জাতীয় নির্বাচনের আগে এআই কনটেন্ট দিয়ে যেভাবে বিভ্রান্ত করা হচ্ছে জনমত
কপালে সিঁদুর পরা এক নারীকে প্রশ্ন করছেন এক উপস্থাপিকা, 'দিদি, এবার ভোটটা কাকে দেবেন?' নারী উত্তর দিলেন, 'সব দলকেই তো দেখলাম, এবার জামায়াতকে একটা সুযোগ দেওয়া উচিত।'
দৃশ্যপট বদলায়। এবার এক গার্মেন্টস কর্মীকে কাজ করতে করতে কথা বলতে দেখা যায়। তিনি বলেন, 'আমার কষ্টের কোনো দাম নেই। আমি সম্মানের সঙ্গে বাঁচতে চাই। তাই আমার ভোট জামায়াতকে।' এরপর খোলা মাঠে বসে থাকা একদল তরুণী। তারা সমস্বরে বলে উঠল, 'সব দল দেখেছি। এবার আমি ভোট দেব জামায়াতের দাঁড়িপাল্লায়।' বাকিরা সায় দিয়ে বলল, 'হ্যাঁ, ঠিক তাই।'
কিন্তু এর মধ্যে একটা বড় ফাঁকি আছে। এই ভিডিওর কোনো চরিত্রই রক্ত-মাংসের মানুষ নয়। সবটাই তৈরি করা হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দিয়ে।
শুধু ভিডিও নয়, সোশ্যাল মিডিয়ায় এখন এআই দিয়ে তৈরি ছবির ছড়াছড়ি। ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েম আর হাদি গুলিতে সন্দেহভাজন ফয়সাল করিম মাসুদের চা খাওয়ার একটি ছবি ফেসবুকে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী এক সমাবেশে এই ছবির প্রসঙ্গ টেনে কথা বলেন, যদিও পরে তিনি এর জন্য ক্ষমা চান।
আবার তারেক রহমান স্ত্রী ও কন্যাসহ খালেদা জিয়ার হাসপাতালের শয্যাপাশে দাঁড়িয়ে আছেন—এমন একটি ছবিও ভাইরাল হয়েছে। এটিও ছিল এআইয়ের কারসাজি।
এসব কেবল হিমশৈলের চূড়ামাত্র। ভুল তথ্যের এই জগত দিন দিন আরও নিখুঁত ও জটিল হচ্ছে। ছদ্মবেশ, বানোয়াট টকশো এবং এডিট করা বক্তৃতার মাধ্যমে ভোটারদের লক্ষ্যবস্তু বানানো হচ্ছে। উদ্দেশ্য পরিষ্কার—নির্বাচনের আগে উত্তপ্ত রাজনৈতিক পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে জনমতকে বিভ্রান্ত করা। বিশ্বের অনেক দেশে ভুয়া ভিডিও রাজনীতির মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে।
শিল্পের পর্যায়ে ভুয়া কন্টেন্ট
আগেও ভুয়া ভিডিওর অস্তিত্ব ছিল। কিন্তু ৫ আগস্টের পর পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। ডিসমিসল্যাবের সাম্প্রতিক তদন্তে ইউটিউবে ভুয়া ভিডিওর এক বিশাল নেটওয়ার্কের সন্ধান মিলেছে। এগুলো শুধু রাজনৈতিক নয়, ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যও হাসিল করছে। প্রায় ৯০ শতাংশ ভিডিওতে বিজ্ঞাপন দেখানো হচ্ছে। প্রতিটি ভিডিও গড়ে ১২ হাজার ভিউ পাচ্ছে এবং ইউটিউবের নিয়মকানুন অমান্য করছে।
রিউমার স্ক্যানারের তথ্যমতে, ২০২৫ সালের জুলাই মাসে ৩১০টি ভুল তথ্যের ঘটনা শনাক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৮৪টিই (৫৯%) রাজনৈতিক। এসবের বড় একটি অংশ ভিডিও এবং এআই দিয়ে তৈরি। আগস্ট মাসে এমন ঘটনা ছিল ৩২০টি এবং সেপ্টেম্বরে ৩২৯টি।
জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে ৭১টি এআই জেনারেটেড পোস্ট বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এর মধ্যে ৫৭টিই ভিডিও। অর্থাৎ রাজনৈতিক প্রচারণায় ভিডিওই এখন প্রধান হাতিয়ার। আর এসব প্রচারের ৮৬ শতাংশই হচ্ছে ফেসবুকে।
কৃত্রিম চরিত্র ও জনমতের বিভ্রম
ভিডিও বা ছবি দেখলে মানুষ চট করে বিশ্বাস করে ফেলে। বাংলাদেশের মতো দেশে যেখানে ডিজিটাল সাক্ষরতা কম, সেখানে এটি এক শক্তিশালী রাজনৈতিক অস্ত্র। সরকারও এ বিষয়ে জানে।
বাংলাদেশে এআইয়ের এক বিপজ্জনক ব্যবহার হলো 'সিন্থেটিক পারসোনা' বা কৃত্রিম চরিত্র তৈরি। জেনারেটিভ এআই ব্যবহার করে 'সাধারণ নাগরিকের' প্রোফাইল ছবি বানানো হচ্ছে। ছবিতে মুখের ছোটখাটো দাগ, দেশীয় পোশাক বা ঘরের আবহ—সবই থাকছে নিখুঁতভাবে। এসব ভুয়া প্রোফাইল থেকে রাজনৈতিক আলোচনা করা হচ্ছে, নির্দিষ্ট দলের গুণগান গাওয়া হচ্ছে।
যখন শত শত ভুয়া প্রোফাইল এক সুরে কথা বলে, তখন সাধারণ মানুষের মনে হয়—এটাই বুঝি দেশের মানুষের মত। একে বলা হয় 'নির্মিত সংখ্যাগরিষ্ঠতা'। বাংলাদেশের মেরুকরণকৃত রাজনীতিতে এটি মারাত্মক প্রভাব ফেলছে।
ইউল্যাবের সমাজবিজ্ঞান অনুষদের ডিন ও মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগের প্রধান সুমন রহমান বলেন, 'আমরা অনেক আগেই আশঙ্কা করেছিলাম যে এআই ভুল তথ্য ছড়াতে বড় ভূমিকা রাখবে। এখন ঠিক তা-ই হচ্ছে। তাই এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই।'
ফ্যাক্টওয়াচের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক সুমন রহমান আরও বলেন, 'ভাবুন নির্বাচনের দিন সকালে যদি এমন কোনো এআই ভিডিও হঠাৎ সামনে আসে! একজন মানুষ মিডিয়া বোঝেন কি না, সেটা বড় কথা নয়; এমন কনটেন্ট যে কাউকেই বিভ্রান্ত করতে পারে। টাইমিং বা সময়টা এখানে খুব গুরুত্বপূর্ণ। সঠিক সময়ে ছাড়তে পারলে আমাদের মনের বিশ্বাসকেই তা উসকে দেবে।'
তিনি যোগ করেন, 'আমরা ফ্যাক্ট-চেক করতে গিয়েও বিভ্রান্ত হয়ে পড়ি। শেষ পর্যন্ত এই ধরনের কনটেন্ট মানুষকে ভুল পথে চালিত করবে। আমাদের মিডিয়া সাক্ষরতা এমনিতেই কম, তার ওপর এআই আগুনে ঘি ঢালছে।'
ডিসমিসল্যাবের প্রধান গবেষক মিনহাজ আমান বলেন, 'নির্বাচন যত কাছে আসবে, সোশ্যাল মিডিয়ায় ভুয়া কনটেন্টের জোয়ার আসবে। ভারত ও আমেরিকার মতো দেশেও তথ্য মানুষের কেনাকাটা থেকে শুরু করে ভোট দেওয়ার সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে। আমাদের দেশে গতানুগতিক সংবাদমাধ্যম সোশ্যাল মিডিয়ার গতির সঙ্গে পেরে উঠছে না। তাই ভুয়া টকশো ভোটারদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলবে।'
আমরা ফ্যাক্ট-চেক করতে গিয়েও বিভ্রান্ত হয়ে পড়ি। শেষ পর্যন্ত এই ধরনের কনটেন্ট মানুষকে ভুল পথে চালিত করবে। আমাদের মিডিয়া সাক্ষরতা এমনিতেই কম, তার ওপর এআই আগুনে ঘি ঢালছে।
