যেসব কারণে বাংলাদেশের তরুণদের মধ্যে ভারতবিরোধী অবস্থান বাড়ছে
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দেয়ালগুলো যেন আবার চিৎকার করে উঠছে। দেয়াল আর করিডরজুড়ে ছড়িয়ে আছে বিক্ষুব্ধ, বুদ্ধিদীপ্ত এবং কখনও কখনও কাব্যিক সব গ্রাফিতি। এগুলো ২০২৪ সালের জুলাইয়ে জেন-জি বা তরুণ প্রজন্মের নেতৃত্বাধীন সেই অভ্যুত্থানের প্রতিধ্বনি, যা ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকা শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করেছিল।
একসময় বাংলাদেশের গণতন্ত্রের আইকন হলেও, সমালোচকরা বলেন তিনি ক্রমশ স্বৈরাচারী হয়ে উঠেছিলেন। ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর তিনি ভারতে পালিয়ে যান।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা জটলা পাকিয়ে রাজনীতি নিয়ে তর্ক করছেন, অযত্নে পড়ে থাকা লনে সাধারণ চীনা নববর্ষ উদযাপন উপলক্ষে ঝোলানো লাল লণ্ঠন— এটি একটি তাৎপর্যপূর্ণ দৃশ্য, কারণ বেইজিং এবং দিল্লি উভয়েই বাংলাদেশের ওপর প্রভাব বিস্তারের জন্য জোর প্রতিযোগিতা করছে। এখানে অনেকের জন্য, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনই হবে ব্যালট বাক্সের সাথে তাদের প্রথম সত্যিকারের পরিচয়।
শেখ হাসিনার পতনের কয়েক দিন পর নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী মুহাম্মদ ইউনূস অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব নেন। হাসিনা এখন দিল্লিতে নির্বাসনে। ২০২৪ সালের মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে তার অনুপস্থিতিতেই দেওয়া মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে তাকে ফেরত পাঠাতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে দিল্লি। জাতিসংঘের মতে, ওই সহিংসতায় প্রায় ১,৪০০ মানুষ নিহত হয়েছে। তাদের বেশিরভাগই নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে প্রাণ হারিয়েছেন।
তার দল আওয়ামী লীগ—দেশের প্রাচীনতম দল, যাদের প্রায় ৩০ শতাংশ জনসমর্থন ছিল—এই নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবে না। বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রধান বিরোধী দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এখন সেই উদার ও মধ্যপন্থী স্থানটি দখল করতে যাচ্ছে যা বর্তমানে শূন্য। প্রধান ইসলামি দল জামায়াতে ইসলামী অভ্যুত্থান থেকে জন্ম নেওয়া একটি দলের সাথে জোট বেঁধেছে।
কিন্তু ক্যাম্পাসের—এবং এর বাইরের—স্লোগানগুলো কেবল দেশের গণতন্ত্র নিয়ে নয়। এগুলো ক্রমশ সীমান্তের ওপারের দিকেও ইঙ্গিত করছে।
দেয়ালে দেয়ালে লেখা 'দিল্লি না ঢাকা? ঢাকা, ঢাকা'—এমনকি দক্ষিণ এশিয়ার নারীদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক শাড়িতেও এই স্লোগান সেলাই করা হয়েছে। তরুণদের দৈনন্দিন কথাবার্তায় 'আধিপত্য' শব্দটি ঢুকে গেছে, যা বাংলাদেশের ওপর ভারতের দীর্ঘ প্রভাবকেই নির্দেশ করে।
২৪ বছর বয়সী সমাজবিজ্ঞানের ছাত্র মোশাররফ হোসেন বলেন, "তরুণ প্রজন্ম মনে করে ভারত বহু বছর ধরে আমাদের দেশে হস্তক্ষেপ করছে। বিশেষ করে ২০১৪ সালের নির্বাচনের পর, যা ছিল মূলত একদলীয় নির্বাচন।"
এই ক্ষোভ—বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অবক্ষয়ে দিল্লির কথিত ভূমিকা ভারতবিরোধী মনোভাব তীব্র হওয়ার মূলে রয়েছে। এর ফলস্বরূপ ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক, যা একসময় প্রতিবেশী কূটনীতির মডেল হিসেবে প্রচার করা হতো—তা এখন গত কয়েক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে।
