আপিলের প্রথম ধাপে অধিকাংশ প্রার্থীর মনোনয়ন পুনর্বহাল
আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মনোনয়নপত্র বাতিল হওয়ার পর আপিল করে স্বতন্ত্র প্রার্থী তাসনিম জারা, জামায়াতে ইসলামীর নেতা এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ এবং জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা)-র মুখপাত্র রাশেদ প্রধানসহ ৫১ জন প্রার্থিতা ফিরে পেয়েছেন। তাদের মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)।
এর আগে রিটার্নিং কর্মকর্তারা তাদের মনোনয়নপত্র বাতিল করেছিলেন। পরে প্রার্থীরা ইসিতে আপিল করলে তা গ্রহণ করা হয়।
আসন্ন ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে মনোনয়নপত্র গ্রহণ ও বাতিল সংক্রান্ত রিটার্নিং কর্মকর্তাদের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে করা আপিলের শুনানি শনিবার (১০ জানুয়ারি) শুরু করে নির্বাচন কমিশন।
প্রথম ধাপে শনিবার নির্বাচন কমিশন ৭০ জন প্রার্থীকে ডাকে। এর মধ্যে ৫১ জনের মনোনয়ন পুনর্বহাল করা হয়েছে, ১৬ জনের আপিল খারিজ করা হয়েছে এবং তিনজনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত মুলতবি রাখা হয়েছে।
ঢাকা-৯
ঢাকা-৯ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী তাসনিম জারার মনোনয়নটি প্রাথমিক যাচাই-বাছাইয়ে এক শতাংশ ভোটারের স্বাক্ষর সংক্রান্ত জটিলতায় রিটার্নিং কর্মকর্তা বাতিল করেছিলেন। তিনি এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করেন এবং শনিবারের শুনানিতে প্রার্থিতা ফিরে পান।
তাসনিম জারা বলেন, "গত এক সপ্তাহ বেশ বড় জার্নির মধ্য দিয়ে গেছি। দেশে-বিদেশে অনেকে শুভকামনা জানিয়েছেন। অনেকে প্রার্থিতা বাতিল হওয়ার পর হতাশ হয়েছিলেন। সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।"
তিনি বলেন, "আমি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবেই নির্বাচনে অংশ নেব। আমাদের পছন্দের মার্কা ফুটবল।"
কক্সবাজার-২
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর গুরুত্বপূর্ণ আসন কক্সবাজার-২-এ দলটির কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদের মনোনয়ন আদালত অবমাননার মামলার তথ্য গোপনের অভিযোগে প্রাথমিক যাচাই-বাছাইয়ে বাতিল হয়েছিল।
পরে তিনি আপিল করলে শনিবার তার প্রার্থিতা পুনর্বহাল করা হয়।
রংপুর-১
জাতীয় পার্টির দুর্গ হিসেবে পরিচিত রংপুর-১ আসনে দলটির প্রার্থী মো. মঞ্জুম আলীর মনোনয়ন দ্বৈত নাগরিকত্বের কারণে বাতিল হয়েছিল। তিনি এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করলেও শনিবার নির্বাচন কমিশন তা নামঞ্জুর করে।
শুনানিতে তিনি বলেন, "আমি শিক্ষার্থী অবস্থায় বিদেশে পড়াশোনার সময় নাগরিকত্বের বিষয়টি আমার মাথায় ছিল না, তাই মনোনয়ন দাখিলের সময় তা সংযুক্ত করতে পারিনি।"
তিনি আরও বলেন, "রংপুর-১ আসনের জাতীয় পার্টির সমর্থকরা আমাকে ভোট দেওয়ার জন্য মুখিয়ে আছে। আমি প্রার্থিতা হারালে সেখানে অযোগ্যরা উঠে আসবে। এটা সম্পূর্ণ বিএনপির ষড়যন্ত্র।"
উচ্চ আদালতে যাবে জাতীয় পার্টি
