বিএনপির দক্ষিণাঞ্চলের ‘দুর্গ’ পুনরুদ্ধার; ২১ আসনের ১৬টিতেই সরাসরি জয়
বড় কোন সংঘাত-সহিংসতা ছাড়া দিনভর শান্তিপূর্ণ ভোটগ্রহণ শেষে বরিশাল বিভাগের ২১টি সংসদীয় আসনের ফলাফল ঘোষণা হয়।
এই অঞ্চলে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে বিএনপি। ২১ আসনের মধ্যে ১৬টিতে সরাসরি বিএনপির প্রার্থীরা, দুটিতে জোটের প্রার্থী বিজীয় হয়েছেন। পরাজিত হয়েছে মাত্র তিনটি আসনে।
দলের নেতারা বলছেন, বরিশাল বিএনপির দুর্গ পুনরুদ্ধার করতে পেরেছে। এবার দল ঐক্যবদ্ধভাবে আঞ্চলিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে বলে উল্লেখ করেন বিএনপির বরিশাল বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক বিলকিস জাহান শিরিন।
তিনি বলেন, 'চেয়ারম্যানকে কথা দিয়েছিলাম, আমরা বরিশাল বিভাগের আসন বিএনপিকে উপহার দেব। নেতাকর্মীদের নিরলস প্রচেষ্টায় আমরা অভূতপূর্ব জয় পেয়েছি। বিএনপির সংসদ সদস্যরা তাদের প্রতিশ্রুতি ও এলাকার উন্নয়নে কাজ অব্যাহত রাখবেন।'
বরিশাল ৩ (বাবুগঞ্জ-মুলাদী) আসনের বিজয়ী জয়নুল আবেদিন বলেন, জনগণের মনে বিএনপিকে নিয়ে আশার সঞ্চার হয়েছে।
'তারা ভরসা রেখে ভোট দিয়ে আমাদের জয়যুক্ত করেছেন। আমরা ভাগ্যবান জনগণের এত ভালোবাসা পাওয়ায়। এখন একমাত্র কাজ হবে জনসেবা করা,' বলেন তিনি।
আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তার কার্যালয়ের তথ্যমতে, বরিশাল জেলার ছয় আসনের সবগুলোতে বিপুল ভোটে জয়ী হয়েছেন বিএনপির প্রার্থীরা।
এরমধ্যে বরিশাল ১ (গৌরনদী-আগৈলঝাড়া) আসনে বিএনপির প্রার্থী জহির উদ্দিন স্বপন ১ লাখ ৫৫২ ভোট পেয়ে জিতেছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী কামরুল ইসলাম খান দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে পেয়েছেন ৪৬ হাজার ২৬৩ ভোট। এই আসনে গণভোটে 'হ্যাঁ' পড়েছে ১ লাখ ১২ হাজার ২০৮টি। 'না' ভোট পড়েছে ৭৩ হাজার ২৮৯টি।
বরিশাল-২ (উজিরপুর-বানারীপাড়া) আসনে ধানের শীষ প্রতীকে সরদার সরফুদ্দিন আহমেদ ১ লাখ ৪১ হাজার ৬২২ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী আব্দুল মান্নান দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে পেয়েছেন ৭৪ হাজার ৮২ ভোট। এই আসনে 'হ্যাঁ' ভোট পড়েছে ১ লাখ ৩৪ হাজার ২৭৮ টি। না ভোট পড়েছে ৮০ হাজার ৯৬৬টি।
বরিশাল-৩ (মুলাদী-বাবুগঞ্জ) আসনে ধানের শীষ প্রতীকে অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন ৮০ হাজার ৯৩০ ভোট পেয়ে জিতেছেন। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ১১-দলীয় জোট সমর্থিত এবি পার্টির আসাদুজ্জামান ভূইয়া ঈগল প্রতীকে পেয়েছেন ৬১ হাজার ১৯২ ভোট। এই আসনে 'হ্যাঁ' ভোট পড়েছে ১ লাখ ২২ হাজার ৩০৫টি। 'না' ভোট ৪০ হাজার ৬৬৩টি।
বরিশাল-৪ (হিজলা-মেহেন্দীগঞ্জ) আসনে ধানের শীষ প্রতীকে ১ লাখ ২৮ হাজার ৩২২ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন রাজিব আহসান। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের আব্দুল জব্বার পেয়েছেন ৭৪ হাজার ৬৮৪ ভোট। এই আসনে 'হ্যাঁ' ভোট পড়েছে ১ লাখ ৪৩ হাজার ৯০০টি। 'না' ভোট পড়েছে ৬৪ হাজার ৫১১টি।
বরিশাল-৫ (সদর উপজেলা) আসনে ১ লাখ ৩৫ হাজার ১৪৬ ভোট পেয়ে বিজীয় হয়েছেন বিএনপির মজিবুর রহমান সরোয়ার। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের হাতপাখা প্রতীকের মুফতি সৈয়দ মুহাম্মাদ ফয়জুল করীম পেয়েছেন ৯৫ হাজার ৪৪ ভোট। এই আসনে 'হ্যাঁ' ভোট পড়েছে ১ লাখ ৭৬ হাজার ৬৮৭টি। 'না' ভোট পড়েছে ৬৯ হাজার ৩৮৪টি।