লন্ডনের সোয়াস ইউনিভার্সিটির রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের শিক্ষক অবিনাশ পালিওয়াল বলেন, "বাংলাদেশে গভীর ভারতবিরোধী মনোভাব এবং ভারতের নিজস্ব অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে প্রতিবেশী দেশটির প্রতি কঠোর ও প্রায়শই বৈরী আচরণের কারণে দিল্লি ঢাকায় এখন হিমশিম খাচ্ছে।"
অনেকেই শেষ বছরগুলোতে ক্রমশ স্বৈরাচারী হয়ে ওঠা হাসিনাকে সমর্থন করার জন্য দিল্লিকে দায়ী করেন এবং ভারতকে একটি খবরদারি করা প্রতিবেশী হিসেবে দেখেন। তারা ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের বিতর্কিত সাধারণ নির্বাচন এবং সেগুলোতে দিল্লির 'সমর্থন'-এর কথা ভোলেননি।
হোসেন বলেন, "ভারত কোনো চাপ বা প্রশ্ন ছাড়াই হাসিনার সরকারকে সমর্থন দিয়েছিল। মানুষ মনে করে গণতন্ত্র ধ্বংসের পেছনে ভারতের সমর্থন ছিল।"
বিশ্বাসঘাতকতার এই অনুভূতির সাথে যুক্ত হয়েছে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ—সীমান্তে হত্যা, পানি বণ্টন নিয়ে বিরোধ, বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা এবং ভারতীয় রাজনীতিবিদ ও টেলিভিশন স্টুডিওগুলোর উস্কানিমূলক কথাবার্তা। সব মিলিয়ে অনেকের মনে এখন এমন ধারণা হয়েছে যে, ভারত বাংলাদেশকে সমকক্ষ ও স্বাধীন দেশ হিসেবে দেখে না; বরং নিজের নিয়ন্ত্রণের জায়গা হিসেবেই দেখে।
স্থানীয় গণমাধ্যমে এমন খবরে সয়লাব যে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহকারী একটি ভারতীয় শিল্পগোষ্ঠী দেশের সঙ্গে প্রতারণা করছে—যদিও গ্রুপটি এই অভিযোগ অস্বীকার করে। রাজনৈতিক প্রচারণার মূল প্ল্যাটফর্ম ফেসবুকে একটি শীর্ষস্থানীয় দৈনিককে 'ভারতীয় এজেন্ট' আখ্যা দিয়ে নিষিদ্ধ করার প্রচার চলছে। দুই দেশই অধিকাংশ ভিসা পরিষেবা স্থগিত করেছে।
ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ (আইপিএল) থেকে একজন বাংলাদেশি ক্রিকেটারকে নিষিদ্ধ করা এবং বাংলাদেশের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ম্যাচগুলো ভারত থেকে শ্রীলঙ্কায় সরিয়ে নিতে দিল্লির অস্বীকৃতি সীমান্তের এপারে ক্ষোভ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
পালিওয়াল বলেন, "নিশ্চিতভাবেই বাংলাদেশের সব পক্ষের সঙ্গে ভারতের যোগাযোগের চ্যানেল বা মাধ্যম রয়েছে। কিন্তু বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এই যোগাযোগকে ইতিবাচক রাজনৈতিক ফলাফলে রূপান্তর করা চ্যালেঞ্জিং হয়ে দাঁড়িয়েছে।"
দিল্লি অবশ্য তাদের যোগাযোগের পরিধি বাড়াতে শুরু করেছে।
গত মাসে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) নেত্রী খালেদা জিয়ার জানাজায় অংশ নিতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর ঢাকা সফর করেন। তিনি এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে দলের তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। জিয়া পরিবারের ৬০ বছর বয়সী উত্তরাধিকারী তারেক ১৭ বছর লন্ডনে নির্বাসিত জীবন কাটিয়ে সম্প্রতি দেশে ফিরেছেন। এই ঐতিহাসিক নির্বাচনে তাকেই এখন প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ইসলামপন্থী শক্তিগুলোর সঙ্গেও যোগাযোগের পথ খুলেছে ভারত। জামায়াতে ইসলামীর এক জ্যেষ্ঠ নেতা বিবিসিকে জানিয়েছেন, গত এক বছরে ভারতীয় কর্মকর্তারা দলটির নেতৃত্বের সঙ্গে চারবার যোগাযোগ করেছেন। এর মধ্যে ঢাকার একটি হোটেলে ভারতীয় হাইকমিশনের প্রজাতন্ত্র দিবসের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে সাম্প্রতিক আমন্ত্রণের বিষয়টিও রয়েছে।
