৩০০ কোটি টাকা বিনিয়োগে ক্যাবল বাজারে প্রবেশ করছে আকিজ–বশির গ্রুপ
৩০০ কোটি টাকার বেশি প্রাথমিক বিনিয়োগ নিয়ে দেশের দ্রুত সম্প্রসারণশীল ক্যাবল উৎপাদন বাজারে প্রবেশ করতে যাচ্ছে বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ বহুমুখী শিল্পগোষ্ঠী আকিজ বশির গ্রুপ।
আজ (৮ জানুয়ারি) ঢাকায় এক উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের মাধ্যমে গ্রুপটি আনুষ্ঠানিকভাবে এর বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু করবে। প্রাথমিকভাবে দেশীয় চাহিদা, শিল্প ও যোগাযোগ খাতে ব্যবহৃত ক্যাবল উৎপাদনে গুরুত্ব দেবে তারা। পরবর্তী ধাপে উচ্চ ভোল্টেজ ও বিশেষায়িত ক্যাবল উৎপাদনে যাওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে। শিল্প সংশ্লিষ্টদের মতে, আকিজ-বশিরের এই উদ্যোগ বর্তমানে প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকার বাজারে প্রতিযোগিতা আরও তীব্র করবে।
আকিজ বশির গ্রুপের চিফ অপারেটিং অফিসার খোরশেদ আলম টিবিএসকে বলেন, "আমাদের মোট ব্যবসার ৬০ শতাংশেরও বেশি আসে বিল্ডিং ম্যাটেরিয়ালস খাত থেকে। এই খাতকে আরও সম্প্রসারণ করাই আমাদের কৌশলগত লক্ষ্য, যাতে গ্রাহকরা একটি নির্ভরযোগ্য ব্র্যান্ড থেকেই নির্মাণ–সংক্রান্ত অধিকাংশ পণ্য সংগ্রহ করতে পারেন। এই সিদ্ধান্ত গ্রুপের বিল্ডিং ম্যাটেরিয়ালস পোর্টফোলিও আরও শক্তিশালী করার দীর্ঘমেয়াদি কৌশলের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ।"
কোম্পানি কর্মকর্তারা জানান, গ্রুপটি ইতোমধ্যে এমিনেন্স ক্যাবল সেন্ট্রাল ওয়েলের মালিকানাধীন প্রায় প্রস্তুত একটি ক্যাবল উৎপাদন কারখানা অধিগ্রহণ করেছে। কারখানাটিতে বিশ্বমানের লে-আউট ও যন্ত্রপাতি রয়েছে—যা চীন, ইউরোপ, জার্মানি ও ভারত থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে।
প্রাথমিকভাবে এই কারখানায় বছরে প্রায় ৩০০ টন কপার ক্যাবল ও ২০০ টন পিভিসি প্রক্রিয়াজাত করার সক্ষমতা থাকবে। প্রকল্পটি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৫০০ জনের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
আগামী এক বছরের মধ্যে কারখানার উৎপাদন সক্ষমতা দ্বিগুণ করার পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছে আকিজ বশির গ্রুপ—যা মূলত নির্ভর করবে বাজারের সাড়ার ওপর।
খোরশেদ আলম বলেন, গ্রুপটির বাজার গবেষণায় ক্যাবল শিল্পে কিছু কাঠামোগত দুর্বলতা উঠে এসেছে।
তিনি বলেন, "কিছু ক্ষেত্রে বাজারে একচেটিয়া প্রবণতা দেখা গেছে, যার ফলে অসম প্রতিযোগিতা তৈরি হচ্ছে এবং চ্যানেল পার্টনার ও ভোক্তাদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে। আবার কোথাও সক্ষমতা ও মানগত সীমাবদ্ধতার কারণে সরবরাহে ধারাবাহিকতা নেই—যা অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করছে।"
তিনি আরও বলেন, "এই শূন্যস্থানগুলো এমন একটি প্রতিষ্ঠানের জন্য সুযোগ তৈরি করেছে, যারা ধারাবাহিক সরবরাহ, প্রতিযোগিতামূলক মূল্য এবং আপসহীন মান নিশ্চিত করতে পারবে।"
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশে ক্যাবলের চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। নগরায়ণ, আবাসন প্রকল্প, শিল্প সম্প্রসারণের পাশাপাশি মেট্রোরেল, টানেল ও এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের মতো বড় অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প এ চাহিদা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে। শিল্প বিশ্লেষকদের মতে, স্বল্পমেয়াদি অর্থনৈতিক অস্থিরতা না থাকলে আগামী এক দশকে এ খাতে বার্ষিক ১০ থেকে ১৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হতে পারে।
