স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির ৫% দেওয়ার প্রতিশ্রুতি বিএনপির, জামায়াতের ৬–৮%; তহবিলের স্পষ্ট রূপরেখা চান বিশেষজ্ঞরা
আসন্ন জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে স্বাস্থ্য খাত একটি কেন্দ্রীয় ইস্যু হিসেবে সামনে এসেছে। রাজনৈতিক দলগুলো তাদের নির্বাচনি প্রতিশ্রুতিতে জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর আগের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।
দীর্ঘদিন সীমিত বিনিয়োগের পর এবার বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী—উভয় দলই স্বাস্থ্য খাতে সরকারি ব্যয় বাড়ানো, বিনামূল্যে চিকিৎসা এবং সার্বজনীন স্বাস্থ্য কাভারেজের পথে অগ্রসর হওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
চলতি বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৪১,৯০৮ কোটি টাকা, যা মোট বাজেটের প্রায় ৫.৩ শতাংশ হলেও জিডিপির মাত্র ০.৬৭ শতাংশ। বরাদ্দের পুরো অর্থ ব্যয় করতে না পারা এখনো একটি নিয়মিত সমস্যাই রয়ে গেছে।
বছরের পর বছর ধরে বিশেষজ্ঞ ও সাধারণ মানুষ স্বাস্থ্য খাতে সরকারি ব্যয় বাড়ানোর দাবি জানিয়ে আসছেন, কারণ দেশের মোট স্বাস্থ্য ব্যয়ের প্রায় ৬৮ থেকে ৭৩ শতাংশই সরাসরি পরিবারের পকেট থেকে দিতে হয়। ফলে প্রায় তিন-চতুর্থাংশ চিকিৎসা ব্যয়ই নিজ পকেট থেকে বহন করতে হয় নাগরিকদের।
এই জরুরি বাস্তবতা স্বীকার করে বিএনপি যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস (এনএইচএস)-এর আদলে একটি 'সার্বজনীন স্বাস্থ্যব্যবস্থা' চালুর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
এই প্রতিশ্রুতির মধ্যে রয়েছে—স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির ৫ শতাংশের বেশি বরাদ্দ, প্রতিটি নাগরিকের জন্য বিনামূল্যে প্রাথমিক চিকিৎসা নিশ্চিত করা এবং সব হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রকে জবাবদিহির আওতায় আনা।
এ ছাড়া দলটি ২৪ ঘণ্টার হেল্পলাইন চালু, জেলা ও বিশেষায়িত হাসপাতাল শক্তিশালীকরণ, সরকারি–বেসরকারি অংশীদারিত্বে জটিল রোগের চিকিৎসা সম্প্রসারণ এবং এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে।
অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী ঘোষণা দিয়েছে, ক্ষমতায় গেলে তারা স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির ৬ থেকে ৮ শতাংশ বরাদ্দ দেবে। পাশাপাশি ৬০ বছরের ঊর্ধ্বে বয়স্ক নাগরিক ও পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা চালু করা হবে।
এছাড়া, দলটি ৬৪ জেলায় ৬৪টি বিশেষায়িত হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা এবং গর্ভধারণ থেকে শিশুর দুই বছর বয়স পর্যন্ত মা ও শিশুর স্বাস্থ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অঙ্গীকার করেছে।
বিশেষজ্ঞরা এসব প্রতিশ্রুতিকে উচ্চাভিলাষী হলেও সামগ্রিকভাবে ইতিবাচক বলে বর্ণনা করেছেন।
তবে তারা সতর্ক করে বলেন, কেবল জিডিপির ৫ শতাংশ স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ দিতে গেলেই প্রায় ৩ লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করতে হবে। এর পাশাপাশি অন্তর্বর্তী সরকার সরকারি কর্মচারীদের গড়ে ১০৪ শতাংশ বেতন বৃদ্ধির পরিকল্পনা করছে, যার জন্য প্রয়োজন হবে অতিরিক্ত ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজনৈতিক দলগুলোর এসব প্রতিশ্রুতি যুক্ত হলে পরবর্তী সরকারের ওপর বড় ধরনের আর্থিক চাপ তৈরি হবে, যা এসব উচ্চাভিলাষী ঘোষণা পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা আদৌ সম্ভব কি না—সে প্রশ্নও তুলছে।
তাদের পরামর্শ, এসব প্রতিশ্রুতিকে বাস্তবসম্মত করতে হলে কাঠামোগত সংস্কার, ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ এবং কীভাবে এসব অঙ্গীকার কার্যকর করা হবে—সে বিষয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা প্রয়োজন।
'সংস্কার ধীরে ধীরে অর্জন করতে হবে'