তবুও এই কৌশলগত পরিবর্তনগুলো সম্পর্কের অবনতি রোধে খুব একটা কাজে আসেনি। দ্য ডেইলি স্টার পত্রিকার কনসাল্টিং এডিটর কামাল আহমেদ বলেন, বর্তমানে সম্পর্কের যে শীতলতা চলছে, তা আগের সংকটগুলোর সময়ও দেখা যায়নি।
তিনি বিবিসিকে বলেন, "দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এটি যে সর্বনিম্ন পর্যায়, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।"
শেখ হাসিনার আমলের সঙ্গে এর পার্থক্যটা খুব স্পষ্ট।
১৭ বছর ধরে ঢাকা ভারতের জন্য "প্রায় সব দরজা খুলে দিয়েছিল"—নিরাপত্তা সহযোগিতা, ট্রানজিট, বাণিজ্য, সাংস্কৃতিক বিনিময় এবং মানুষে-মানুষে সম্পর্ক। আহমেদ বলেন, আজ "কিছুই এগোচ্ছে না—না মানুষ, না সদিচ্ছা।"
মনে হচ্ছে গত আগস্টে হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর দিল্লির প্রতিক্রিয়াই সংশয়কে ক্ষোভে পরিণত করেছে। অনেক বাংলাদেশি বলেছেন, তারা আশা করেছিলেন ভারত তাদের বাংলাদেশ নীতি নতুন করে সাজাবে, যা এতদিন প্রায় পুরোপুরি একটি দলকে সমর্থনের ওপর নির্ভর করেছিল।
এর পরিবর্তে ভারত যেন উল্টো পথেই হেঁটেছে—হাসিনাকে আশ্রয় দিয়েছে এবং ভিসা ও বাণিজ্য বিধিনিষেধ কঠোর করেছে। আহমেদ বলেন, ঢাকায় যে বার্তাটি পৌঁছেছে তা হলো: বাংলাদেশিদের "প্রতিবেশী হিসেবে মূল্যায়ন করা হচ্ছে না"।
রাজনৈতিক বাগাড়ম্বর বা মৌখিক আক্রমণ পরিস্থিতি আরও খারাপ করেছে।
যখন ভারতীয় রাজনীতিবিদরা বাংলাদেশি অভিবাসীদের "উঁইপোকা" বলে অভিহিত করেন কিংবা "ইসরায়েল যেভাবে গাজায় করেছে" সেভাবে বাংলাদেশকে শিক্ষা দেওয়ার কথা বলেন, তখন আহমেদ প্রশ্ন রাখেন: "আপনি বাংলাদেশের মানুষের কাছ থেকে কী ধরনের প্রতিক্রিয়া আশা করেন?"
ক্ষোভ থেকে এরপর সাংস্কৃতিক প্রতিশোধ নেওয়া শুরু হয়—ভারতীয় পণ্য বর্জনের ডাক এবং আইপিএল সম্প্রচার বন্ধ করা। আহমেদ বলেন, "সংস্কৃতি, বাণিজ্য, সম্মান—কোনো কিছুই একপাক্ষিক হতে পারে না। দুর্ভাগ্যবশত, বর্তমান ভারতীয় নেতৃত্ব এভাবেই আচরণ করছে।"
তবুও ঢাকার কর্মকর্তারা সম্পর্ককে শুধুমাত্র সংকটের দৃষ্টিতে দেখার বিষয়ে সতর্ক করেছেন।
অধ্যাপক ইউনূসের প্রেস সচিব শফিকুল আলম ভারতের সঙ্গে সম্পর্ককে রাজনীতির পাশাপাশি ভৌগোলিক অবস্থানের ভিত্তিতে "বহুমাত্রিক" হিসেবে বর্ণনা করেছেন। ৪,০৯৬ কিলোমিটার সীমান্তজুড়ে বাণিজ্যিক প্রবাহ এবং দৈনন্দিন চলাচলের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, "আমাদের ৫৪টি অভিন্ন নদী রয়েছে... আমাদের ভাষা এক, আমাদের ইতিহাসও এক।"
এরপরও শফিকুল স্বীকার করেন, জনমত তীব্রভাবে কঠোর হয়েছে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশিদের যদি জিজ্ঞেস করা হয় কেন তারা ১৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারেননি, তবে অনেকেই একই উত্তর দেন: শেখ হাসিনার স্বৈরতন্ত্র—এবং এতে ভারতের "সমর্থন"। "তারা আরও বলে যে, হাসিনাকে ভারত সব সময় সমর্থন দিয়ে গেছে।"
২০২৪ সালের সহিংসতার পর হাসিনার ভারতে পালিয়ে যাওয়াটা এখনো একটি বিশেষ বেদনাদায়ক বিষয় হয়ে রয়েছে।
শফিকুল বলেন, "শত শত তরুণ নিহত হলো... আর তারপর তিনি ভারতে পালিয়ে গেলেন।" একজন ক্ষমতাচ্যুত বা নিন্দিত নেতা হিসেবে না দেখে তাকে যেভাবে 'সরকারপ্রধানের' মতো আতিথেয়তা দেওয়া হয়েছে, সেই ধারণা মানুষের ক্ষোভকে আরও গভীর করেছে।
