এনসিপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটি নিয়ে দলের ভেতরে অসন্তোষ
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নবগঠিত কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটি নিয়ে দলটির অভ্যন্তরে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। একাধিক কেন্দ্রীয় নেতা এই কমিটি নিয়ে তাদের ক্ষোভ ও আপত্তির কথা জানিয়েছেন। গত শনিবার (১০ জানুয়ারি) এই কমিটি পুনর্গঠন করা হয়, যেখানে উপদেষ্টা পরিষদ থেকে পদত্যাগ করে আসা আসিফ মাহমুদকে চেয়ারম্যান এবং যুগ্ম আহ্বায়ক মনিরা শারমীনকে সেক্রেটারি হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
এনসিপির একাধিক কেন্দ্রীয় নেতা দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে জানান, মনিরা শারমীন কিছুদিন আগেও প্রকাশ্যে দলের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে এবং নির্বাচনী জোটের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। এমন একজন ব্যক্তিকেই আবার নির্বাচনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তারা অভিযোগ করেন, তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত যারা দলের জন্য কঠোর পরিশ্রম করছেন, তারা 'নির্দিষ্ট কোরাম ভিত্তিক রাজনীতি'র কারণে যথাযথ মূল্যায়ন পাচ্ছেন না।
জানা গেছে, গত শুক্রবার (৯ জানুয়ারি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম ও সদস্য সচিব আখতার হোসেন স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে ৩১ সদস্যের এই 'কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটি' পুনর্গঠন করা হয়। এই কমিটির লক্ষ্য হিসেবে সার্বিক প্রস্তুতি ও পরিকল্পনা, মাঠ পর্যায়ে সমন্বয়, আইনি ও প্রশাসনিক কার্যক্রম, মিডিয়া ও প্রচারণা এবং গণভোটে 'হ্যাঁ' ভোটের পক্ষে কাজ করার কথা জানানো হয়েছে।
এর আগে, গত ২৮ ডিসেম্বর মনিরা শারমীন এক ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেছিলেন, 'নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের আকাঙ্ক্ষায় গড়া দল জাতীয় নাগরিক পার্টি গণ-অভ্যুত্থানপরবর্তী একমাত্র মধ্যপন্থি রাজনীতির ভরসাস্থল ছিল। এই দল থেকে ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে নওগাঁ-৫ থেকে আমি মনোনীত প্রার্থী। তবে মনোনয়ন পাওয়ার আগে আমি জানতাম না, এই দল জামায়াতের সঙ্গে ৩০ সিটের আসন সমঝোতা করবে। আমি জানতাম, ৩০০ আসনে প্রার্থী দিয়ে একক নির্বাচনের সিদ্ধান্ত ছিল।'
তিনি আরও লেখেন, 'যেহেতু এখন দলের পজিশন পরিবর্তন হয়েছে, তাই আমি নিজেকে নির্বাচন থেকে প্রত্যাহার করছি। নির্বাচনে আমি অংশগ্রহণ করছি না। আমি এনসিপির স্বতন্ত্র শক্তিতে বিশ্বাসী। দলের প্রতি আমার কমিটমেন্ট আমি ভাঙিনি। কিন্তু এই মুহূর্তে দলের প্রতি কমিটমেন্টের চেয়ে আমার গণ-অভ্যুত্থানের প্রতি কমিটমেন্ট ও দেশের মানুষের প্রতি কমিটমেন্ট বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে।'
মনিরা শারমীনকে এই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে দলের আরেকজন নারী নেত্রী দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, 'এটা স্পষ্টত দ্বিচারিতা। যে ব্যক্তি নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন, তিনি কীভাবে নির্বাচন পরিচালনা কমিটিতে থাকেন? মূলত মুষ্টিমেয় কয়েকজনের হাতে দলের কর্তৃত্ব কুক্ষিগত রয়েছে। তারা ঘুরেফিরে নিজেদের আপনজনদেরই দায়িত্ব দেন। আমরা দলকে ধারণ করলেও তারা সেটা মনে করেন না৷'
এদিকে কমিটি পুনর্গঠনের পর থেকেই দলটির অভ্যন্তরীণ হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে কেন্দ্রীয় নেতারা তাদের ক্ষোভ প্রকাশ করছেন।
কার্যনির্বাহী কমিটির এক সদস্য সেখানে লিখেছেন, 'এমন দল করেন, যে দলের স্থায়ী কমিটির লোক পদত্যাগ করে। স্থায়ী কমিটির লোক টকশোতে গিয়ে দলের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। যারা অবস্থান নেয় তারাই আবার বড় পোস্ট পায়। এই দলের দুই নেতার ওপর শান্তি বর্ষিত হোক।'