জাতীয় পার্টির মহাসচিব শামিম হায়দার পাটোয়ারী বলেন, "দলের ২৫টি মনোনয়ন বাতিলের বিরুদ্ধে আপিল করা হয়েছিল, যার মধ্যে শনিবার ১২টির শুনানি হয়েছে। এর মধ্যে ১০টির আপিল মঞ্জুর হয়েছে এবং দুটি নামঞ্জুর হয়েছে।"
তিনি বলেন, এই দুই বিষয়ে তারা উচ্চ আদালতে যাবেন।
তিনি আরও বলেন, নির্বাচন কমিশন নিরপেক্ষভাবে শুনানি করছে এবং তারা আশা করেন নির্বাচনের মাঠেও এই নিরপেক্ষতা বজায় থাকবে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-১
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-১ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী ও সাবেক সংসদ সদস্য সৈয়দ এ কে একরামুজ্জামানের মনোনয়ন বাতিলের আবেদন মঞ্জুর হয়েছে। বিএনপির মনোনীত প্রার্থী ও নাসিরনগর উপজেলা বিএনপির সভাপতি এম এ হান্নান তার মনোনয়ন বাতিলের দাবিতে আপিল করেছিলেন।
শনিবার নির্বাচন কমিশন সেই আপিল মঞ্জুর করে। এম এ হান্নান ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা বিএনপির মনোনীত প্রার্থী।
সৈয়দ এ কে একরামুজ্জামান ২০২৪ সালের নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। পরে তিনি আওয়ামী লীগে যোগ দেন।
এর আগে তিনি বিএনপির পদধারী নেতা ছিলেন। ৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের পতনের পর তিনি আবারও বিএনপিতে যোগ দিয়েছেন।
এদিকে, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী মো. নূর উদ্দিন (চট্টগ্রাম-১১) ও আনোয়ার হোসেন (ঢাকা-১৮)সহ চারটি আপিল মঞ্জুর করেছে নির্বাচন কমিশন। একটি আপিল নামঞ্জুর করা হয়েছে। তাদের ৩৯টি মনোনয়ন বাতিল হয়েছিল।
আপিলের সংখ্যা নিয়ে যা বলছে ইসি
আপিলের সংখ্যা স্পষ্ট করেছে নির্বাচন কমিশন। শুনানির প্রথম দিনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিনসহ চার নির্বাচন কমিশনার উপস্থিত ছিলেন।
নির্বাচন কমিশনের সচিব আখতার আহমেদ বলেন, "মোট ৫২টি আপিল প্রাথমিকভাবে মঞ্জুর করা হয়েছিল এবং ১৫টি খারিজ করা হয়। শুনানির সময় দুইজন আবেদনকারী অনুপস্থিত ছিলেন, তাদের আপিলও খারিজের তালিকায় যুক্ত হয়েছে।"
তিনি বলেন, "এছাড়া তিনটি আপিল মুলতবি রয়েছে।"
পরে নির্বাচন কর্মকর্তারা জানান, একটি বিপরীত আপিল মঞ্জুর হওয়ায় একটি প্রার্থিতা বাতিল হয়, ফলে চূড়ান্তভাবে পুনর্বহাল হওয়া প্রার্থীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫১ জন।
পরবর্তী প্রক্রিয়া
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, দলীয় ও স্বতন্ত্র মিলিয়ে ২,৫০০-এর বেশি মনোনয়নপত্র জমা পড়েছিল। ৩০ ডিসেম্বর থেকে ৪ জানুয়ারি পর্যন্ত যাচাই-বাছাই শেষে রিটার্নিং কর্মকর্তারা ৭২৩ জন প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল করেন।
নির্বাচনি তফসিল অনুযায়ী, আপিল নিষ্পত্তির পর প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ তারিখ ২০ জানুয়ারি। ২১ জানুয়ারি প্রতীক বরাদ্দ, ২২ জানুয়ারি থেকে প্রচার শুরু এবং ১২ ফেব্রুয়ারি ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে।
নির্বাচন কমিশন জানায়, শুনানির ফল মনিটরে প্রদর্শন করা হবে এবং সংশ্লিষ্টদের ই-মেইলে পিডিএফ কপি পাঠানো হবে। চাইলে নির্বাচন কমিশন ভবনের রিসেপশন ডেস্ক থেকেও কপি সংগ্রহ করা যাবে। আপিল শুনানি চলবে ১৮ জানুয়ারি পর্যন্ত।