টেক গ্লোবাল ইনস্টিটিউটের রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট আপন দাস বলেন, 'নেতারা যা বলেননি বা করেননি, এআই দিয়ে তা বানিয়ে প্রচার করা হচ্ছে। এগুলো ভুয়া দাবি ছড়ায় এবং ভয় বা বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে। অনেক সময় ধর্মীয় বা জাতিগত উসকানি দিতেও এগুলো ব্যবহার করা হয়। খবরের ফরম্যাটে পরিবেশন করলে মানুষ তা সহজেই বিশ্বাস করে।'
প্রসঙ্গ বা কনটেক্সট-এর গবেষণায় দেখা গেছে, তরুণ গণতন্ত্রে সস্তা এডিট বা 'চিপফেক' বেশ বিপজ্জনক। বাংলাদেশে নতুন ভোটাররাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে।
মিনহাজ আমান বলেন, 'রাজনৈতিক দলগুলোর সরাসরি নিয়ন্ত্রণ কম, তবে তাদের স্বচ্ছতা বাড়াতে হবে। দলের তথ্য যত সহজলভ্য হবে, মিথ্যা ছড়ানো তত কঠিন হবে।'
করণীয় কী?
নির্বাচন কমিশন (ইসি) ঘোষণা দিয়েছে, আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে এআইয়ের অপব্যবহার রোধে তারা কর্মপরিকল্পনা তৈরি করবে এবং সমন্বিত সেল গঠন করবে। তবে সমস্যার ব্যাপকতা তাদের একার পক্ষে সামলানো কঠিন হতে পারে।
সুমন রহমান বলেন, 'যদি সত্যিই কোনো নিয়মতান্ত্রিক প্রচারণা না থাকে এবং মিডিয়া যদি সক্রিয় ভূমিকা না রাখে, তবে আমাদের বড় মাশুল দিতে হবে। নির্বাচন কমিশন বিধিমালার কথা বলছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, বর্তমান প্রশাসন ও পরিস্থিতিতে এসব বিধি কি আদৌ কার্যকর করা সম্ভব?'
তিনি আরও বলেন, 'এখন পর্যন্ত এসব কেবল আশার বাণী মনে হচ্ছে। নির্বাচন কমিশন কি আসলেই এই সমস্যার গভীরতা বোঝে? এআই দিয়ে তৈরি প্রচারণা ঠেকানোর মতো কোনো কমিটি বা দপ্তর কি আমরা দেখেছি? এগুলো শুধুই মৌখিক আশ্বাস। মিডিয়া ও ফ্যাক্ট-চেকিং সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে আলাদা ইউনিট না করলে কোনো লাভ হবে না।'
মিনহাজ আমান সমাধানের বিষয়ে বলেন, 'আইন দিয়ে ভুল তথ্য ঠেকানো কঠিন। এতে আইনের অপব্যবহারের ঝুঁকি থাকে। একাডেমিয়া ও সুশীল সমাজকে নিয়ে মিডিয়া সাক্ষরতা বাড়াতে হবে। শুধু আইনের ওপর নির্ভর করা যথেষ্ট নয়।'
বাংলাদেশে যা ঘটছে তা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে এআই কীভাবে তথ্যপ্রবাহকে বদলে দিচ্ছে, এটি তারই আগাম চিত্র। এআই দিয়ে তৈরি এই বিপুল পরিমাণ মিথ্যা তথ্য প্রমাণ করছে, চ্যালেঞ্জটা এখন আর দু-একটি মিথ্যা খবরের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বরং এটি এখন 'বিকল্প বাস্তবতা' তৈরির কারখানায় পরিণত হয়েছে—যা প্রতিদিন দেখা হচ্ছে এবং সত্য থেকে আলাদা করা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।
