নেতৃত্ব দিতে প্রস্তুত? ভোটযুদ্ধে অংশ নিয়ে সংসদের দরজায় কড়া জেন-জি’র ২৫ প্রার্থীর
জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে অনেকেই 'জেনারেশন জেড বিপ্লব' হিসেবে আখ্যায়িত করছেন। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর জাতীয় রাজনীতিতে তরুণদের সক্রিয় অংশগ্রহণ বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে। এর প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও।
নির্বাচন কমিশনের চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা অনুযায়ী, এবারের নির্বাচনে অন্তত দুই ডজন জেন–জি প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
১৯৯৭ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে জন্ম নেওয়া নাগরিকদের জেনারেশন জেড বা জেন–জি বলা হয়। বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের বিধি অনুযায়ী, সংসদ নির্বাচনে প্রার্থিতার ন্যূনতম বয়স ২৫ বছর। কমিশনে দাখিল করা চূড়ান্ত হলফনামা বিশ্লেষণে দেখা যায়, চূড়ান্ত প্রার্থীদের মধ্যে অন্তত ২৫ জনের বয়স ২৮ বছরের নিচে—অর্থাৎ তারা ১৯৯৭ সালের পর জন্মগ্রহণ করেছেন।
এর মধ্যে আটজন প্রার্থী রয়েছেন—গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে আত্মপ্রকাশ করা রাজনৈতিক দল–জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি)। এছাড়া গণঅধিকার পরিষদ, বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল, ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টিসহ একাধিক ছোট ও বিকল্প রাজনৈতিক দল থেকেও তরুণ প্রার্থীরা মাঠে নেমেছেন। এরমধ্যে অন্তত ৫ জন নারী প্রার্থীও রয়েছেন।
নির্বাচনে অংশ নেওয়া এসব তরুণ প্রার্থীরা বলছেন, পুরোনো ও বড় রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে গিয়ে তারা জনবল ও অর্থনৈতিক সক্ষমতায় পিছিয়ে রয়েছেন। অধিকাংশই ক্রাউড ফান্ডিং বা সাধারণ মানুষের সহায়তায় নির্বাচনী ব্যয় মেটাচ্ছেন। তবে বয়স ও রাজনৈতিক পটভূমির কারণে তরুণ ভোটারদের কাছ থেকে তারা তুলনামূলক বেশি সাড়া পাচ্ছেন বলে দাবি তাদের।
দলভিত্তিক হিসাবে এনসিপির আটজন, গণঅধিকার পরিষদের চারজন, ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশের তিনজন, বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল (মার্কসবাদী)-এর দুজন, বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দলের একজন এবং আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি), বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি), বিএনএফ, আম জনতার দল, বিএমজেপি ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস থেকে একজন করে জেন–জি প্রার্থী রয়েছেন।
এনসিপি জামায়াত জোটের সঙ্গে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে। দলটির আহ্বায়ক মো. নাহিদ ইসলাম (২৭) ঢাকা–১১ আসন থেকে নির্বাচন করছেন। একই দলে সদস্য সচিব আখতার হোসেন (২৮) রংপুর–৪ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। দলের দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আব্দুল্লাহ (২৭) কুমিল্লা–৪ আসন থেকে এবং উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম (২৭) পঞ্চগড়–১ আসন থেকে নির্বাচন করছেন।
এছাড়া এনসিপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক আবদুল হান্নান মাসউদ (২৬) নোয়াখালী-৬ আসন থেকে, যুগ্ম-আহ্বায়ক মোঃ মাহবুব আলম (২৮) লক্ষ্মীপুর-১ থেকে, যুগ্ম সদস্যসচিব এস এম সাইফ মোস্তাফিজ (২৮) সিরাজগঞ্জ-৬ আসন থেকে এবং দক্ষিণাঞ্চলের সংগঠক আব্দুর রহমান (২৭) শরীয়তপুর-১ থেকে মনোনয়ন নিয়েছেন। মনোনয়ন প্রত্যাহার করতে না পারলেও আব্দুর রহমান জোটের স্বার্থে পরবর্তীতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন।
গণঅধিকার পরিষদ থেকে মনোনয়ন নিয়ে কুড়িগ্রাম-১ আসনে নির্বাচন করছেন ২৮ বছর বয়সী মো. বিন ইয়ামীন মোল্লা। তিনি এর আগে ছাত্র অধিকার পরিষদের সভাপতি ছিলেন।
তিনি টিবিএসকে বলেন, "যেহেতু আমি অভ্যুত্থানের সামনের সাড়িতে ছিলাম, আমার এলাকার মানুষ আমাকে চেনেন। আমার ওপর হওয়া নির্যাতনের ঘটনাগুলোও তারা জানেন। তাই বাজারে বাজারে পথসভা করলে মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে এসে কথা শুনছেন। কুড়িগ্রাম বাংলাদেশের অন্যতম দরিদ্র জেলা। চরাঞ্চলসহ বহু এলাকায় রাস্তাঘাট, শিক্ষা ও চিকিৎসার মৌলিক অবকাঠামোর ঘাটতি রয়েছে। এসব সমস্যা নিয়ে কথা বললে মানুষ গভীর মনোযোগ দিয়ে শোনেন।''
