্পানির মালিককে সুযোগ করে দেওয়ার জন্য বিশেষ অনুরোধ জানাচ্ছি।"
ঠাকুরগাঁও থেকে একজন দিনমজুর লিখেছেন, "গরিব মানুষ দিন মজুর করে খাই। গরুর মাংস আমরা কিনে খেতে পারি না। বাজার নিয়ন্ত্রণ চায়, সিন্ডিকেট চলতেছে বাজারে।"
শিক্ষার ভিত্তি নিয়ে বরিশালের সাদিক লিখেছেন, "যে দেশে শিক্ষকদের মান উন্নয়ন নিয়ে কেউ ভাবে না, সে দেশে সুন্দর আদর্শ রাষ্ট্র গঠন করা সম্ভব না।"
পিরোজপুরের বিপুল কুমার সংখ্যালঘু নিরাপত্তা ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দাবি জানিয়ে লিখেছেন, "হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান একসাথে বাঁচতে চাই। সংখ্যালঘু নিরাপত্তা চাই।"
দিনাজপুরের লিজা, বিপাশা, সুমি, লিনা ও বৃষ্টি জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের স্মৃতি ধরে রেখে সংস্কারের আহ্বান জানিয়ে লিখেছেন, "নারী ও শিশুদের অধিকার, ধর্ষণের ১০ দিনের মধ্যে রায় কার্যকর হোক।"
জনগণের এমন অকৃত্রিম ভালোবাসা, প্রত্যাশা, এমনকি সমালোচনাও রাষ্ট্রের জন্য অমূল্য সম্পদ বলে মন্তব্য করে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস।
