তিন স্তরের নিরাপত্তা প্রযুক্তির মাধ্যমে ক্যাবল মার্কেটে আধিপত্য বিস্তারের লক্ষ্য আকিজ-বশিরের
আকিজ-বশির ক্যাবলস বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো নিয়ে আসছে তিন স্তরের হাউজ ওয়্যারিং ক্যাবল। এটি ইনসুলেশন বা বিদ্যুৎ নিরোধক ক্ষমতা, স্থায়িত্ব এবং দীর্ঘমেয়াদি কার্যকারিতার ক্ষেত্রে এক নতুন মানদণ্ড স্থাপন করেছে।
দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে আকিজ-বশির গ্রুপের চিফ অপারেটিং অফিসার খোরশেদ আলম বাংলাদেশের ক্যাবল ও তারের বাজারে তাদের গ্রুপের প্রবেশের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেছেন। এতে তিনি তাদের বিনিয়োগের যৌক্তিকতা, প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য এবং নিরাপত্তা, গুণমান ও স্থানীয় উৎপাদনের ওপর জোর দেওয়ার বিষয়গুলো তুলে ধরেছেন। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন টিবিএস-এর চিফ রিপোর্টার আব্বাস উদ্দিন নয়ন।
ঠিক এই সময়ে ক্যাবল ও বৈদ্যুতিক তারের শিল্পে প্রবেশ করতে আকিজ-বশির গ্রুপকে কী অনুপ্রাণিত করেছে এবং অধিগ্রহণের জন্য কেন আপনারা এমিনেন্স ইলেকট্রিক ওয়্যার অ্যান্ড ক্যাবলস লিমিটেডকেই বেছে নিলেন?
বাংলাদেশ এখন এমন একটি পর্যায়ে রয়েছে যেখানে অবকাঠামো উন্নয়ন, নগরায়ন এবং শিল্পের প্রসার—সবই একসঙ্গে দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে। ফলে নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ সঞ্চালন ও নিরাপদ বৈদ্যুতিক সংযোগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জাতীয়ভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একটি বৈচিত্র্যপূর্ণ শিল্পগোষ্ঠী হিসেবে আকিজ-বশির মনে করে, ক্যাবল ও বৈদ্যুতিক তারের এই খাতটি আমাদের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্যের সঙ্গে কৌশলগতভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ। আমাদের লক্ষ্য হলো প্রয়োজনীয় পণ্য উৎপাদনের মাধ্যমে জাতীয় উন্নয়নে সহায়তা করা।
ব্যবসায়িক কাঠামোর দিক থেকে বিচার করলে দেখা যায়, আমাদের বিল্ডিং ম্যাটেরিয়ালস বা নির্মাণ সামগ্রী বিভাগটি ইতোমধ্যেই গ্রুপের সামগ্রিক ব্যবসার ৬০ শতাংশেরও বেশি অবদান রাখছে। আমাদের কৌশলগত উদ্দেশ্য ছিল এই বিভাগটিকে আরও বড় করা, যাতে নির্মাণকাজের জন্য প্রয়োজনীয় সব না হলেও অধিকাংশ পণ্যই আমরা একটি বিশ্বস্ত প্রতিষ্ঠানের অধীনে গ্রাহকদের দিতে পারি। ক্যাবল শিল্পে প্রবেশ করাটা সেই কৌশলেরই একটি স্বাভাবিক অংশ।
আমাদের বাজার গবেষণায় আমরা কিছু স্পষ্ট শূন্যস্থানও চিহ্নিত করেছি। একদিকে, কিছু প্রভাবশালী কোম্পানি বাজারে এক ধরনের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ তৈরি করে রেখেছে; অন্যদিকে, অনেক সরবরাহকারীই পণ্যের মানের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে এবং নির্ভরযোগ্যভাবে পণ্য সরবরাহে হিমশিম খাচ্ছে। আমরা অনুভব করেছি, এখানে এমন একটি নির্ভরযোগ্য ও মানসম্পন্ন প্রতিষ্ঠানের জায়গা রয়েছে, যার মান বজায় রাখা ও নিশ্চিত সরবরাহের প্রতি দৃঢ় অঙ্গীকার থাকবে। এমিনেন্স ইলেকট্রিক ওয়্যার অ্যান্ড ক্যাবল লিমিটেড-এর একটি প্রতিষ্ঠিত উৎপাদন কাঠামো, দক্ষ জনবল এবং নিয়মমাফিক কাজের সংস্কৃতি ছিল। এগুলো আমাদের পণ্যের মানের সঙ্গে কোনো আপস না করেই দ্রুত বড় পরিসরে কাজ শুরু করার সুযোগ করে দিয়েছে।
বাংলাদেশের ক্যাবল শিল্পের বর্তমান আকার এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?
