আন্তর্জাতিক সালিশি আদালতে এস আলমের মামলা লড়তে ল ফার্ম নিয়োগ, ঘণ্টায় ব্যয় ১,২৫০ ডলার
আলোচিত ব্যবসায়ী গোষ্ঠী এস আলম গ্রুপ বিশ্বব্যাংকের সালিশি আদালত ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর সেটেলমেন্ট অব ইনভেস্টমেন্ট ডিসপিউটসে যে মামলা করেছে, তার বিরুদ্ধে লড়তে ল ফার্ম নিয়োগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।
জানা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত ল ফার্ম হোয়াইট অ্যান্ড কেইস এলএলপি-কে নিয়োগ দিচ্ছে সরকার। এই মামলা লড়তে প্রতিষ্ঠানটিকে প্রতি ঘণ্টার জন্য এক হাজার ২৫০ মার্কিন ডলার দিতে হবে। বাংলাদেশি মুদ্রায় যা প্রায় দেড় লাখ টাকা।
আজ মঙ্গলবার সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদের সভায় আইন মন্ত্রণালয়ের আইন ও বিচার বিভাগ প্রতিষ্ঠানটিকে নিয়োগ দেওয়ার প্রস্তাব উত্থাপন করে। উপদেষ্টা কমিটি প্রস্তাবটি অনুমোদন করেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
সূত্রটি জানায়, এই আইনি প্রতিষ্ঠান সালিশি আদালতে শুনানির পাশাপাশি মামলাটি নিয়ে গবেষণা, ডকুমেন্ট তৈরি, পরামর্শ করা, ই-মেইল, আর্থিক লেনদেন বা চুক্তিনামা পর্যালোচনার মতো প্রমাণ বিশ্লেষণের কাজে যে সময় ব্যয় করবে, সেজন্য প্রতি ঘণ্টায় এক হাজার ২৫০ ডলার করে দিতে হবে। এমনকি মামলার জন্য আইনজীবীকে যদি কোথাও ভ্রমণ করতে হয়, তাহলে সেই ক্ষেত্রেও এই হারে খরচ দিতে হবে।
আইন মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, এটি আন্তর্জাতিক আইনি অঙ্গনে বেশ চড়া রেট। তবে এস আলম যে আইনি প্রতিষ্ঠানকে নিয়োগ করেছে, সেটিকে যথাযথভাবে মোকাবিলার জন্য হোয়াইট অ্যান্ড কেইস এলএলপি-ই উপযুক্ত। সরকারের পক্ষ থেকে দ্রুতই আদালতে প্রতিনিধিত্ব শুরু করবে প্রতিষ্ঠানটি।
সভা শেষে অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ সাংবাদিকদের বলেন, 'আপনারা জানেন অর্থ পাচারের ব্যাপারে এস আলম বোধ হয় একটা মামলা করেছে লন্ডনে এবং চ্যালেঞ্জ করেছে বিশ্বব্যাংকের ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর সেটেলমেন্ট অব ইনভেস্টমেন্ট ডিসপিউটসে (আইসিএসআইডি)। তাদের বিরুদ্ধে লিগ্যাল ফাইট (আইনি লড়াই) করার জন্য আমরা একজন আইনজীবী নিয়োগ করব। এখানে বহু টাকার ব্যাপার।'
অর্থ পাচারের ব্যাপারে এস আলমের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, 'আপনারা জানেন, কোনো দেশের সরকার বা কোম্পানি ব্যবসা-বাণিজ্যে বাধা দিলে বিশ্বব্যাংকের আইসিএসআইডি আরবিট্রেশন করে। আরবিট্রেশন আমাদের নোটিশ দিয়েছে। জবাব দিতে হবে আমাদের এবং এটা খুব জটিল।'
লন্ডনভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এস আলম গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান সাইফুল আলম ও তার পরিবারের আইনজীবীরা গত বছরের ২৭ অক্টোবর ওয়াশিংটনে অবস্থিত ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর সেটেলমেন্ট অব ইনভেস্টমেন্ট ডিসপিউটসে এই আবেদন জমা দেন। ওই বছরের ২৫ নভেম্বর আবেদনটি নিবন্ধন করেন আদালত।
আবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ সরকার তাদের ব্যাংক হিসাব জব্দের পাশাপাশি সম্পদ বাজেয়াপ্ত করেছে। সেই সঙ্গে ব্যবসায়িক লেনদেন নিয়ে 'ভিত্তিহীন' তদন্ত করেছে। শুধু তাই নয়, এস আলম পরিবারের বিরুদ্ধে 'প্ররোচনামূলক মিডিয়া অভিযান' চালানো হয়েছে। আইনজীবীরা দাবি করেছেন, এসব কারণে এস আলম পরিবারের শত কোটি ডলার ক্ষতি হয়েছে।
আবেদনে অবশ্য এস আলম ও তার পরিবারের ল ফার্ম কুইন ইমানুয়েল উরকুহার্ট অ্যান্ড সালিভান ক্ষতিপূরণের সুনির্দিষ্ট হিসাব উল্লেখ করেনি।
২০০৪ সালে বাংলাদেশ-সিঙ্গাপুর দ্বিপক্ষীয় বিনিয়োগ চুক্তির আওতায় এই সালিশি মামলা করা হয়েছে। এস আলমের পরিবার বর্তমানে সিঙ্গাপুরে বসবাস করছে।
ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের খবর অনুযায়ী, পরিবারটি ২০২০ সালে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব ত্যাগ করার পর ২০২১ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে সিঙ্গাপুরের নাগরিকত্ব গ্রহণ করেছে।
এস আলমের পরিবারের অভিযোগ, তাদের লক্ষ্য করে বিভিন্ন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিচ্ছে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার। যেমন, অযৌক্তিকভাবে সম্পদ জব্দ ও বাজেয়াপ্ত করা।
গত বছরের ১৭ ডিসেম্বর অর্থ মন্ত্রণালয়ে এক বৈঠক শেষে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর টিবিএসকে বলেছিলেন, 'সালিশি আদালতে এস আলমের করা মামলার বিরুদ্ধে লড়বে বাংলাদেশ ব্যাংক। এস আলম দাবি করেছেন তিনি সিঙ্গাপুরের নাগরিক। আমরা দেখাবো যে তিনি বাংলাদেশের নাগরিক। তিনি বাংলাদেশের বিভিন্ন ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও পরিচালক ছিলেন। চোরের মায়ের বড় গলা। আমরা মামলাটি লড়ব।'