স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশনের সদস্য অধ্যাপক ডা. সৈয়দ আকরাম হোসেন বলেন, কমিশনও স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দের সুপারিশ করেছিল, যা এখন রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতিতেও প্রতিফলিত হচ্ছে।
তিনি বলেন, সার্বজনীন স্বাস্থ্য কাভারেজ অর্জন করতে হলে শেষ পর্যন্ত স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির ৫ শতাংশ ব্যয় করতেই হবে। যার অর্থ, মোট বাজেটের প্রায় ২৫ শতাংশ এই খাতে বরাদ্দ দিতে হবে।
তিনি বলেন, 'তবে এই মুহূর্তে রাষ্ট্রের পক্ষে তা সম্ভব নয়। বর্তমান আর্থিক কাঠামোর বাস্তবতায় জিডিপির ৬ থেকে ৮ শতাংশ বরাদ্দের প্রস্তাব আরও বেশি উচ্চাভিলাষী বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ডা. আকরাম বলেন, এই লক্ষ্য একদিনে নয়, ধাপে ধাপে—সম্ভবত পাঁচ বছরের মধ্যে অর্জন করতে হবে। এ ক্ষেত্রে তামাক করের মতো বিকল্প রাজস্ব উৎস এবং ব্যয় সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রয়োজন রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, 'স্বাস্থ্য প্রশাসনে কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া এত বড় বরাদ্দ কার্যকরভাবে ব্যয় করা বাস্তবসম্মত হবে না।'
জামায়াতে ইসলামীর বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা ও বিশেষায়িত হাসপাতালের প্রতিশ্রুতি প্রসঙ্গে ডা. আকরাম বলেন, এগুলো রাষ্ট্রের আকাঙ্ক্ষা হিসেবে প্রশংসনীয়।
তিনি বলেন, কমিশন আইন করে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা বিনামূল্যে করার এবং প্রতিটি জেলা হাসপাতাল আধুনিক করে সব ধরনের সেবা নিশ্চিত করার সুপারিশ করেছিল, যা বাস্তবায়ন হলে মানুষ উল্লেখযোগ্যভাবে উপকৃত হবে।
তিনি আরও বলেন, 'যদি সার্বজনীন স্বাস্থ্য কাভারেজ অর্জিত হয়, তাহলে মা, শিশু বা বয়স্কদের জন্য আলাদা করে প্রতিশ্রুতির প্রয়োজন থাকে না—সবাই তখন কাভারড হবে।'
ডা. আকরাম বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর প্রস্তাবনা সামগ্রিকভাবে সংস্কার কমিশনের সুপারিশের সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয়। 'সব সংস্কারই ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করতে হবে,' বলেন তিনি।
'স্বাস্থ্য খাতের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন নিয়ে স্পষ্টতা কম'
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি বিভাগের পরিচালক ড. শাফিউন শিমুল বলেন, রাজনৈতিক দলগুলো মোটামুটি দিকনির্দেশনা দিয়েছে, কিন্তু বাস্তবায়ন কীভাবে হবে—সে বিষয়ে স্পষ্টতা নেই।
তিনি বলেন, দলগুলো ইনস্যুরেন্সভিত্তিক ব্যবস্থায় যাবে, নাকি বিদ্যমান স্বাস্থ্য অর্থায়ন ব্যবস্থাই সম্প্রসারণ করবে—এ বিষয়টি পরিষ্কার নয়।
ড. শিমুল বলেন, নির্বাচনি ইশতেহারে স্বাস্থ্যকে অগ্রাধিকার দেওয়া ইতিবাচক হলেও অর্থের উৎস, ব্যয়ের কাঠামো এবং কাভারেজের পরিধি স্পষ্ট না হলে এসব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন কঠিন হবে।
তিনি বলেন, 'আমরা এখনো জিডিপির ১ শতাংশও কার্যকরভাবে ব্যয় করতে পারছি না। সেখানে ৬ শতাংশ বা তার বেশি বরাদ্দ দিলে কীভাবে তা ব্যয় হবে—এই প্রশ্ন থেকেই যায়।'
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশে মানসিক স্বাস্থ্য, বয়স্কদের যত্ন এবং নন-কমিউনিকেবল রোগের [সংক্রামক নয় এমন রোগ] কাভারেজ এখনো দুর্বল। এসব খাতের বিস্তার ঘটালে অবশ্যই খরচ বাড়বে।
'সমস্যা বাজেট বাড়ানো নয়, বরং ত্রুটিপূর্ণ ব্যয় কাঠামো ও অভ্যন্তরীণ বণ্টন ব্যবস্থার সংস্কার না করা,' বলেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর প্রস্তাবনা দেখে মনে হচ্ছে তারা বিদ্যমান ব্যবস্থার সামান্য পরিবর্তন বা সম্প্রসারণ করতে চায়, পুরো স্বাস্থ্য খাতের কাঠামোগত পুনর্গঠনের দিকে যাচ্ছে না।
ড. শিমুল বলেন, 'অর্থাৎ, একটি সম্পূর্ণ নতুন ও সমন্বিত স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলার চেয়ে বর্তমান ব্যবস্থাকেই কিছুটা এক্সপ্যান্ড [সম্প্রসারণ করা] করার দিকেই বেশি মনোযোগ দেখা যাচ্ছে।'