বরিশাল-৬ (বাকেরগঞ্জ) আসনে ধানের শীষ প্রতীকে ৮২ হাজার ২১৭ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন আবুল হোসেন খান। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী পেয়েছেন দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে মাহমুদুন্নবী তালুকদার ৫৫ হাজার ৯৮৮ ভোট। এই আসনে 'হ্যাঁ' ভোট পড়েছে ১ লাখ ১৫ হাজার ৭৪টি, 'না' ভোট পড়েছে ৪১ হাজার ৭০০টি।
বরগুনা জেলার দুটি আসনের মধ্যে একটিতে জয় পেয়েছে বিএনপি, অপরটিতে ইসলামী আন্দোলন। এর মাধ্যমে দেশের ইতিহাসে এই প্রথম ইসলামী আন্দোলন কোনো সংসদ সদস্য পেলো। রিটার্নিং কর্মকর্তা ও বরগুনা জেলা প্রশাসক তাছলিমা আক্তার জানান, বরগুনা-১ (সদর-আমতলী-তালতলী) আসনে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মনোনীত প্রার্থী মাহমুদুল হোসাইন অলিউল্লাহ হাতপাখা প্রতীক নিয়ে ১ লাখ ৪০ হাজার ২৯১ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি মনোনীত প্রার্থী নজরুল ইসলাম মোল্লা পেয়েছেন ১ লাখ ৩৬ হাজার ১৪৫ ভোট। এই আসনে 'হ্যাঁ' ভোট পড়েছে ১ লাখ ৭৬ হাজার ১৯৭টি এবং 'না' ভোট পড়েছে ৮৫ হাজার ৪২০টি।
বরগুনা-২ (বামনা-বেতাগী- পাথরঘাটা) আসনে ধানের শীষ প্রতীকে নুরুল ইসলাম মনি ৯০ হাজার ৬৪৩ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর সুলতান আহমদ পেয়েছেন ৮৫ হাজার ২৪৭ ভোট। এই আসনে 'হ্যাঁ' ভোট পেয়েছে ১ লাখ ২০ হাজার ৯৯৭টি এবং 'না' ভোট পড়েছে ৫৭ হাজার ৪৭৪টি।
পটয়াখালীর চার আসনের দুটিতে জয় পেয়েছে বিএনপি। একটিতে বিএনপি সমর্থিত জোট, আরেকটিতে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী জয়ী হয়েছেন।
রিটার্নিং কর্মকর্তা ও পটুয়াখালী জেলা প্রশাসক মো. শহিদ হোসেন চৌধুরী জানান, পটুয়াখালী-১ (মির্জাগঞ্জ-দুমকি-সদর) আসনে ধানের শীষের প্রার্থী আলতাফ হোসেন চৌধুরী ১ লাখ ৫২ হাজার ৮৭ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী মো. ফিরোজ আলম হাতপাখা প্রতীক নিয়ে পেয়েছেন ৫৮ হাজার ১৬১ ভোট। এই আসনে গণভোটে 'হ্যাঁ' ভোট পড়েছে ১ লাখ ৫৩ হাজার ৯২টি এবং 'না' ভোট পড়েছে ৮৯ হাজার ২৬৮টি।
পটুয়াখালী-২ (বাউফল উপজেলা) আসনে দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে শফিকুল ইসলাম মাসুদ ১ লাখ ৭৫০ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি প্রার্থী সহিদুল আলম তালুকদার পেয়েছেন ৭২ হাজার ৬৭৬ ভোট। এ আসনে গণভোটে 'হ্যাঁ' ভোট পড়েছে ১ লাখ ১৩ হাজার ১০০টি এবং 'না' ভোট এসেছে ৬১ হাজার ৫টি।
পটুয়াখালী-৩ ( দশমিনা-গলাচিপা) আসনে বিএনপি সমর্থিত গণঅধিকার পরিষদের প্রার্থী নুরুল হক নুর ৯৭ হাজার ৩২৩ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. হাসান মামুন পেয়েছেন ৮১ হাজার ৩৬১ ভোট। এ আসনে গণভোটে 'হ্যাঁ' পড়েছে ১ লাখ ৩১ হাজার ১১৪টি এবং 'না' ভোট পড়েছে ৭৬ হাজার ৫৫৪টি।
পটুয়াখালী-৪ ( রাঙ্গাবালী-কলাপাড়া) আসনে বিএনপি প্রার্থী এবিএম মোশাররফ হোসেন ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে ১ লাখ ১৪ হাজার ১৩ ভোট পেয়ে জয়লাভ করেছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী মোস্তাফিজুর রহমান পেয়েছেন ৭০ হাজার ১২৭ ভোট। এ আসনে গণভোটে 'হ্যাঁ' এসেছে ১ লাখ ২৫ হাজার ৪৫৮টি এবং 'না' ভোট পড়েছে ৬১ হাজার ৮৮৯টি।
ঝালকাঠির দুটি আসনেই জয় ধরে রেখেছে বিএনপি। ঝালকাঠি-১ (রাজাপুর-কাঁঠালিয়া) আসনে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে বিএনপি প্রার্থী রফিকুল ইসলাম জামাল পেয়েছেন ৬২ হাজার ১০ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ফয়জুল হক পেয়েছেন ৫৫ হাজার ১২০ ভোট। এ আসনে গণভোটে 'হ্যাঁ' ভোট পড়েছে ৯১ হাজার ২৮৬টি এবং 'না' ভোট ২৯ হাজার ৫৯১টি।
