জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১-দলের আসন সমঝোতায় এখনও মেলেনি হিসাব, তৃণমূলে অসন্তোষ
বাংলাদেশ জামায়াত ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের আসন সমঝোতার চূড়ান্ত ঘোষণা এলেও বাস্তবে হিসাব এখনো মিলছে না।
জামায়াত ইসলামী যে কয়েকটি আসনে ছাড় দেওয়ার কথা বলেছিল, সেসব আসনে তৃণমূল পর্যায়ে তীব্র অসন্তোষ থাকায় জোটের প্রার্থীদের নাম এখনো বদলানো হচ্ছে। একই সঙ্গে অন্তত ৫০টি আসনে জোটভুক্ত একাধিক দলের প্রার্থী থাকছেন।
মনোনয়ন প্রত্যাহারের সময়সীমা শেষ হওয়ার পরও, গত ২৩ ও ২৪ জানুয়ারি বাংলাদেশ জামায়াত ইসলামী দেশের সাতটি আসনে ব্যালট পেপার থেকে তাদের 'দাঁড়িপাল্লা' প্রতীক প্রত্যাহারের জন্য নির্বাচন কমিশনে আবেদন করেছে।
এ বিষয়ে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিনের কাছে চিঠি পাঠান।
গত ২১ জানুয়ারি ঘোষিত সমঝোতা অনুযায়ী, ৩০০ আসনের মধ্যে জামায়াত ইসলামী পাবে ২১৫টি আসন। জাতীয় নাগরিক পার্টি পাবে ৩০টি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ২৩টি, খেলাফত মজলিস ১০টি, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) ৭টি, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি ৩টি, আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি) ৩টি এবং বাংলাদেশ ডেভলপমেন্ট পার্টি ২টি আসন।
তবে বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, জামায়াত ইসলামী ২১৫ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার কথা থাকলেও তাদের প্রার্থী রয়েছে ২২৪টি আসনে। এনসিপিকে ২৯টি আসন এককভাবে ও একটি আসন উন্মুক্ত রাখার কথা বলা হলেও দলটির প্রার্থী রয়েছে ৩২টি আসনে। এর মধ্যে ১৩টি আসনে এনসিপির পাশাপাশি শরিক দলগুলোর প্রার্থীও রয়েছেন।
জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা) কোনো আসন ছাড় না পেলেও যশোর-১ আসনে নির্বাচন করছে। একইভাবে বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনকে একটি আসনেও ছাড় না দেওয়া হলেও দলটি আটটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস চূড়ান্তভাবে ২৩টি আসন পাওয়ার কথা থাকলেও তাদের প্রার্থী রয়েছে ৩৪টি আসনে। অন্যদিকে খেলাফত মজলিস ১০টি আসন ছাড় পেলেও প্রার্থী দিয়েছে ২১টি আসনে।
আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি পার্টি) প্রার্থী রয়েছে ৩০টি আসনে, যদিও দলটিকে ছাড় দেওয়া হয়েছিল মাত্র তিনটি আসন। কর্নেল (অব.) অলি আহমেদের নেতৃত্বাধীন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি ১২টি আসনে নির্বাচন করছে, অথচ ছাড় পেয়েছে ৭টি আসনে।
সর্বশেষ যুক্ত হওয়া বাংলাদেশ লেবার পার্টি ১৫টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে, যদিও তাদের জন্য কোনো আসন ছাড় দেওয়ার ঘোষণা আসেনি। তবে বাংলাদেশ ডেভলপমেন্ট পার্টি দুটি এবং বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি তিনটি নির্ধারিত আসনেই প্রার্থী দিয়েছে।
এনসিপির ১৩ আসনে শরিক দলের প্রার্থী
জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ১১ দলীয় জোটের আওতায় ৩০টি আসনে নির্বাচন করছে। এর মধ্যে একটি আসন উন্মুক্ত রাখার ঘোষণা থাকলেও আরও ১৩টি আসনে শরিক দলগুলোর প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
এনসিপির কয়েকজন নেতা জানান, খোঁজ নিয়ে তারা জানতে পেরেছেন—চট্টগ্রাম-৮ ও নরসিংদী-২ আসনে জামায়াত ইসলামী, নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, সিরাজগঞ্জ-৬ আসনে আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি), ঢাকা-২০ ও রাজবাড়ী-২ আসনে খেলাফত মজলিসের প্রার্থীরা মনোনয়ন প্রত্যাহার করেননি।
