সাবেক মেয়র সাঈদ খোকনের অপ্রদর্শিত বহুতল ভবন, ব্যাংক হিসাব ও বন্ডের সন্ধান
ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের সাবেক মেয়র সাঈদ খোকন ও তার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে গত পাঁচ বছরে অন্তত ৩১৫ কোটি টাকার আয় ও সম্পদ গোপন করার অভিযোগ এনেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ট্যাক্স ইন্টেলিজেন্স উইং।
এই প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতার নিজের নামেই অন্তত ১৪৫ কোটি টাকার অপ্রদর্শিত আয় ও সম্পদের সন্ধান পাওয়া গেছে। এছাড়া তার স্ত্রী, বোন ও মায়ের নামে আরো ১৭০ কোটি টাকার সমপরিমাণ আয় ও সম্পদ গোপনের সন্ধান মিলেছে।
ইনকাম ট্যাক্স ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড ইনভেস্টিগেশন উইং থেকে এ বিষয়ে কিছু নথি টিবিএসের হাতে এসেছে। এসব নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০২০ সালের ১৬ মে মেয়রের মেয়াদ শেষ হওয়া সাঈদ খোকনের নামে বহুতল ভবন, ব্যাংক আমানত ও বন্ডে বিপুল অঙ্কের অপ্রদর্শিত বিনিয়োগের পাশাপাশি বিদেশে অর্থ লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে।
এছাড়া এসব নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, সাঈদ খোকন ঢাকার গুলশান ও বনানীতে দুটি ভবনে প্রায় ৭০ কোটি টাকার বিনিয়োগ গোপন করেছেন। এর মধ্যে একটি ভবন ১৯ তলা, অপরটি ১৪ তলার।
গোয়েন্দা সূত্র আরও জানায়, মুদারাবা টার্ম ডিপোজিট রিসিটে (এমটিডিআর) প্রায় ১২ কোটি টাকা—যা সাধারণত স্থায়ী আমানত হিসেবে পরিচিত—ট্রেজারি বিল, বন্ড, ভবনের ভাড়া থেকে প্রাপ্ত আয় ও অন্যান্য আর্থিক খাতে বিনিয়োগের তথ্য প্রকাশ করেননি সাঈদ খোকন।
গোয়েন্দারা আরও অভিযোগ করেছেন, খোকন তার মেয়ের নামে অস্ট্রেলিয়ায় অর্থ পাঠিয়েছেন, যা তার আয়কর নথিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।
তদন্তে আরও উঠে এসেছে, শেয়ারবাজারে অপ্রদর্শিত বিনিয়োগ ও নিজের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান আরা হসপিটালিটি সার্ভিসেস লিমিটেডকে দেওয়া ১৪ কোটি টাকার ঋণের তথ্যও তিনি গোপন করেছেন।
নজরদারিতে পরিবারের সদস্যরা
ট্যাক্স ইন্টেলিজেন্স উইংয়ের তথ্যমতে, সাঈদ খোকনের স্ত্রী ফারহানা সাঈদের নামে ৮৬ কোটি টাকা, মা ফাতেমা খাতুনের নামে ৬৬ কোটি টাকা ও বোন শাহানা হানিফের নামে আরও ১৮ কোটি টাকার গোপন আয় ও সম্পদের প্রমাণ মিলেছে।
এর আগে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে তাদের নামে থাকা তিনটি বন্ড অ্যাকাউন্টে প্রায় ৯০ কোটি টাকার লেনদেন স্থগিত করা হয়। এছাড়া আদালতের নির্দেশে এই পরিবারের অন্তত ৭৯টি ব্যাংক হিসাব ইতিপূর্বেই ফ্রিজ করা হয়েছে।
ট্যাক্স ইন্টেলিজেন্স উইংয়ের একজন সিনিয়র কর্মকর্তা জানান, সাঈদ খোকন ও তার পরিবারের সদস্যদের হয়ে এসব বিষয়ে কর গোয়েন্দা বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করছেন এনবিআরের একজন সাবেক সদস্য। এদিকে সাঈদ খোকনের অবৈধ আয়ের অভিযোগ নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) আলাদাভাবে অনুসন্ধান চালাচ্ছে।
বনানী ও গুলশানে ভবন
ট্যাক্স ইন্টেলিজেন্স কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, বনানীর কামাল আতাতুর্ক অ্যাভিনিউয়ের ৬৭/এ ও ৬৮ নম্বর ঠিকানায় সাঈদ খোকনস অটোগ্রাফ নামে একটি ১৯-তলা ভবন রয়েছে। তদন্তকারীদের মতে, এই ভবনে খোকনের প্রায় ৬৫ কোটি টাকার অপ্রদর্শিত বিনিয়োগ রয়েছে।
এছাড়া গুলশানের ১০৪ নম্বর রোডের জি ব্লকের ৪জি নম্বর বাড়িতে ওয়াকউড হোটেল অ্যান্ড অ্যাপার্টমেন্ট নামে অন্য একটি সম্পত্তিতেও ৫ কোটি টাকার অপ্রদর্শিত বিনিয়োগের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
গোয়েন্দা সূত্রের দাবি, ২০২১-২২ অর্থবছর থেকে এই দুটি ভবনের ভাড়া বাবদ পাওয়া ৪৫ কোটি টাকারও বেশি আয় অপ্রদর্শিত রয়েছে।
অন্য একটি সূত্র জানায়, সাঈদ খোকন ওই বছর ১০ শতাংশ কর দিয়ে প্রায় ৫০ কোটি টাকা বৈধ করেছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
কর বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে জরিমানাসহ এই পরিবারের ফাঁকি দেওয়া করের পরিমাণ দাঁড়াবে প্রায় ১০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে সাঈদ খোকনের একারই বকেয়া করের পরিমাণ প্রায় ৭৪ কোটি টাকা।
এ বিষয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান টিবিএসকে বলেন, আয় বা সম্পদ গোপন করা অবৈধ উপার্জনের একটি বড় লক্ষণ।
'এ কারণে কর বিভাগের পাশাপাশি দুর্নীতি দমন কমিশনেরও উচিত এ বিষয়ে যথাযথ তদন্ত করা,' বলেন তিনি।
এসব অভিযোগের বিষয়ে সাঈদ খোকন ও তার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের কাউকে পাওয়া যায়নি।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সাঈদ খোকন ও তার পরিবারের সদস্যদের হয়ে এসব বিষয়ে কর গোয়েন্দা বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করছেন এনবিআরের সাবেক সদস্য মো. আলাউদ্দিন। তাকে বেশ কয়েকবার ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। পরে হোয়াটসঅ্যাপে অভিযোগের বিস্তারিত জানিয়ে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, 'আমি তাদের এডভাইজার নই। আমি কখনো তাদের ট্যাক্স ফাইল দেখিনি, তাই এ বিষয়ে আমি কিছু বলতে পারব না।'