ভারতীয় গণমাধ্যমের সংবাদ প্রচারের ধরনকে 'ভীতি ছড়ানোর মতো' বলে সমালোচনা করেন শফিকুল। তিনি হিন্দু সংখ্যালঘুদের ওপর কাঠামোগত নির্যাতনের অভিযোগকে 'ব্যাপক অপপ্রচার' বলে উড়িয়ে দেন। তিনি বলেন, বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা অবশ্যই ঘটে, কিন্তু সেগুলোকে নিয়মিতভাবে ধর্মীয় সহিংসতা হিসেবে চিত্রিত করা হচ্ছে। ভারতীয় সাংবাদিকদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, "আপনারা আসুন, ঘুরে দেখুন। মানুষের সঙ্গে কথা বলুন এবং দেখুন আসলে কী ঘটেছে।"
এদিকে ভারত বলছে, স্বাধীন সূত্রগুলো অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদে সংখ্যালঘুদের ওপর হত্যা, অগ্নিসংযোগ ও জমি দখলসহ ২,৯০০টিরও বেশি সহিংসতার ঘটনার তথ্য নথিভুক্ত করেছে। তারা আরও বলছে, এর সবকটিকেই 'গণমাধ্যমের অতিরঞ্জন' বা 'রাজনৈতিক সহিংসতা' বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
অধ্যাপক আলী রীয়াজ বর্তমানে ড. ইউনূসের বিশেষ সহকারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি মনে করেন, এই ফাটল কেবল ভুল বোঝাবুঝির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এর গভীরতা আরও বেশি।
তিনি বলেন, "সম্পর্কটি তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে।" তার মতে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দুই দেশের সম্পর্কটি 'বাংলাদেশ ও ভারতের' সম্পর্কের বদলে 'একটি দল বা ব্যক্তির সঙ্গে ভারতীয় এস্টাবলিশমেন্টের' সম্পর্কে পর্যবসিত হয়েছিল।
দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত বিরোধ এই ক্ষতি আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। রীয়াজ যুক্তি দেন যে, পানি বণ্টন ব্যবস্থা একটি আধিপত্য তৈরি করে। তিনি বলেন, "আপনি যদি পানি নিয়ন্ত্রণ করেন, তবে সম্পর্কটি তাৎক্ষণিকভাবে অসম হয়ে পড়ে।"
সীমান্তে হত্যার বিষয়টি আরও গভীর ক্ষত তৈরি করেছে। আলী রীয়াজ বলেন, "ভারতীয় এস্টাবলিশমেন্ট বাংলাদেশিদের জীবনকে কীভাবে দেখে, এই হত্যাগুলো তারই প্রতিফলন হিসেবে বিবেচিত হয়।" অবশ্য ভারত সীমান্তের নির্দিষ্ট কিছু মৃত্যুর ঘটনায় তাদের বাহিনীর বেআইনি হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এসব বিষয় কোনো সাময়িক বা বিচ্ছিন্ন উপদ্রব নয়, বরং এগুলো ভারসাম্যহীনতার প্রতীক।
সমালোচকদের মতে, হাসিনার পতনের পর সেই ভারসাম্যহীনতা আরও প্রকট হয়েছে। ইউনূসের পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা মোহাম্মদ তৌহিদ হোসেন বলেন, ভারত তাদের নীতি পরিবর্তন করতে ব্যর্থ হয়েছে এবং অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক নতুন করে সাজানোর সুযোগ হাতছাড়া করেছে। তিনি বলেন, "আমরা বেশ কয়েকবার এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু ভারতের প্রতিক্রিয়া ছিল কখনো হ্যাঁ, আবার কখনো না।"
নিজেদের অবস্থান থেকে ভারত বাংলাদেশের "অবনতিশীল নিরাপত্তা পরিস্থিতি" নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এবং শান্তিপূর্ণভাবে "অবাধ, সুষ্ঠু, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন" অনুষ্ঠানের আহ্বান জানিয়েছে।
রাজনৈতিক টানাপড়েন এখন অর্থনৈতিক সম্পর্কেও প্রভাব ফেলছে। গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর ফাহমিদা খাতুন বলেন, শুল্ক ও অশুল্ক বাধা দূর করা এবং কূটনৈতিক সম্পর্কের উন্নতি হলে ১৩.৫ বিলিয়ন ডলারের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য আরও অনেক বেশি হতে পারত। তিনি বলেন, "রাজনৈতিক উত্তেজনা অর্থনৈতিক উত্তেজনার জন্ম দিয়েছে।"