শিল্প সংশ্লিষ্টদের মতে, দ্রুত বিদ্যুতায়ন ও অবকাঠামো উন্নয়নের ফলে গত এক দশকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ক্যাবল বাজার প্রায় ২,০০০ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ১২,০০০ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। বর্তমানে এ খাতে ১২০টিরও বেশি প্রতিষ্ঠান কার্যক্রম পরিচালনা করছে—যেখানে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কর্মসংস্থান হয়েছে ৫০ হাজারের বেশি মানুষের।
বাজারের শীর্ষে রয়েছে বিআরবি ক্যাবল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড; বাজারে তাদের অংশীদারত্ব ৩০ শতাংশের বেশি। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে বিজলি ক্যাবলস। এছাড়া আরআর ক্যাবলস, প্যারাডাইস ক্যাবলস ও ওয়ালটনও এই খাতের উল্লেখযোগ্য প্রতিষ্ঠান। তবে দেশে পর্যাপ্ত উৎপাদন সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও সরকারি বিভিন্ন প্রকল্পে এখনো ব্যাপকভাবে আমদানিকৃত ক্যাবল ব্যবহার করা হচ্ছে।
নিরাপত্তা ও উন্নত প্রযুক্তি
আকিজ বশির গ্রুপের ক্যাবল পণ্যের একটি বড় বৈশিষ্ট্য হবে নিরাপত্তা ও উন্নত ইনসুলেশন প্রযুক্তিতে জোর দেওয়া। প্রতিষ্ঠানটি তিন স্তরের ইনসুলেশনযুক্ত ক্যাবল বাজারে আনার পরিকল্পনা করেছে—যা দেশের বাজারে এখনো তুলনামূলকভাবে বিরল। এসব ক্যাবল বৈদ্যুতিক অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে সক্ষম হবে বলে দাবি করছে কোম্পানিটি।
খোরশেদ আলম বলেন, "দেশে বর্তমানে বাজারে থাকা বেশিরভাগ ক্যাবল দুই স্তরের ইনসুলেশনযুক্ত। আমরা তিন স্তরের ইনসুলেশন প্রযুক্তির ক্যাবল আনছি—যা সর্বোচ্চ ১০৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা সহ্য করতে পারে।"
তিনি বলেন, "এই মাত্রার নিরাপত্তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বাংলাদেশের নগর এলাকায় সংঘটিত অগ্নিকাণ্ডের বড় একটি অংশই বৈদ্যুতিক ত্রুটিজনিত কারণে হয়ে থাকে।"
কোম্পানি সূত্রে জানা যায়, ক্যাবল উৎপাদনে ব্যবহৃত কপার লন্ডন মেটাল এক্সচেঞ্জ অনুমোদিত সরবরাহকারীদের কাছ থেকে সংগ্রহ করা হবে, যাতে ৯৯ দশমিক ৯ শতাংশ বিশুদ্ধতা নিশ্চিত করা যায়। পিভিসি ও অন্যান্য কাঁচামালও যাচাইকৃত আন্তর্জাতিক উৎস থেকে সংগ্রহ করা হবে বলে জানা গেছে।
খোরশেদ আলম আরও বলেন, "পণ্যের মান শুরু হয় কাঁচামাল থেকে। বেশি খরচ হলেও আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখতে আমরা সম্পূর্ণ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।"
তবে উন্নতমানের কাঁচামাল ব্যবহারে উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও মূল্য নির্ধারণে বাজার বাস্তবতাকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানিয়েছে আকিজ বশির গ্রুপ।
খোরশেদ আলম বলেন, "আমরা এমন মূল্য নির্ধারণ করব না, যা ভোক্তাদের নাগালের বাইরে চলে যায়। এই বাজার অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক, তাই গুণগত মানে কোনো আপস না করেই বিদ্যমান পণ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ক্যাবলের দাম নির্ধারণ করা হবে।"
শিল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মূল্য প্রতিযোগিতার কারণে অনেক ক্ষেত্রে কিছু উৎপাদক কাঁচামালের মানে আপস করে থাকেন—যা নিরাপত্তার ক্ষেত্রে ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। এই বাস্তবতায় খরচ নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে গুণগত মানের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করাই আকিজ বশির গ্রুপের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে।
ফাস্ট–মুভিং কনজিউমার গুডস, লজিস্টিকস ও বিল্ডিং ম্যাটেরিয়ালস খাতে আকিজ বশির গ্রুপের কার্যক্রম বিস্তৃত রয়েছে। স্টিল, টাইলস, স্যানিটারি ওয়্যার ও বোর্ডের সমন্বয়ে গঠিত বিল্ডিং ম্যাটেরিয়ালস বিভাগটি বর্তমানে এই গ্রুপের প্রবৃদ্ধির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি।