পরিমাণের দিক থেকে বিবেচনা করলে ক্যাবল শিল্প ইতোমধ্যেই বেশ বড় একটি বাজার, যার আনুমানিক আকার প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা। সরকারি অবকাঠামো প্রকল্প, আবাসন খাতের উন্নয়ন, শিল্পের প্রসার এবং ভোক্তাদের মধ্যে নিরাপত্তা সচেতনতা বৃদ্ধির ফলে এই খাতের প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা অত্যন্ত উজ্জ্বল।
আমরা বিশ্বাস করি, সাময়িক কোনো বিঘ্ন না ঘটলে আগামী ১০ থেকে ১৫ বছর এই শিল্পে বার্ষিক ১০-১৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি বজায় রাখা সম্ভব। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবণতা হলো, মানহীন ক্যাবলের পরিবর্তে অনুমোদিত ও উন্নত মানের পণ্যের ব্যবহার ধীরে ধীরে বাড়ছে। স্থানীয় উৎপাদনকারীরা উন্নত প্রযুক্তি গ্রহণ করায় আমদানিনির্ভরতা কমানোরও সুযোগ রয়েছে। উন্নত উৎপাদন সুবিধা এবং নতুন সব বৈশিষ্ট্য নিয়ে আমরা গ্রাহকদের ক্রমবর্ধমান প্রত্যাশা পূরণ করতে চাই এবং বাজারে নতুন গতি সঞ্চার করতে চাই।
বাজারে অবস্থান ও ব্র্যান্ডিংয়ের ক্ষেত্রে এই উদ্যোগ নিয়ে আপনার স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত লক্ষ্যগুলো কী?
স্বল্প মেয়াদে আমাদের অগ্রাধিকার হলো কার্যক্রমের স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, পণ্যের মানের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা, নির্ভরযোগ্য সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং দেশের প্রধান বাজারগুলোতে শক্তিশালী বিপণন নেটওয়ার্ক তৈরি করা। আমরা চাই শুরু থেকেই এই ব্র্যান্ডটি নিরাপত্তা, নির্ভরযোগ্যতা এবং সঠিক মূল্যের প্রতীক হিসেবে পরিচিতি লাভ করুক।
দীর্ঘ মেয়াদে আমাদের পরিকল্পনা হলো পণ্যের পরিসর বাড়ানো, উন্নত উৎপাদন প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করা এবং ধীরে ধীরে রপ্তানির সুযোগগুলো কাজে লাগানো। চূড়ান্তভাবে আমাদের লক্ষ্য হলো আকিজ-বশির ক্যাবলসকে জাতীয় বাজারের শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কাতারে নিয়ে যাওয়া, যাতে এর সুনাম এই অঞ্চলের সেরা ব্র্যান্ডগুলোর সমকক্ষ হয়।
অধিগ্রহণ ও সম্প্রসারণে কী পরিমাণ বিনিয়োগ করা হয়েছে এবং এর অর্থায়ন কীভাবে করা হয়েছে?