এ ছাড়া পঞ্চগড়-১ আসনে বাংলাদেশ লেবার পার্টি, রংপুর-৪ আসনে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, কুড়িগ্রাম-২ আসনে এবি পার্টি, ঢাকা-১৯ আসনে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি), কুমিল্লা-৪ আসনে খেলাফত মজলিস এবং নেত্রকোনা-২ আসনে বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের প্রার্থীরাও নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াননি।
এ বিষয়ে এনসিপির একজন নেতা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, জোটের শীর্ষ পর্যায়েই সমন্বয়ের ঘাটতি থাকলে তৃণমূল পর্যায়ে তা আরও বেশি স্পষ্ট হয়। প্রার্থিতা প্রত্যাহারের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয়ভাবে কোনো কার্যকর সমন্বয় না থাকায় জামায়াতসহ কয়েকটি দল অনেক আসনে প্রার্থীতা প্রত্যাহার করেনি।
ভোলায় এলডিপির প্রার্থিতা প্রত্যাহার, জামায়াত প্রার্থীকে সমর্থন
ভোলা-২ (দৌলতখান–বোরহানউদ্দিন) আসনে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীকে সমর্থন জানিয়ে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন ১১ দলীয় জোটভুক্ত লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) মনোনীত প্রার্থী মোকফার উদ্দিন চৌধুরী।
২৫ জানুয়ারি ভোলা প্রেস ক্লাবে দেওয়া এক লিখিত বিবৃতিতে এলডিপির নেতা বশির আহমেদ জানান, জোটের ঐক্য, সৌহার্দ্য ও বৃহত্তর রাজনৈতিক স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে মোকফার উদ্দিন চৌধুরী স্বেচ্ছায় নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মাওলানা মুফতি ফজলুল করিমকে সমর্থন দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
ভোলার জামায়াত কর্মী আব্দুল করিম জানান, এই আসনে শুরুতে ১০ দলীয় ঐক্যের চূড়ান্ত প্রার্থী ছিলেন এলডিপির প্রার্থী। তবে জামায়াতের নেতাকর্মীদের মধ্যে ব্যাপক অসন্তোষ ছিল। একপর্যায়ে এলডিপি প্রার্থী মাঠে কাজ করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ না করায় জামায়াত প্রার্থীকে সমর্থন দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। যদিও কেন্দ্রীয়ভাবে জামায়াত এই আসনটি ছেড়ে দিয়েছিল।
আসন সমঝোতা নিয়ে জোটের মধ্যে আলোচনা চললেও এ পর্যায়ে মনোনয়ন প্রত্যাহারের কোনো সুযোগ নেই, কারণ মনোনয়ন প্রত্যাহারের সময়সীমা গত ২০ জানুয়ারি শেষ হয়েছে।
এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের উপসচিব মোহাম্মদ মনির হোসেনের সই করা একটি চিঠি গতকাল বাংলাদেশ জামায়াত ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেলের কাছে পাঠানো হয়েছে। চিঠিতে জানানো হয়েছে, এ মুহূর্তে নির্বাচনী প্রতীক প্রত্যাহারের কোনো সুযোগ নেই।
চিঠিতে বলা হয়, গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২-এর ১৬(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল একাধিক প্রার্থীকে মনোনয়ন দিলে মনোনয়ন প্রত্যাহারের শেষ তারিখের মধ্যে দলের সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক বা সমমর্যাদার পদধারী ব্যক্তি লিখিতভাবে—নিজে অথবা অনুমোদিত প্রতিনিধির মাধ্যমে—রিটার্নিং কর্মকর্তাকে দলের চূড়ান্ত প্রার্থীর নাম জানাবেন। এ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে দলের অন্য প্রার্থীদের মনোনয়ন স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে।
চিঠিতে আরও বলা হয়, এই প্রেক্ষাপটে এ পর্যায়ে নির্বাচনী প্রতীক প্রত্যাহারের কোনো বিধান নেই।
এর আগে জামায়াত ইসলামী সাতটি আসনে প্রতীক প্রত্যাহারের আবেদন করে। আসনগুলো হলো—চট্টগ্রাম-৮, নরসিংদী-২, ভোলা-২, নরসিংদী-৩, নারায়ণগঞ্জ-৩, সুনামগঞ্জ-১ ও চট্টগ্রাম-১২।