এর প্রতিক্রিয়ায় কমিটির সদস্য এক নেতা লিখেছেন, 'কঠিনভাবে একমত পোষণ করছি। যারা নির্বাচনের সাথে নেই বলে মিডিয়ায় বলে বেড়াচ্ছে, তারাই বড় বড় পোস্ট নিয়ে নির্বাচন নিয়ে মাঠে নামবে। এভাবেই একটা দল ক্লাবে পরিণত হচ্ছে।'
একই গ্রুপে অপর এক নারী নেত্রী লিখেছেন, 'দুই নেতা বললেন শুধু ভাই, নেতাদের ওপর ছড়ি ঘুরানো নেত্রীদের ক্ষমতার দৌঁড়ের কাছে দলের সবাই যে কচু এটা বললেন না। দলের নেতাদের খুব করে ব্ল্যাকমেইল করতে হবে, খুব চিবায় চিবায় মিডিয়ায়, সোশাল মিডিয়ায় দলকে কটাক্ষ করতে হবে, তাহলেই দখলদারি, খবরদারির জায়গা ঠিক থাকবে। এগুলা আগে থেকে না বলে দল করতে আনছেন আমাদের, এটা ঠিক হয় নাই।'
নির্বাচন পরিচালনা কমিটির আরেক সদস্যের আক্ষেপ, 'ভাইরে, কার কথা কে বলবে? প্রথমে দল গোছানো, এলাকা গোছানো—এসব বলে সেন্ট্রাল থেকে সরায় দিল। পরে নির্বাচন করার প্রস্তুতি নিয়ে এলাকা গোছানো শুরু করার পর দল নমিনেশন দেয় না। আমাকে বলে আপনার চেয়ে বেটার প্রার্থী খোঁজা হচ্ছে, না পেলে আপনাকে দিব। নিজের যতটুকু ছিল সবটুকু ঢেলেছি। পরে শুনি আমি নাকি কারো কোরামের না, এজন্য নির্বাচনে সিট নাই।'
তিনি আরও লেখেন, 'দল হয়ে গেছে দু-একজন ব্যক্তির, দল আমাদের ওন করে না। আমার সমস্যা আমাকেই হ্যান্ডেল করতে হয়। দলের যারা বিভিন্ন পর্যায়ে আছেন, একজন আরেকজনকে দলীয় বিষয়ে কথা বলতে ভয় পান। না জানি কে কোথায় কোন ফোরামে লাগাইয়া মাইনাস করে। দল হইছে কয়েকজন ব্যক্তির, এর বাইরে আমরা সব হনু।'
অভ্যন্তরীণ এই অসন্তোষের বিষয়ে জানতে চাইলে মনিরা শারমিন দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, 'আমার দলের সিদ্ধান্তের সমালোচনা কি আমি করতে পারব না? যে সিদ্ধান্তটা আমার ২৭০টা আসনে তৃণমূলের যারা মনোনয়ন পেতে পারত তাদেরকে হতাশ করছে না? আমি মিডিয়া ফেস করি, সেজন্য হয়তো পাবলিকলি বলতে হয়েছে আমাকে। আমি নিজেও প্রার্থীপদ প্রত্যাহার করেছি, সেটার জন্য প্রকাশ্যে বলতে হয়েছে। আপনার ধারণাও নেই আমাদের কেন্দ্রীয় নেতা অনেকেই এটার বিরুদ্ধে।'
তিনি আরও যোগ করেন, 'সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে যদি আমি সমালোচনাই করতে না পারি—আর এটি তো সত্য। শুধু জামায়াতের সাথে জোট করে যদি এনসিপির নেতাদের সংসদে যাওয়াই একমাত্র লক্ষ্য হয়, তাহলে সাধারণ মানুষের জন্য এটা খুব পজিটিভ ব্যাপার না। এটা আমাদের লক্ষ্যও না, এটা আমি মনে করি।'
দায়িত্ব পালনের বিষয়ে তিনি বলেন, 'এই দায়িত্ব নেওয়া আমার কোনো দ্বিচারিতা না। আমার কাজের মূল ফোকাস থাকবে গণভোট নিয়ে। গণভোটে 'হ্যাঁ' কে জয়যুক্ত করতে ২৭০ আসনে অ্যাম্বাসেডর নিয়োগ দেওয়া ও প্রচার-প্রচারণার দায়িত্ব পালন করব।'
উল্লেখ্য, গত ৩ নভেম্বর দলের মূখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকে প্রধান এবং সিনিয়র যুগ্ম সদস্য সচিব ডা. তাসনিম জারাকে সদস্য সচিব করে প্রথম কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটি গঠন করা হয়েছিল। পরে তাসনিম জারা দল থেকে পদত্যাগ করেন। এরই মধ্যে আসিফ মাহমুদ দলে যোগ দেন।
পুনর্গঠিত কমিটির অন্য ২৯ জন সদস্য হলেন— ব্যারিস্টার ওমর ফারুক, নুসরাত তাবাসসুম জ্যোতি, তানজিল মাহমুদ, অ্যাড. জহিরুল ইসলাম মুসা, অ্যাড. হুমায়রা নূর, আকরাম হুসাইন, আলাউদ্দীন মোহাম্মদ, মোহাম্মদ মিরাজ মিয়া, লুৎফর রহমান, সাগুফতা বুশরা মিশমা, ফয়সাল মাহমুদ শান্ত, তাহসীন রিয়াজ, লে. কর্নেল (অব.) মো. সাব্বির রহমান, সাদিয়া ফারজানা দিনা, ফরহাদ সোহেল, আবু সায়েদ লিয়ন, হামযা ইবনে মাহবুব, রাসেল আহমেদ, মেজবাহ উদ্দীন, মো. শওকত আলী, মাজহারুল ফকির, আবু বাকের মজুমদার, অ্যাডভোকেট সাকিল আহমাদ, সাইফ ইবনে সারোয়ার, কৈলাশ চন্দ্র রবিদাস, নাভিদ নওরোজ শাহ্, সরদার আমিরুল ইসলাম সাগর, ইয়াসির আহমেদ ও আয়মান রাহাত।