এই বিনিয়োগের মধ্যে এমিনেন্স ইলেকট্রিক ওয়্যার অ্যান্ড ক্যাবলস লিমিটেডকে অধিগ্রহণ করা এবং আধুনিকায়ন, উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি ও মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার জন্য প্রয়োজনীয় মূলধনী ব্যয়—উভয়ই অন্তর্ভুক্ত। আমরা এই মুহূর্তে সঠিক অঙ্কটা প্রকাশ করছি না, তবে এটি একটি বড় ধরনের দীর্ঘমেয়াদি প্রতিশ্রুতিরই অংশ।
প্রকল্পটি মূলত আকিজ-বশির গ্রুপের নিজস্ব অর্থায়নে পরিচালিত হচ্ছে, যা আমাদের শক্তিশালী আর্থিক ভিত্তি এবং এই খাতের প্রতি আমাদের আস্থার প্রতিফলন। পাশাপাশি, আমাদের সম্মানিত আর্থিক সহযোগী যমুনা ব্যাংক থেকেও আমরা সহায়তা পাচ্ছি।
শুরুতে আপনারা কতটুকু উৎপাদন সক্ষমতার লক্ষ্য ঠিক করেছেন এবং পরবর্তীতে তা কীভাবে বাড়ানো হবে?
প্রাথমিকভাবে, আমরা প্রায় ৩০০ টন কপার (তামা) ক্যাবল এবং ২০০ টন অ্যালুমিনিয়াম ক্যাবল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছি। কারখানাটি এমনভাবে নকশা করা হয়েছে যাতে ভবিষ্যতে ধাপে ধাপে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো যায়। অদূর ভবিষ্যতে দেশীয় ও সম্ভাব্য রপ্তানি বাজারে চাহিদা বাড়ার সাথে সাথে আমরা এটি প্রায় ৬০০ টন কপার এবং ৩০০ টন অ্যালুমিনিয়ামে উন্নীত করার লক্ষ্য রেখেছি।
এই উদ্যোগে এখন পর্যন্ত কত মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে?
কর্মসংস্থান সৃষ্টি আমাদের অবদানের একটি মূল অংশ। আকিজ-বশির ক্যাবলস এবং আমাদের তিন স্তরের ক্যাবল প্রযুক্তির যাত্রার শুরুর সাথে সাথে আমরা উৎপাদন, মান নিয়ন্ত্রণ, লজিস্টিকস এবং বিক্রয় বিভাগে ৭০০ জনেরও বেশি মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করেছি। এছাড়া আমাদের দেশব্যাপী বিস্তৃত ডিস্ট্রিবিউশন নেটওয়ার্কের মাধ্যমেও সারাদেশে পরোক্ষভাবে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থান হচ্ছে।
বর্তমান প্রতিযোগীদের থেকে আকিজ-বশির ক্যাবলস কীভাবে আলাদা?
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য হলো নিরাপত্তা ও মানের ওপর আমাদের বিশেষ গুরুত্ব। আকিজ-বশির ক্যাবলস বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো তিন স্তরের হাউজ ওয়্যারিং ক্যাবল নিয়ে আসছে, যা ইনসুলেশন প্রতিরোধ, স্থায়িত্ব এবং দীর্ঘমেয়াদি কার্যকারিতার ক্ষেত্রে এক নতুন মানদণ্ড স্থাপন করেছে। এই কাঠামো শর্ট সার্কিট এবং কারেন্ট লিকেজ-এর ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দেয় এবং ১০৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত তাপমাত্রা সহ্য করতে পারে—এমন সব বৈশিষ্ট্য স্থানীয় বাজারে সচরাচর পাওয়া যায় না।
আমরা মনে করি, বৈদ্যুতিক ওয়্যারিং বা তারের সংযোগের সাথে সম্পর্কিত অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি একটি গুরুতর উদ্বেগের বিষয়। যদিও প্রায়শই ক্যাবল বা তারকে দোষারোপ করা হয়, কিন্তু মূল সমস্যাটি থাকে কাঁচামালের বিশুদ্ধতা, উৎপাদনের মান এবং সঠিক ব্যবহারের ওপর। আমরা এলএমই অনুমোদিত সরবরাহকারীদের কাছ থেকে ৯৯ দশমিক ৯ শতাংশ বিশুদ্ধ কপারসংগ্রহ করি এবং নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে উচ্চমানের পিভিসি ব্যবহার করি। আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখতে আমরা পুরোপুরি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
উন্নত স্থানীয় উৎপাদন ব্যবস্থা কি বড় প্রকল্পগুলোর জন্য আমদানি করা ক্যাবলের ওপর নির্ভরতা কমাতে পারে?
