কোটিপতি হয়েও ধার ও দানের টাকায় ভোটে চট্টগ্রামের ২৬ প্রার্থী
নির্বাচন কমিশনে দাখিল করা হলফনামার তথ্যানুসারে, চট্টগ্রামে ১৬টি সংসদীয় আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী ৩৩ জন প্রার্থীর মধ্যে ২৬ জনই নির্বাচনি ব্যয় মেটাবেন ধার কিংবা দানের টাকায়।
এই প্রার্থীদের অনেকেই কোটিপতি। তবু স্ত্রী, সন্তান, ভাই, জামাতা কিংবা শুভাকাঙ্ক্ষীর কাছ থেকে অর্থ সহায়তা নিয়ে ভোটের মাঠে নামছেন তারা।
হলফনামায় দেওয়া এসব তথ্য প্রশ্ন তুলেছে নির্বাচনি ব্যয়ের স্বচ্ছতা ও ভবিষ্যৎ দায়বদ্ধতা নিয়ে।
সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণ চট্টগ্রাম-৪ (সীতাকুণ্ড) আসনের বিএনপির প্রার্থী আসলাম চৌধুরী। তার ঘোষিত সম্পদের পরিমাণ ৪৫৭ কোটি টাকা। তবু নির্বাচনি ব্যয় মেটাতে তিনি স্ত্রী জামিলা নাজনীল মাওলার কাছ থেকে ৫ লাখ টাকা ধার নিচ্ছেন এবং মেয়ে মেহরীন আনহার উজমার কাছ থেকে নিচ্ছেন ২ লাখ টাকা দান।
একই পথে হাঁটছেন চট্টগ্রাম নগরে জামায়াতের সবচেয়ে ধনাঢ্য প্রার্থী একেএম ফজলুল হক। চট্টগ্রাম-৯ (কোতোয়ালি, বাকলিয়া) আসনের এই প্রার্থী প্রায় ৮ কোটি টাকার সম্পদের মালিক হয়েও নির্বাচনি খরচের জন্য স্ত্রী আমেনা শাহীনের কাছ থেকে ২০ লাখ টাকা ধার নেবেন।
পরিবারের সহায়তার ওপরও নির্ভর করছেন বিএনপির প্রার্থীরা
চট্টগ্রাম-১ (মিরসরাই) আসনে বিএনপির প্রার্থী নুরুল আমিনের সম্পদ ১.৪৯ কোটি টাকার। তিনি জামাতা সোহেব সরওয়ারের কাছ থেকে ২০ লাখ টাকা ধার নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। চট্টগ্রাম-৬ (রাউজান) আসনের প্রার্থী গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরীর সম্পদ ২৬ কোটি টাকা। তবু তিনি নির্বাচনি ব্যয়ের জন্য স্বজনের কাছ থেকে ২৫ লাখ টাকা দান নেবেন।
চট্টগ্রাম-৭ (রাঙ্গুনিয়া) আসনের প্রার্থী হুম্মাম কাদের চৌধুরীর সম্পদের পরিমাণ ৮১.৯ লাখ টাকা। নির্বাচনি ব্যয় মেটাতে তিনি মা, ভাই ও স্ত্রীর কাছ থেকে ১০ লাখ করে মোট ৩০ লাখ টাকা দান নেবেন। চট্টগ্রাম-৮ (বোয়ালখালী-চান্দগাঁও) আসনের প্রার্থী এরশাদ উল্লাহর সম্পদ ২৪ কোটি টাকা। তিনি স্ত্রীর কাছ থেকে ৫ লাখ টাকা দান নেবেন।
চট্টগ্রাম-১১ (বন্দর-পতেঙ্গা) আসনে বিএনপির প্রার্থী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সম্পদ ১৫ কোটি টাকা। তবু তিনি স্ত্রী তাহেরা আলমের কাছ থেকে ১০ লাখ টাকা ধার নিচ্ছেন। চট্টগ্রাম-১৩ (আনোয়ারা) আসনের সরওয়ার জামাল নিজামের সম্পদ ৬.৪ কোটি টাকা। তিনি স্ত্রী ও দুই ছেলের কাছ থেকে ৯ লাখ টাকা দান নেবেন।
চট্টগ্রাম-১৫ (সাতকানিয়া-লোহাগাড়া) আসনের প্রার্থী নাজমুল মোস্তফা আমীনের সম্পদ ৩ কোটি টাকা। তিনি স্ত্রী ও ছেলের কাছ থেকে ৩৫ লাখ টাকা দান নেবেন। চট্টগ্রাম-১৬ (বাঁশখালী) আসনের প্রার্থী মিশকাতুল ইসলাম সাড়ে ১৩ কোটি টাকার মালিক। নির্বাচনি ব্যয়ের জন্য তার স্ত্রী আনিলা ইসলাম চৌধুরী দান করবেন ১৫ লাখ টাকা।
