সিলেটের ৩৪ প্রার্থীর ২৫ জনই অন্যের থেকে পাওয়া দান ও ধারের টাকায় নির্বাচন করছেন
সিলেট-৫ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন সদ্য বহিষ্কৃত জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি মামুনুর রশীদ। পেশায় ব্যবসায়ী এই প্রার্থীর কোটি টাকার সম্পদ থাকলেও তিনি ভোট করবেন অন্যের টাকায়। নির্বাচনি হলফনামায় তিনি নিজেই এমন তথ্য উল্লেখ করেছেন। রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে জমা দেওয়া নির্বাচনি ব্যয়ের সম্ভাব্য হিসাব বিবরণীতে মামুনুর রশীদ জানিয়েছেন, নির্বাচনে তিনি ২৫ লাখ টাকা ব্যয় করবেন এবং এই টাকার পুরোটাই দেবেন তার চিকিৎসক ভাই ডা. কাওছার রশীদ।
অনুরূপ চিত্র দেখা গেছে সিলেট-১ আসনেও। এখানে বিএনপির প্রার্থী হয়েছেন শিল্পপতি খন্দকার আব্দুল মুক্তাদীর। তার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের পরিমাণ ৩৪ কোটি ৩৫ লাখ ৬৪ হাজার টাকা। সিলেটের ৬টি আসনের প্রার্থীদের মধ্যে সম্পদের দিক থেকে তিনিই শীর্ষে অবস্থান করছেন। অথচ তার নির্বাচনি ব্যয়ের একটা বড় অংশ আসবে অন্যদের কাছ থেকে। নির্বাচনে ৫৫ লাখ টাকা খরচ করবেন জানিয়ে হলফনামার সঙ্গে জমা দেওয়া সম্ভাব্য ব্যয়ের হিসাবে খন্দকার আব্দুল মুক্তাদীর উল্লেখ করেছেন, এর মধ্যে তার নিজ আয় থেকে ব্যয় করবেন ২৫ লাখ টাকা। বাকি টাকার মধ্যে স্ত্রীর কাছ থেকে ১৫ লাখ, ভগ্নিপতির কাছ থেকে ১০ লাখ ও ভাগ্নের কাছ থেকে ৫ লাখ টাকা দান হিসেবে পাবেন তিনি।
কেবল এই দুজনই নয়, সিলেটের ৬টি আসনের বেশিরভাগ প্রার্থীই এভাবে অন্যের টাকায় নির্বাচন করবেন। এবার সিলেটের ৬টি আসনে মোট ৩৪ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এর মধ্যে ২৫ জনই অন্যদের কাছ থেকে পাওয়া দান ও ধারের টাকায় নির্বাচনি ব্যয় মেটাবেন। প্রার্থীদের মধ্যে মাত্র নয়জন জানিয়েছেন যে তারা নিজস্ব আয়ের টাকা নির্বাচনে ব্যয় করবেন। প্রবাসীবহুল সিলেটে প্রার্থীদের এই দান ও ধার প্রদানকারীদের বড় অংশই প্রবাসী। জেলার ১৭ জন প্রার্থীরই ভোটের টাকার একটি অংশ আসবে প্রবাস থেকে।
সিলেট-১ (মহানগর ও সদর) আসনে মোট প্রার্থী আটজন। এদের মধ্যে কেবল জামায়াতে ইসলামীর হাবিবুর রহমান নিজ আয়ের ৩০ লাখ টাকা খরচ করবেন। বাকিদের মধ্যে তিনজন নিজ আয়ের পাশাপাশি প্রবাসী স্বজন ও শুভানুধ্যায়ীদের টাকায় নির্বাচনি ব্যয় মেটাবেন। ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশের মো. শামীম মিয়া ব্যবসা ও ব্যাংক সুদ থেকে পাওয়া ৫ লাখ টাকা খরচের পাশাপাশি প্রবাস থেকে দান হিসেবে পাওয়া ১১ লাখ এবং আরও ১২ জনের কাছ থেকে পাওয়া ১০ লাখ টাকা খরচ করবেন। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মাহমুদুল হাসান নিজ আয়ের ১ লাখ ২০ হাজার, প্রবাসী চাচার কাছ থেকে পাওয়া ২ লাখ ৯০ হাজার এবং দলের নেতা-কর্মীদের দানের ৪ লাখ ৮০ হাজার টাকা খরচ করবেন। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন নিজ আয়ের ১ লাখ, প্রবাসী স্বজনদের থেকে পাওয়া ৩ লাখ এবং দলের সদস্য ও সমর্থকদের কাছ থেকে পাওয়া ১ লাখ টাকা খরচ করবেন।
সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) প্রার্থী প্রণব জ্যোতি পাল নিজ তহবিলের ৫০ হাজার, শুভানুধ্যায়ীর কাছ থেকে দান পাওয়া ৫০ হাজার এবং দলের মাধ্যমে গণচাঁদা হিসেবে পাওয়া ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা ব্যয় করবেন। বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (মার্ক্সবাদী) সঞ্জয় কান্ত দাস টিউশনি আয়ের ৪ লাখ এবং দান হিসেবে পাওয়া ২ লাখ টাকা খরচ করবেন। গণ অধিকার পরিষদের আকমল হোসেন ব্যবসা থেকে আয় করা ৭ লাখ এবং দানের ৫ লাখ টাকা খরচ করবেন।
সিলেট-২ (বিশ্বনাথ ও ওসমানীনগর) আসনের পাঁচজন প্রার্থীর সবাই প্রবাসীদের কাছ থেকে পাওয়া টাকা নির্বাচনে ব্যয় করবেন বলে জানিয়েছেন। এ আসনে বিএনপির প্রার্থী তাহসিনা রুশদীর লুনা নির্বাচনে ২০ লাখ টাকা ব্যয় করবেন। এর মধ্যে নিজ আয় থেকে ৫ লাখ ও বোনের স্বামীর কাছ থেকে ধার করা ৫ লাখ টাকা ব্যয় করবেন। বাকি ১০ লাখ টাকা তাকে দান করবেন মোহাম্মদ আব্দুল কুদ্দুস ও মোহাম্মদ জামাল নামের দুই প্রবাসী, যাদের মধ্যে প্রথম জন লুনার আত্মীয়।
১০-দলীয় জোটে থাকা খেলাফত মজলিসের মুহাম্মদ মুনতাছির আলী ২৫ লাখ টাকা খরচ করবেন, যার মধ্যে নিজের আয় ১০ লাখ ৫৫ হাজার টাকা। বাকি টাকা তিনি প্রবাসীদের থেকে দান ও ধার হিসেবে পেয়েছেন। জাতীয় পার্টির মাহবুবুর রহমান চৌধুরী ১১ লাখ টাকা খরচ করবেন, যার ১০ লাখ টাকাই পেয়েছেন যুক্তরাজ্যপ্রবাসী ছেলের কাছ থেকে। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মো. আমির উদ্দিন নিজ আয়ের ৬৩ হাজার, প্রবাসী দুই ভাইয়ের কাছ থেকে ধার আনা ৮০ হাজার এবং দলের নেতা-কর্মীদের দানের ২ লাখ ৩০ হাজার টাকা ব্যয় করবেন।
গণফোরামের মো. মুজিবুল হক নিজ আয়, অনুদান ও দলীয় তহবিল থেকে ৫ লাখ টাকা খরচের পাশাপাশি যুক্তরাজ্যপ্রবাসী স্বজনদের থেকে পাওয়া ১২ লাখ এবং ধার ও দান হিসেবে পাওয়া আরও ৩ লাখ টাকা নির্বাচনে ব্যয় করবেন।
সিলেট-৩ (দক্ষিণ সুরমা, ফেঞ্চুগঞ্জ ও বালাগঞ্জ) আসনের ৬ প্রার্থীর মধ্যে তিনজন নিজেদের আয়ে নির্বাচন করবেন। তারা হলেন—বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মুসলেহ উদ্দীন রাজু (৫৯ লাখ ১ হাজার ৫৩৩ টাকা), স্বতন্ত্র প্রার্থী মোস্তাকিম রাজা চৌধুরী (৪০ লাখ টাকা) এবং জাতীয় পার্টির মোহাম্মদ আতিকুর রহমান (২০ লাখ টাকা)। অপর তিন প্রার্থী নিজ আয়ের পাশাপাশি প্রবাসীদের টাকার ওপর নির্ভরশীল। বিএনপির এম এ মালিক নিজ আয়ের ২০ লাখ টাকার পাশাপাশি