জুলাই অভ্যুত্থান নিয়ে কোনো আদালতে প্রশ্ন তোলা যাবে না, একে অবজ্ঞা করা ধৃষ্টতা: চিফ প্রসিকিউটর
জুলাই আন্দোলন ছিল জাতীয় মুক্তির সংগ্রাম এবং এটাকে অবজ্ঞা করে কোনো বক্তব্য দেওয়া 'ধৃষ্টতা' বলে উল্লেখ করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম।
তিনি বলেন, 'বাংলাদেশের কোনো আদালতেই জুলাই অভ্যুত্থানকে নিয়ে প্রশ্ন তোলা যাবে না। জুলাই সনদ ও জুলাই ঘোষণাপত্র জাতির মুক্তি সংগ্রামের দলিল হিসেবে বিবেচিত।'
মঙ্গলবার (৬ জানুয়ারি) জুলাই আন্দোলন চলাকালে কারফিউ জারি করে হত্যার উস্কানি দেওয়ার অভিযোগে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান ও সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের শুনানি চলাকালে তিনি ট্রাইব্যুনালে এসব কথা বলেন। বিচারপতি গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন দুই সদস্যের ট্রাইব্যুনালে এই শুনানি অনুষ্ঠিত হয়।
শুনানিতে সালমান এফ রহমান ও আনিসুল হকের আইনজীবী মনসুরুল হক চৌধুরী এই মামলার অভিযোগ থেকে আসামিদের অব্যাহতি চেয়ে একপর্যায়ে বলেন, 'জুলাইয়ের আন্দোলন ছিল জনজীবন হানিকর আন্দোলন। কারফিউ দেওয়া হয়েছিল জনগণের জানমাল রক্ষায়।'
এর কথার প্রতিবাদ জানিয়ে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, 'এসব বলাটা ধৃষ্টতা।' জুলাই আন্দোলনকে কোনো ভাবেই সন্ত্রাসী আন্দোলন ছিল বলে কারফিউ দেওয়া হয়েছিল এমনটা বলার সুযোগ নেই বলেও ট্রাইব্যুনালকে জানান চিফ প্রসিকিউটর।
শুনানি শেষে ট্রাইব্যুনাল সালমান এফ রহমান ও আনিসুল হকের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের আদেশের জন্য আগামী ১২ জানুয়ারি দিন ধার্য করেন।
এরপর ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণে সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে তাজুল ইসলাম বলেন, 'সালমান এফ রহমান ও আনিসুল হক আন্দোলন চলাকালীন কারফিউ জারি করে আন্দোলন দমানোর চেষ্টা করেছেন। এই কারফিউ জনজীবন রক্ষার জন্য দেওয়া হয়নি। এটি দেওয়া হয়েছিল নিরস্ত্র আন্দোলনকারীদের হত্যা করে আন্দোলন দমানোর জন্য। এই নিরস্ত্র মুক্তিকামী আন্দোলনকারীরা একটি ন্যায্য দাবির জন্য আন্দোলন করেছিল, ফলে এই আন্দোলনের ব্যাপারে কোনো প্রশ্ন তোলা যাবে না।'
তিনি আরও বলেন, 'কারণ সকল রাজনৈতিক দলের ঐকমত্যের ভিত্তিতে জুলাই-আগস্টের আন্দোলন জাতির মুক্তির সংগ্রাম হিসেবে বিবেচিত। এই মুক্তির সংগ্রামকে সন্ত্রাসবাদী আন্দোলন বলার ধৃষ্টতা কেউ যেন না দেখায়, এটিকে মাথায় ধরে নিয়ে ট্রাইব্যুনালে আর্গুমেন্ট করতে হবে। জুলাইয়ের মুক্তিকামী মানুষের আন্দোলন দমানোর জন্য কারফিউ ব্যবহার করা হয়েছিল। তাই এই কারফিউ আইনসম্মত ছিল না। এটি ছিল গণহত্যাকে ফ্যাসিলিটেট করার জন্য একটা নির্দেশ ও পরিকল্পনা, যেটাকে ক্রাইম হিসেবে আমরা আদালতে উপস্থাপন করেছি।'
কারফিউয়ের ভয়াবহতা তুলে ধরে তাজুল ইসলাম বলেন, 'আমরা ট্রাইব্যুনালকে দেখিয়েছি এই কারফিউয়ের মাধ্যমে জনজীবন মেরামত করা হয়নি। নিরস্ত্র মানুষকে পাখির মতো মারা হয়েছে, শিশুদের মারা হয়েছে, মানুষকে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়েছে, এরপর আহত মানুষের বুকে পাড়া দিয়ে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। এগুলো প্রমাণ করে কারফিউ কোনো শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে জারি করা হয়নি। এই কারফিউ ছিল গণহত্যা চালানোর জন্য।'
মামলার প্রমাণের বিষয়ে তিনি বলেন, 'এ মামলায় উল্লেখযোগ্য প্রমাণাদির মধ্যে একটি হলো আসামিদের পরস্পরের মধ্যে টেলিফোনে শলাপরামর্শ করা। আন্দোলন দমনে তারা একে-অপরের সঙ্গে পরিকল্পনা ও ষড়যন্ত্র করেছেন। সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনাও দিয়েছেন। ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় টেলিফোনে কথা বলতে বাধ্য হয়েছিলেন তারা। ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টার (এনটিএমসি) থেকে তাদের ফোনালাপের রেকর্ড আমরা উদ্ধার করি। আইনগত কর্তৃত্ব ছাড়াই বিরোধী দলকে দমনের উদ্দেশ্যে নজরদারির কাজ করত রাষ্ট্রীয় এই প্রতিষ্ঠান। অথচ অন্যের জন্য করে রাখা গর্তে নিজেরাই পতিত হয়েছেন। দুই কাঁধে দুই ফেরেশতা যেমন মানুষের আমলনামা লিখে রাখেন, এনটিএমসিও এই অপরাধীদের আমলনামা লিখে রেখেছিল। যা তারা বুঝতেই পারেননি।'
এর আগে, মঙ্গলবার সকাল ১০টার পর কারাগার থেকে কড়া পাহারায় প্রিজন ভ্যানে করে সালমান এফ রহমান ও আনিসুল হককে ট্রাইব্যুনালে নিয়ে আসে পুলিশ। গত রোববার (৪ জানুয়ারি) এই মামলায় তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আবেদন জানিয়েছিল প্রসিকিউশন। মঙ্গলবার আসামিপক্ষের আইনজীবী মনসুরুল হক চৌধুরী অভিযোগ গঠনের বিরোধিতা করে তাদের অব্যাহতির আবেদন জানালে দীর্ঘ শুনানি অনুষ্ঠিত হয়।