জামায়াত ও মিত্রদের প্রার্থীরা সম্পূর্ণ ধার-দাননির্ভর
নির্বাচনি ব্যয় মেটাতে ধার-দান নেওয়ার প্রবণতা জামায়াত প্রার্থীদের মধ্যে আরও বেশি। চট্টগ্রাম-১ আসনের প্রার্থী মোহাম্মদ ছাইফুর রহমানের সম্পদ ৫১.৭ লাখ টাকা। তিনি ভাই, ভগ্নিপতি ও শুভাকাঙ্ক্ষীর কাছ থেকে ১৪ লাখ টাকা ধার ও দান নেবেন। চট্টগ্রাম-২ আসনের মোহাম্মদ নুরুল আমিনের সম্পদ ২৭.৫ লাখ টাকা। তিনি স্ত্রী, মেয়ে ও তিন শুভাকাঙ্ক্ষীর কাছ থেকে ২২ লাখ টাকা দান নেবেন।
চট্টগ্রাম-৩ আসনের প্রার্থী মুহাম্মদ আলাউদ্দীন সিকদারের সম্পদ ১.৬৬ কোটি টাকা। তিনি নিজে খরচ করবেন ৫ লাখ টাকা, বাকি ১৯ লাখ টাকা আসবে ভাই, ভগ্নিপতি ও শুভাকাঙ্ক্ষীর কাছ থেকে। চট্টগ্রাম-৪ আসনের আনোয়ার ছিদ্দিকের সম্পদ ৪৩ লাখ টাকা। তিনি ভাই, শ্বশুর ও শুভাকাঙ্ক্ষীর কাছ থেকে ২০ লাখ টাকা ধার ও দান নেবেন।
চট্টগ্রাম-৫ আসনে খেলাফত মজলিসের প্রার্থী মো. নাসির উদ্দিনের সম্পদ ৮৫.৯৫ লাখ টাকা। তিনি ভাইয়ের কাছ থেকে দান এবং চাচাতো ভাই ও আরেকজনের কাছ থেকে ধার নেবেন। চট্টগ্রাম-৬ আসনের প্রার্থী শাহজাহান মঞ্জু ভায়রা ও শুভাকাঙ্ক্ষীর কাছ থেকে ২৫ লাখ টাকা দান নেবেন।
চট্টগ্রাম-৭ আসনের প্রার্থী এটিএম রেজাউল করিম পাবেন ২০ লাখ টাকা দান। তার সম্পদ ৪.৭ কোটি টাকা। চট্টগ্রাম-৮ আসনের প্রার্থী আবু নাছের ভাই ও সম্বন্ধীর কাছ থেকে ৭ লাখ টাকা দান নেবেন। তার সম্পদ ২.৫৯ কোটি টাকা। চট্টগ্রাম-১০ আসনের শামসুজ্জামান হেলালী স্ত্রী, ভাই, ভগ্নিপতি ও শুভাকাঙ্ক্ষীর কাছ থেকে ৩৩ লাখ টাকা ধার ও দান নেবেন।
চট্টগ্রাম-১১ আসনের প্রার্থী শফিউল আলম তার ভাই, শাশুড়ি ও শুভাকাঙ্ক্ষীর কাছ থেকে ৩৯ লাখ টাকা ধার-দান নেবেন। চট্টগ্রাম-১৩ আসনের প্রার্থী মাহমুদুল হাসান তার ভাই ও আত্মীয়দের কাছ থেকে ১০ লাখ টাকা দান নেবেন।
চট্টগ্রাম-১৪ আসনে জামায়াতের শরিক জোট এলডিপির প্রার্থী ওমর ফারুক স্ত্রীর কাছ থেকে ৫ লাখ টাকা দান নেবেন। তার সম্পদ ৩.৩৮ কোটি টাকা।
চট্টগ্রাম-১৫ আসনে জামায়াতের প্রার্থী শাহজাহান চৌধুরী পাবেন ৪০ লাখ টাকা দান। আর চট্টগ্রাম-১৬ আসনের প্রার্থী মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম পাবেন ২৫ লাখ টাকা দান।
নিজের টাকায় নির্বাচন করবেন মাত্র ৭ জন
হলফনামা বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মাত্র সাতজন প্রার্থী—বেশিরভাগই বিএনপির—নিজেদের ব্যবসা, পেশা বা সঞ্চিত অর্থ দিয়েই ভোটের খরচ চালাবেন। তারা হলেন চট্টগ্রাম-১০ (হালিশহর-ডবলমুরিং-পাহাড়তলী) আসনে সাঈদ আল নোমান, চট্টগ্রাম-২ (ফটিকছড়ি) আসনে সরোয়ার আলমগীর, চট্টগ্রাম-৩ (সন্দ্বীপ) আসনে মোস্তফা কামাল পাশা, চট্টগ্রাম-৫ (হাটহাজারী) আসনে ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন, চট্টগ্রাম-৬ (রাউজান) আসনে গোলাম আকবর খোন্দকার, চট্টগ্রাম-৯ (কোতোয়ালি-বাকলিয়া) আসনে আবু সুফিয়ান ও চট্টগ্রাম-১৪ (চন্দনাইশ) আসনে জসীম উদ্দীন আহমেদ।