ঝালকাঠি-২ (সদর-নলছিটি) আসনে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে বিএনপি প্রার্থী ইসরাত সুলতানা ইলেন ভূট্টো পেয়েছেন ১ লাখ ১৩ হাজার ১০০ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী শেখ নেয়ামুল করিম দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে পেয়েছেন ৬৯ হাজার ৮০৫ ভোট।এ আসনে গণভোটে 'হ্যাঁ' ভোট পড়েছে ১ লাখ ৪৭ হাজার ২৯৭টি এবং 'না' ভোট ৫৩ হাজার ৮৯০টি।
পিরোজপুর জেলার তিনটি আসনের মধ্যে দুটিতে জয় পেয়েছে বিএনপি। একটিতে জয় পেয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী। প্রয়াত দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বড় ছেলে শামীম সাঈদী বিএনপি প্রার্থীর কাছে হেরে গেছেন।
জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তার দেওয়া তথ্য বলছে, পিরোজপুর-১ (সদর-ইন্দুরকানি) আসনে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ছোট ছেলে মাসুদ সাঈদী দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে ১ লাখ ৩২ হাজার ৬৫৯ ভোট পেয়ে জয় পেয়ে জিতেছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ধানের শীষের প্রার্থী আলমগীর হোসেন পেয়েছেন ১ লাখ ৭ হাজার ১০৫ ভোট।
পিরোজপুর-২ ( কাউখালী-ভান্ডারিয়া) আসনে বিএনপির প্রার্থী আহম্মদ সোহেল মনজুর ১ লাখ ৫ হাজার ১৮৫ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী শামীম সাঈদী পেয়েছেন ৯৬ হাজার ৮৯৭ ভোট।
পিরোজপুর-৩ (মঠবাড়িয়া) আসনে রুহুল আমীন দুলাল ধানের শীষ প্রতীকে ৬৩ হাজার ৭৯১ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী শাপলা কলি প্রতীকে এনসিপির মো. শামীম হামিদী পেয়েছেন ৩৬ হাজার ৬১৬ ভোট।
ভোলার চারটি আসনের মধ্যে তিনটিতে জয় পেয়েছে বিএনপি, একটিতে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী। এরমধ্যে ভোলা-১ (সদর) আসনে বিএনপি জোটের মনোনীত প্রার্থী আন্দালিব রহমান পার্থ ১ লাখ ৪ হাজার ৪৬২ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েচ্ছেন। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে নজরুল ইসলাম পেয়েছেন ৭৩ হাজার ৭৭৩ ভোট।
ভোলা-২ (দৌলতখান-বোরহানউদ্দিন) আসনে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে ১ লাখ ২১ হাজার ৫ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন আলহাজ্ব হাফিজ ইব্রাহিম। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের মুফতি ফজলুল করিম পেয়েছেন ৯৩ লাখ ৪৯৮ ভোট।
ভোলা-৩ (লালমোহন-তজুমদ্দিন) আসনে আসনে ধানের শীষ প্রতীকের মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ ১ লাখ ৫১ হাজার ৭৭৪ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ফুলকপি প্রতীকের নিজামুল হক নাঈম পেয়েছেন ৫৫ হাজার ৬৬০ ভোট।
ভোলা-৪ (চরফ্যাশন-মনপুরা) আসনে ধানের শীষ প্রতীকের মোহাম্মদ নুরুল ইসলাম নয়ন পেয়েছেন ১ লাখ ৯০ হাজার ৫ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের মো. মোস্তফা কামাল পেয়েছেন ৮২ হাজার ৩৯৮ ভোট।
বরিশাল আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা ফরিদুল ইসলাম বলেন, 'বরিশাল বিভাগে অত্যন্ত শান্তিপূর্ণভাবে নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে। ১২ ফেব্রুয়ারির ভোট ঐতিহাসিক ঘটনা। এত সুষ্ঠুভাবে আগে কখনো ভোট হয়েছে কি না জানা নেই।'
তিনি আরও বলেন, 'প্রার্থীরা ভোট নিয়ে কোনো আপত্তি করেননি। এভাবে ভোটের সংস্কৃতি অব্যাহত থাকবে বলে আমি মনে করি।'
