সংকট কাটাতে এলপিজি আমদানি বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি অপারেটরদের
এলপি গ্যাস খাতে ব্যবসা করা ১২টি প্রতিষ্ঠান জানুয়ারি মাসে ১ লাখ ৬৭ হাজার ৬০০ টন এবং ফেব্রুয়ারি মাসে ১ লাখ ৮৪ হাজার ১০০ টন এলপি গ্যাস আমদানির প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
মঙ্গলবার (২০ জানুয়ারি) এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী, বিপিসি ও সংশ্লিষ্টদের নিয়ে বৈঠক করেন জ্বালানি উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খান। জ্বালানি বিভাগে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে এলপিজি অপারেটররা এ প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন বলে বৈঠক সূত্রে জানা গেছে।
তবে মাসের প্রথম ২০ দিনে মাত্র ৬০ হাজার টন এলপিজি আমদানি করা সম্ভব হয়েছে বলে বৈঠকে জানিয়েছে এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (লোয়াব)।
বৈঠকে নাভানা এলপিজি, টিএমএসএস এলপিজি, এসকেএস এলপিজি, বিএম এনার্জি, পেট্রোম্যাক্স এলপিজি, জেএমআই ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্যাস, ওমেরা পেট্রোলিয়াম, যমুনা স্পেকটেক, লাফস গ্যাস, ডেলটা এলপিজি, ইউনাইটেড আইগ্যাস এবং মেঘনা ফ্রেশ এলপিজি অংশ নেয়।
জ্বালানি বিভাগ জানায়, সভায় জ্বালানি উপদেষ্টা জাতীয় নির্বাচনের আগে ও রোজার মাসে যেন এলপিজির কোনো ঘাটতি না হয়, সেজন্য সবাইকে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালানোর নির্দেশ দেন।
তিনি বলেছেন, জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে অপারেটররা যে আমদানির প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তা যেন বাস্তবে প্রতিফলিত হয়। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে সরকারের পক্ষ থেকেও প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহযোগিতা করা হবে।
বৈঠকে আরও সিদ্ধান্ত হয়, এলপিজি আমদানিতে বাংলাদেশ ব্যাংক যেন কোনো সীমা আরোপ না করে—এ বিষয়ে জ্বালানি বিভাগ থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকে চিঠি পাঠানো হবে। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের চেয়ারম্যান এই সুপারিশ করেন বলে জানা গেছে।
কীভাবে দ্রুত এলপি গ্যাস আমদানি করে বাজারের চাহিদা পূরণ করা যায়, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনাও দেন জ্বালানি উপদেষ্টা। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার পর বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার নতুন সরকারের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করতে পারে। তবে ক্ষমতার পালাবদল ও রোজার মাসকে কেন্দ্র করে গৃহস্থালি এবং হোটেল–রেস্তোরাঁয় ব্যবহৃত এই গুরুত্বপূর্ণ পণ্যে আরও সংকট তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কাও করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিপিসিকে আমদানির অনুমোদন জ্বালানি বিভাগের
সরবরাহ সংকট মোকাবিলায় রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বিপিসির মাধ্যমে এলপি গ্যাস আমদানি করে তা বিদ্যমান বেসরকারি কোম্পানিগুলোর মাধ্যমে বাজারে ছাড়ার আলোচনা চলতি মাসের প্রথম দিকে শুরু হয়। এ সংক্রান্ত আদেশ মঙ্গলবার আনুষ্ঠানিকভাবে বিপিসির দপ্তরে পৌঁছেছে।
বিপিসির একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, এলপি গ্যাস আমদানি করে নিজস্ব ব্যবস্থায় বাজারজাত করার সক্ষমতা বিপিসির নেই। তাই আমদানি করে বেসরকারি কোম্পানিগুলোর মাধ্যমে বাজারজাত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে অপারেটরদের সঙ্গে একাধিক বৈঠক হয়েছে এবং তাদের কাছ থেকে চাহিদাপত্র নেওয়া হচ্ছে।
তিনি জানান, আমদানির ক্ষেত্রে নানা জটিলতা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার কারণে কিছু জাহাজ চলাচলে সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। রাশিয়া ও ভারতের মতো বড় দেশগুলো অনেক জাহাজ আগেই বুক করে ফেলায় আন্তর্জাতিক বাজারে জাহাজ সংকট দেখা দিয়েছে।
"বিপিসি যেসব দেশ থেকে সরকার-টু-সরকার ভিত্তিতে জ্বালানি তেল কেনে, সেখান থেকে এলপিজি পাওয়া যেতে পারে। তবে সেক্ষেত্রে মাদার ভেসেল থেকে লাইটার জাহাজের মাধ্যমে দেশে খালাস করতে হবে, কিন্তু প্রয়োজনীয় লাইটার জাহাজ বিপিসির নেই," যোগ করেন ওই কর্মকর্তা।
তিনি আরও বলেন, "এ ক্ষেত্রে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকে লাইটার জাহাজসহ মাদার ভেসেল পাঠাতে হবে। এতে খরচ অনেক বেড়ে যাবে। সব দিক বিবেচনায় নিয়ে হিসাব মেলাতে আমাদের বেশ বেগ পেতে হচ্ছে।"
আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে বিপিসির পক্ষে এলপি গ্যাস আমদানি শুরু করা সম্ভব হবে না বলেও মনে করেন ওই কর্মকর্তা।
গত ২০ দিন ধরে দফায় দফায় বৈঠক হলেও বাজারে এলপি গ্যাস সংকটের কার্যকর সমাধান বের করতে পারেনি সরকার। এক মাসের বেশি সময় ধরে চলা এই সংকটে জনজীবনে ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
বেক্সিমকো ও বসুন্ধরাসহ বাজারের কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠান আমদানি বন্ধ রাখায় গত ডিসেম্বরের মাঝামাঝি থেকে সংকট তীব্র হয়। ১২ কেজি ওজনের একটি সিলিন্ডারের সরকারি দাম ১ হাজার ৩০০ টাকা হলেও বর্তমানে তা ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কোনো কোনো এলাকায় এর চেয়েও বেশি দামে বিক্রির অভিযোগ উঠেছে। সংকটকে কাজে লাগিয়ে হাতবদলের প্রতিটি ধাপে ব্যবসায়ীরা অতিরিক্ত মুনাফা করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
জানা গেছে, দেশে মোট প্রায় ৫ কোটি এলপি গ্যাস সিলিন্ডার আছে। এর মধ্যে বড় পাঁচটি গ্রুপ সরবরাহ করে প্রায় ১ কোটি ৬০ লাখ সিলিন্ডার। বাকি ৩ কোটি ৪০ লাখ সিলিন্ডার অন্যান্য কোম্পানির মাধ্যমে সরবরাহ হয়। তবে আমদানি বন্ধ থাকায় এসব সিলিন্ডার খালি পড়ে রয়েছে।
খাত সংশ্লিষ্টরা জানান, দেশে মাসে এলপি গ্যাসের চাহিদা প্রায় দেড় লাখ টন। অথচ গত নভেম্বর ও ডিসেম্বরে আমদানি হয়েছে যথাক্রমে ১ লাখ টন ও ১ লাখ ২৩ হাজার টন। এর ফলে বাজারে সরবরাহে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