প্রাথমিক পর্যায়ে আমাদের মনোযোগ রয়েছে গৃহস্থালি, শিল্প এবং যোগাযোগ খাতের ক্যাবলের ওপর, যার মধ্যে রয়েছে নগরায়নের সাথে সাথে বেড়ে চলা মাটির নিচে ব্যবহারযোগ্য (আন্ডারগ্রাউন্ড) ক্যাবল। মেগা প্রকল্পগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় আরও বিশেষায়িত ও উচ্চ-প্রযুক্তির ক্যাবলগুলো আমাদের দ্বিতীয় ধাপে আসবে। তবে, আমাদের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য স্পষ্টভাবে এটাই যে, উন্নত স্থানীয় উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে তোলার মাধ্যমে আমদানিনির্ভরতা কমানো।
গ্রাহকদের জন্য দাম সবসময়ই একটি চিন্তার বিষয়। আপনারা কীভাবে মান এবং সামর্থ্যের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখবেন?
উচ্চমানের কাঁচামালের দাম স্বাভাবিকভাবেই বেশি হয়। উদাহরণস্বরূপ, এলএমই অনুমোদিত সরবরাহকারীদের কাছ থেকে তামা সংগ্রহ করতে গেলে সনদবিহীন বিকল্পগুলোর তুলনায় ৩০-৪০ শতাংশ বেশি খরচ হতে পারে। কিন্তু এই বিশুদ্ধতা সরাসরি নিরাপত্তা এবং দীর্ঘস্থায়িত্বের ওপর প্রভাব ফেলে।
তবে আমরা বাজারের বাস্তব অবস্থা সম্পর্কে অত্যন্ত সচেতন। আমাদের মূল্য নির্ধারণের কৌশল প্রতিযোগিতামূলক থাকবে এবং মানের সঙ্গে আপস না করে বিদ্যমান পণ্যগুলোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে। আমরা বিশ্বাস করি, নিরাপত্তা ও নির্ভরযোগ্যতার জন্য গ্রাহকরা এখন ন্যায্য মূল্য দিতে আগের চেয়ে অনেক বেশি আগ্রহী।
আপনাদের যন্ত্রপাতি এবং কাঁচামাল কোথা থেকে সংগ্রহ করা হয়?
আমরা যে কারখানাটি অধিগ্রহণ করেছি, সেটি আগে থেকেই ইউরোপ, জার্মানি, চীন এবং ভারত থেকে আনা বিশ্বমানের যন্ত্রপাতি দিয়ে সুসজ্জিত ছিল। কাঁচামালের ক্ষেত্রে, তামা মূলত সিঙ্গাপুর থেকে সংগ্রহ করা হবে, আর পিভিসি আসবে চীন এবং আংশিকভাবে ভারত থেকে।
আপনাদের প্রাথমিক টার্গেট গ্রাহক কারা?
আমাদের প্রধান মনোযোগ এখন ডোমেস্টিক (গৃহস্থালি) ওয়্যারিংয়ের দিকে, এরপর রয়েছে শিল্প ও যোগাযোগ খাতের ক্যাবল। সাধারণ গ্রাহকদের মধ্যে আকিজ-বশির গ্রুপের ব্র্যান্ডের গ্রহণযোগ্যতা বেশ প্রবল, তাই আমরা মনে করি ডোমেস্টিক ক্যাবল দিয়েই শুরু করাটা স্বাভাবিক। ধীরে ধীরে আমরা উচ্চ-ভোল্টেজ এবং বিশেষায়িত ক্যাবলের সেগমেন্টে প্রবেশ করব।
