নির্বাচন পরবর্তী শতাধিক সহিংসতা; যশোরে তিন দিনে আহত দেড় শতাধিক
দু-একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনার মধ্যে দিয়ে যশোরে উৎসবমুখর পরিবেশে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট সম্পন্ন হলেও—নির্বাচন পরবর্তী সহিংসতায় রাজনৈতিক পরিস্থিতি ক্রমেই সহিংস হয়ে উঠছে। গত তিন দিনে জেলায় শতাধিক হামলা, পাল্টা হামলার ঘটনা ঘটেছে। এতে জামায়াত ও বিএনপির দেড় শতাধিক নেতাকর্মী আহত হয়েছেন।
পুলিশ বলছে, সহিংসতার ঘটনাগুলোতে মূলত বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর কর্মী-সমর্থকদের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। এসব ঘটনার বেশিরভাগই ঘটেছে গ্রামাঞ্চলে। মূলত জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে স্থানীয় রাজনীতির জয়-পরাজয়ের বিভেদের দ্বন্দ্বেই এসব হামলা বলছেন ভুক্তভোগীরা। এর মধ্যে দুটি ঘটনায় পাঁচজনকে বহিস্কার করেছে বিএনপি।
জেলা জামায়াতের আমির ও যশোর-৪ আসনের সংসদ সদস্য অধ্যাপক গোলাম রসুল বলেন, 'ব্যালট বিপ্লবে যশোরের ছয়টি আসনের ৫টিতে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের পাঁচজন প্রার্থী বিপুল ভোটে জয়লাভ করেছে। ভোটের ফলাফল প্রকাশের পর দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের ভোটার কর্মী ও নেতাকর্মীদের ওপর হামলা করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে অর্ধশতাধিক ঘটনা ঘটেছে। এতে ৬০ জনের মতো আহত হয়েছে। প্রতিদিনই জেলায় কোথাও না কোথাও আমাদের নেতাকর্মীদের ওপর বিএনপি কর্মী-সমর্থকদের হামলা হচ্ছে।'
নির্বাচন পরবর্তীতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা সন্তোষজনক নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, 'আমরা প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানাব, জাতির এই ক্রান্তিকালে দেশের পরিবেশ শান্ত রাখার জন্য আরও শক্ত অবস্থান নিতে।'
এদিক যশোর জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন খোকন পাল্টা অভিযোগ করে বলেন, 'জামায়াতের লোকজন বিএনপির নেতাকর্মীদের ওপর হামলা করছে। পুলিশ প্রশাসনকে ব্যবহার করে আমাদের কর্মীদের মিথ্যা মামলা দিয়ে আটক করছে। তাদের কর্মীরা প্রায় ২৫টি জায়গায় হামলা করেছে। এতে বিএনপির অর্ধশতাধিক নেতাকর্মী আহত হয়েছেন।'
তিনি বলেন, 'আমরা রাজনৈতিক প্রতিহিংসায় বিশ্বাসী না। তবে কেউ কেউ প্রতিহিংসা দেখাতে গিয়ে দলীয় বিশৃঙ্খলা করেছে। এমন পাঁচজনকে বহিস্কার করা হয়েছে।'
সংশ্লিষ্ট হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, শনিবার রাতে যশোরের চৌগাছার পাশাপোল জামতলাতে স্থানীয় জামায়াত অফিসে আড্ডা দিচ্ছিলেন ইউনিয়ন যুব জামায়াত সভাপতি আব্দুল্লাহ আল মাসুদ। এসময় স্থানীয় বিএনপি কর্মী নিছার মেম্বারের নেতৃত্বে পাঁচ থেকে সাতজন হামলা চালালে মাসুদ-সহ আহত হন চারজন। পরে স্থানীয়রা উদ্ধার করে তাদের চৌগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করেন।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, জামায়াতের প্রার্থীর পক্ষে এলাকায় কাজ করাতে অভিযুক্তরা তাদের ওপর হামলা করেছে।