যুক্তরাজ্যপ্রবাসী ছেলের কাছ থেকে পাওয়া টাকাও খরচ করবেন, তবে সেই অংক হলফনামায় স্পষ্ট নয়। ইসলামী আন্দোলনের রেদওয়ানুল হক চৌধুরী নিজ আয়ের ৬৮ হাজার ৫০০ টাকা, প্রবাসী দুই ভাইয়ের দান করা ৩ লাখ এবং দলীয় কর্মীদের অনুদান ২ লাখ ২০ হাজার টাকা ব্যয় করবেন। স্বতন্ত্র প্রার্থী মইনুল বাকের নিজ আয়ের ৫ লাখ, প্রবাসী স্বজনদের ধার ও দান থেকে ১০ লাখ, প্রবাসী শুভানুধ্যায়ীদের ১২ লাখ এবং জায়গা বিক্রি করা ২০ লাখ টাকা নির্বাচনি কাজে ব্যয় করবেন।
সিলেট-৪ (কোম্পানীগঞ্জ, গোয়াইনঘাট ও জৈন্তাপুর) আসনের ৫ প্রার্থীর মধ্যে নিজের আয় থেকে ব্যয় করবেন বিএনপির আরিফুল হক চৌধুরী (৩৫ লাখ), জাতীয় পার্টির মোহাম্মদ মুজিবুর রহমান (৫ লাখ) এবং গণ অধিকার পরিষদের জহিরুল ইসলাম (১০ লাখ)। বাকিদের মধ্যে ইসলামী আন্দোলনের সাঈদ আহমদ ১১ লাখ ৪০ হাজার টাকার মধ্যে ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা জনৈক প্রবাসী শুভানুধ্যায়ীর কাছ থেকে পেয়েছেন। বাকি টাকা তার নিজের আয়, ভাই ও দলীয় কর্মীদের থেকে পাওয়া। জামায়াতের মো. জয়নাল আবেদীন নিজ আয়ের ২০ লাখ এবং বাবার কাছ থেকে দান হিসেবে পাওয়া ৩ লাখ টাকা ব্যয় করবেন।
সিলেট-৫ (জকিগঞ্জ ও কানাইঘাট) আসনে মোট প্রার্থী চারজন। মামুনুর রশীদ ছাড়া আরও দুজন স্বজনদের টাকায় ভোট করবেন। জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের উবায়দুল্লাহ ফারুক ১২ লাখ টাকার মধ্যে নিজ আয়ের ২ লাখ টাকা বাদে বাকিটা প্রবাসী স্বজনদের ধার ও দানে মেটাবেন। খেলাফত মজলিসের মোহাম্মদ আবুল হাসান নিজ আয়ের ৩ লাখ টাকার পাশাপাশি প্রবাসী শ্যালকের দেওয়া ৫ লাখ এবং নয়জন শুভানুধ্যায়ীর দেওয়া ১৭ লাখ টাকা ব্যয় করবেন। এ আসনে কেবল বাংলাদেশ মুসলিম লীগের মো. বিলাল উদ্দিন নিজ আয়ের ৫ লাখ টাকা খরচ করবেন।
সিলেট-৬ (বিয়ানীবাজার ও গোলাপগঞ্জ) আসনে বিএনপির এমরান আহমদ চৌধুরী ৬৫ লাখ টাকা সম্ভাব্য ব্যয় ধরলেও নিজের আয় থেকে দেবেন ১৫ লাখ। বাকি টাকা দেবেন ফ্রান্সপ্রবাসী এক শুভানুধ্যায়ী (৩৫ লাখ), ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যের দুই চাচাতো ভাই এবং দেশের এক খালাতো বোন (১৫ লাখ)। জাতীয় পার্টির মোহাম্মদ আবদুন নূর ২৫ লাখ টাকার মধ্যে প্রবাসী আত্মীয়দের দান হিসেবে পেয়েছেন ২২ লাখ টাকা। স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. ফখরুল ইসলাম ২৪ লাখ টাকার মধ্যে ভাইয়ের প্রবাসী আয়ের ২০ লাখ টাকা দান পাচ্ছেন। জামায়াতে ইসলামীর মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন ২৪ লাখ ১৩ হাজার টাকা ব্যয়ের মধ্যে সাড়ে ৮ লাখ টাকা অন্যের দান হিসেবে পাচ্ছেন। তবে এই আসনে ব্যতিক্রম গণ অধিকার পরিষদের প্রার্থী জাহিদুর রহমান; তিনি তার নির্বাচনি খরচের ২৫ লাখ টাকার পুরোটাই নিজে বহন করবেন।