তবে নির্বাচনী বাস্তবতা স্বীকার করে বিন ইয়ামীন বলেন, "এখানে বিএনপি, দাড়িপাল্লা ও হাতপাখার প্রার্থীদের মতো দীর্ঘদিনের সংগঠন ও অর্থনৈতিক শক্তি আমার নেই। কোনো বড় ব্যবসায়ী বা রাজনৈতিক দল থেকে কেন্দ্রীয় ফান্ড পাইনি। মানুষের ভালোবাসায় পাওয়া সহযোগিতাই আমার নির্বাচনী তহবিল—এটা পুরোপুরি ক্রাউড ফান্ডিং।"
তরুণ ভোটারদের আকৃষ্ট করতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমই প্রধান হাতিয়ার বলে জানান তিনি। কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিল্পকারখানা স্থাপন, স্থলবন্দরকেন্দ্রিক বাণিজ্য এবং মাদক–জুয়া নিয়ন্ত্রণকে তিনি তরুণদের জন্য প্রধান অঙ্গীকার হিসেবে তুলে ধরছেন।
গণঅধিকারের অন্য জেন-জি প্রার্থীদের মধ্যে ঢাকা-৩ থেকে ২৬ বছর বয়সী মো. সাজ্জাদ; ঠাকুরগাঁও-৩ থেকে ২৮ বছর বয়সী মো. মামুনুর রশিদ মামুন এবং নোয়াখালী-৪ আসন থেকে ২৭ বছর বয়সী আবদুজ জাহের নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন।
বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল (মার্কসবাদী) থেকে ঢাকা–৫ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ২৭ বছর বয়সী শাহিনুর আক্তার সুমি। তিনি টিবিএসকে বলেন, "তফসিল ঘোষণার আগেই আমি আমার এলাকায় কাজ শুরু করেছি। বিশেষ করে নারী ও তরুণদের কাছ থেকে খুব ভালো সাড়া পাচ্ছি। আমি নারীদের ঘরে ঘরে যাচ্ছি, তারা মন খুলে তাদের কথা বলছেন। সার্বিকভাবে মানুষের ভালোবাসা পাচ্ছি। জেন-জি ভোটারদের মাঠপর্যায়ের প্রচারণায় তুলনামূলক কম পাওয়া যায়, কারণ তারা বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজকেন্দ্রিক। এ কারণে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে অনলাইনে প্রচারণা চালাচ্ছি। এই প্রজন্মের মধ্যে সাহস ও শক্তি রয়েছে, তারা অত্যন্ত বিচক্ষণ। আমি মনে করি, তারা ভুল মানুষের হাতে নিজেদের ভোট সমর্পণ করবে না। যারা জুলাই অভ্যুত্থান ও একাত্তরের চেতনার পক্ষে, তারাই তাদের পছন্দ হবে।"
তিনি বলেন, আমি ২০১৬ সাল থেকে রাজনীতিতে সক্রিয়। আমার বাবা একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। আবার আমার দলের কাছেও অঢেল অর্থ নেই। সে কারণে গণচাঁদা তুলে আমি নির্বাচনে অংশ নিচ্ছি। আমরা তেমন ব্যানার–ফেস্টুন করতে পারিনি, তবে মানুষের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করছি। জনগণের প্রতি আমার আহ্বান—বড় দল দেখে নয়, প্রার্থী দেখে ভোট দেবেন। নারী প্রার্থী হিসেবে কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। বর্তমানে যে ধরনের ধর্মীয় বাতাবরণ তৈরি হয়েছে, তাতে কিছুটা নিরাপত্তাহীনতা অনুভূত হয়। কিন্তু তারপরেও মনে হয় যে, না, যা হবে জনগণ দেখে নেবে। মাঠে নামা প্রয়োজন।
২৮ বছর বয়সী মুন তাহার বেগম নোয়াখালী-৫ থেকে একই দলের মনোনয়ন নিয়ে নির্বাচন করছেন। বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল থেকে কামরুন্নাহার সাথী কুমিল্লা-৬ আসন থেকে নির্বাচন করছেন। তার বয়স ২৫ বছর।
ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশ, সমাজতান্ত্রিক দল, কমিউনিস্ট পার্টিসহ বিভিন্ন ছোট দল থেকেও একাধিক জেন–জি প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশ থেকে ঢাকা-১৩ আসনে ফাতেমা আক্তার মুনিয়া (২৫); নোয়াখালী-৫ আসনে তৌহিদুল ইসলাম (২৮) ও নরসিংদী-৫ আসনে তাহমিনা আক্তার (২৫) প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
জেন-জির অন্য প্রার্থীদের মধ্যে ঝালকাঠি–১ আসনে ইসলামী আন্দোলন থেকে ইব্রাহীম (২৭); আমার বাংলাদেশ পার্টি থেকে যশোর-২ আসনে রিপন মাহমুদ (২৮); বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টি থেকে যশোর-৩ আসনে মোঃ রাশেদ খান (২৮); মাদারীপুর-১ আসনে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস থেকে সাইদ উদ্দিন আহমাদ হানজালা (২৮); আম জনতার দল থেকে সিরাজগঞ্জ-৬ আসনে মো. আসাদুল হক (২৮); বাংলাদেশ সংখ্যালঘু জনতা পার্টি (বিএমজেপি) থেকে সাতক্ষীরা-৩ আসনে রুবেল হোসেন (২৭) এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ফ্রন্ট থেকে নওগাঁ-৩ আসনে আব্দুল্লাহ আল-মামুন সৈকত (২৮) এবারের নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন।
তাদের অনেকেই বলছেন, গত পাঁচ দশকের রাজনীতিতে বঞ্চনা ও দারিদ্র্যের বাইরে মানুষ কিছু পায়নি। ফলে ভোটারদের একটি অংশ দল বা মার্কার চেয়ে যোগ্য ও সক্রিয় প্রার্থীকে বেছে নেওয়ার কথা ভাবছেন।