চৌগাছা উপজেলা ফুলসারা ইউনিয়নের দুর্গাপুর গ্রামের আবেদ আলীর বাড়িতে রামদা, লোহার রড, বাঁশের লাঠিসহ ধারালো অস্ত্র নিয়ে আক্রমণ করা হয়েছে। অভিযোগ বাড়ির জানালার কাঁচ ভাঙচুর করেছেন এলাকার মেহের আলী, রবিউল ইসলাম, ইমামুল, আল আমিন, হোসেন আলী, বাবু, রাজ্জাক, মুনতাজসহ অজ্ঞাত আরো অনেকে।
ফুলসারা ইউনিয়নের দুর্গাবরকাটি গ্রামের সাবেক মেম্বর তোফাজ্জেল এর বাড়িঘরও ভাংচুর করা হয়েছে। তাঁর মেয়েকে বেধড়ক পেটানো হয়েছে। এমনকী শ্লীলতাহানির অভিযোগ উঠেছে। এই ঘটনার পর মেয়েটি আত্মহত্যার চেষ্টা করেছে হাসপাতালে ভর্তি আহতদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে।
শার্শার বেলতা গ্রামে নির্বাচনী কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার কারণে জামায়াতের নেতাকর্মীদের ওপর হামলা করছে বিএনপির নেতাকর্মীরা। বিএনপির স্থানীয় নেতা মৃত অমর বিশ্বাসের দুই ছেলে মিলন বিশ্বাস (৬৫) ও তরিকুল বিশ্বাস (৫৫)-এর নেতৃত্বে একটি দল অতর্কিত হামলা চালায়। হামলাকারীরা লাঠিসোঁটা নিয়ে জামায়াত কর্মীদের ওপর চড়াও হয়। এতে কয়েকজন আহত হন। এলাকায় চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
শার্শা উপজেলার লক্ষ্মণপুর ইউনিয়নে বিএনপির নেতা আহসান হাবীব খোকন ও আরমানের নেতৃত্বে দফায় দফায় হামলার অভিযোগও উঠেছে। এসব হামলার মাধ্যমে পরিকল্পিতভাবে এলাকায় ভয়ভীতি ও অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হচ্ছে।
অন্যদিকে যশোরের চৌগাছার ফুলসারা ইউনিয়নের চারাবাড়ি বাজারে জামায়াত-শিবিরের কর্মীদের ছুরিকাঘাতে মোহাম্মদ বাবু নামে এক বিএনপি নেতা আহত হয়েছেন। শনিবার গুরুতর অবস্থায় তাকে যশোর জেনারেল হাসপাতলে ভর্তি করা হয়েছে। আহত বাবু (৪৫) ফুলসারা ইউনিয়নের ৩নং নম্বর ওয়ার্ড বিএনপি'র সাধারণ সম্পাদক।
ফুলসারা ইউনিয়ন বিএনপির কৃষক দলের সভাপতি তরিকুল ইসলাম জানান, "নির্বাচনে মোহাম্মদ বাবু ছিলেন ধানের শীষের পক্ষের কর্মী। রায়নগর প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রে মোট ভোট ১,৭৬৭। এর ভিতর ধানের শীষ প্রতীক পেয়েছে ৬৭১টি। দাঁড়িপাল্লা প্রতীক পেয়েছে ৫৬১ ভোট। বাকি ভোট পেয়েছে অন্যরা। এই কেন্দ্রে দাঁড়িপাল্লা পাস করতে না পারায় জামায়াত-শিবিরকর্মীরা ক্ষিপ্ত হয়ে তার ওপর হামলা চালায়।'
যশোরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) আবুল বাশার বলেন, 'বিভিন্ন জায়গা থেকে বিক্ষিপ্তভাবে হামলার খবর পাওয়া যাচ্ছে। যেখান থেকেই তাঁরা সংবাদ পাচ্ছেন—তাৎক্ষণিক পুলিশ পাঠাচ্ছেন। ঘটনার বিষয়ে থানায় কোনো অভিযাগ করা হচ্ছে না। অভিযোগ পেলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।'