তবে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে এই কঠোর অবস্থান সবসময় সাধারণ মানুষের মধ্যে একইভাবে প্রতিফলিত হয় না।
ডাকসুর সম্পাদক এবং ইনকিলাব মঞ্চের ফাতিমা তাসনিম জুমা বলেন, "যখনই আমি ভারতের কথা শুনি, আমার মনে হয় এটি আমার শত্রু।" জাতীয়তাবাদী ও ভারতবিরোধী বার্তার জন্য এই সাংস্কৃতিক মঞ্চটি পরিচিত।
জুমা বলেন, "কিন্তু সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে বিষয়টি এমন নয়।" তিনি জানান, তিনি হিন্দু অধ্যুষিত এলাকায় বড় হয়েছেন এবং তার আত্মীয়রা সহজেই সীমান্তের ওপারে যাতায়াত করেন। তার ভাষ্য, "আমাদের বিরোধ ভারত সরকার বা তাদের কাঠামোর সঙ্গে। জনগণের সঙ্গে নয়।"
নির্বাচনি প্রচারণায় ভারতবিরোধী মনোভাব লক্ষণীয়ভাবে কিছুটা দমে আছে—এর কারণ এই নয় যে ক্ষোভ কমে গেছে, বরং এর কারণ হলো সব রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীই জানেন যে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক নতুন করে সাজানো অপরিহার্য।
তবুও, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক মেরামত করা দ্রুত বা লোক দেখানো কোনো বিষয় হবে না।
শফিকুল বলেন, "শুধুমাত্র নির্বাচন বা নতুন সরকার এসেছে বলেই সম্পর্ক ঠিক করা সহজ হবে না। পেছনের সমস্যাগুলো থেকেই যাবে।"
তবুও এই সম্পর্কের ফাটল অপরিবর্তনযোগ্য নয়। রীয়াজ বলেন, "কোনো রাষ্ট্রীয় সম্পর্কই এমন নয়।" তবে তিনি যুক্তি দেন, সম্পর্ক মেরামতের দায়ভার মূলত দিল্লির ওপরই বর্তায় এবং এজন্য ঢাকাকে পছন্দের মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে সামলানোর অভ্যাস থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
কামাল আহমেদ বলেন, বাংলাদেশ সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে প্রস্তুত, কিন্তু ভারতকে এমনভাবে সম্পর্ক গড়তে হবে যা ঢাকায় ক্ষমতায় থাকা যেকোনো পক্ষের সঙ্গে কাজ করে।
রাজনৈতিক ব্যক্তিরা সম্পর্ক পুনর্গঠনকে কৌশলগত বিষয়ের পাশাপাশি নৈতিক দিক থেকেও দেখছেন।
বিএনপি নেতা তারেক রহমানের অন্যতম উপদেষ্টা মাহদী আমিন বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে সোজাসাপ্টাভাবে বলেন: "জাতি যত বড়, দায়িত্বও তত বেশি।"
তিনি যুক্তি দেন, ভারত যদি কেবল সরকারের পছন্দের দিকে না তাকিয়ে বাংলাদেশের জনগণের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে নিজেদের নীতিকে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে, তবেই দুই দেশের মানুষের মধ্যে সম্পর্ক উন্নত হতে পারে।
জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আহসানুল মাহবুব জুবায়েরও সতর্ক সুরে একই কথা বলেন: "উভয় দেশের দায়িত্বশীলরা যদি আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করেন, বর্তমান বাস্তবতা মেনে নেন এবং একে অপরের সঙ্গে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও মর্যাদার সঙ্গে আচরণ করেন, তবে একটি গঠনমূলক সম্পর্ক তৈরি করা সম্ভব।"
সম্পর্ক মেরামতের সেই সুযোগ এখনো আছে—এবং একটি নতুন সরকার এক্ষেত্রে পার্থক্য গড়ে দিতে পারে।
পালিওয়াল উল্লেখ করেন, "বর্তমান পরিস্থিতি কূটনৈতিক শীতলতার চেয়ে বেশি কিছু, তবে তা কাঠামোগত ভাঙনের চেয়ে কম।"
তিনি বলেন, "ভৌগোলিক অবস্থান, ইতিহাস এবং অভিন্ন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অর্থ হলো—ভারত ও বাংলাদেশ চাইলেও একে অপরকে উপেক্ষা করতে পারে না।"
