'আমরা বানিয়াচং থানা পুড়িয়েছি, এসআই সন্তোষকে জ্বালিয়ে দিয়েছি': ওসিকে বৈষম্যবিরোধী নেতা
হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জ থানায় আটক নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের এক নেতাকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের চাপে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছে পুলিশ। গতকাল শুক্রবার নয়ন নামের ওই যুবককে মুক্তি দেওয়া হয়। এদিকে ছাত্রলীগ নেতাকে ছাড়িয়ে নেওয়ার সময় থানায় পুলিশের সঙ্গে বৈষম্যবিরোধী ছাত্রনেতাদের উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়ের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।
ভিডিওতে দেখা যায়, থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ও অন্যান্য পুলিশ সদস্যের সামনে বসে কথা বলছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের হবিগঞ্জ জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক মাহদী হাসান ও তার সঙ্গীরা। একপর্যায়ে মাহদী হাসানকে বলতে শোনা যায়, 'আমরা এই গভমেন্ট [সরকার] গঠন করেছি। ওই হিসেবে আপনারা আমাদের প্রশাসনের লোক। অথচ আপনি আমাদের ছেলেদের ধরে নিয়ে আসছেন। আবার এখন বার্গেনিং [দর-কষাকষি] করছেন, বলছেন, "আন্দোলনকারী তো কী হয়েছে?"'
তিনি আরও বলেন, 'এখানে [হবিগঞ্জে] ১৭ জন শহীদ হয়েছে। হবিগঞ্জ অন্যতম সেই জায়গা, যেখানে গুরুত্বপূর্ণ আন্দোলন হয়েছে। বানিয়াচং থানা কিন্তু আমরা পুড়িয়ে দিয়েছিলাম, এসআই সন্তোষকে কিন্তু আমরা জ্বালাই দিয়েছিলাম। ওই জায়গা থেকে উনি [ওসি] কোন সাহসে এটা [আন্দোলনকারী হয়েছে তো কী হয়েছে] বললেন। আমি স্ট্রিকলি এখানে আসছি। আমরা এতগুলা ছেলে ভাইসা আসছে নাকি?'
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, শায়েস্তাগঞ্জ উপজেলার কলিমনগর গ্রামের আনোয়ার আলীর ছেলে এনামুল হাসান নয়নকে গত ১ জানুয়ারি দিবাগত রাতে তার বাড়ি থেকে আটক করা হয়। নয়নের নাম ২০২৩ সালের স্থানীয় ছাত্রলীগ কমিটির সহ-সভাপতি হিসেবে তালিকায় রয়েছে। বর্তমানে নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের পদে থাকার কারণেই তাকে আটক করা হয়েছিল বলে জানায় পুলিশ।
নয়নকে আটকের খবর ছড়িয়ে পড়লে বৃহস্পতিবার বিকেলে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা-কর্মীরা থানায় জড়ো হন। মাহদী হাসানের নেতৃত্বে ওসির সঙ্গে আলোচনার একপর্যায়ে ওই উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় ঘটে। পরবর্তীতে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) শহিদুল ইসলাম ঘটনাস্থলে গিয়ে মধ্যস্থতা করেন। আন্দোলনে নয়নের অংশগ্রহণের প্রমাণ পাওয়ায় গতকাল বিকেল ৩টার দিকে তাকে মুক্তি দেওয়া হয়।
এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে মাহদী হাসান বলেন, 'ছাত্রলীগ করার কারণে যদি একটা মানুষ অপরাধী হয়ে থাকে তাহলে তো আমাদের মূল সমন্বয়কারী ভাই যারা ছিলেন, তাদের মধ্যে যেমন সারজিস আলম ভাই, তিনিও একসময় ছাত্রলীগের সাথে জড়িত ছিলেন; তাহলে তো তিনিও অপরাধী।'
তার দাবি, এনামুল হাসান নয়ন আগে ছাত্রলীগ করলেও জুলাই আন্দোলনে সম্মুখ সারির যোদ্ধা ছিলেন। নয়নের অংশগ্রহণের প্রমাণ দেওয়ার পরও পুলিশ তাকে ছাড়তে রাজি না হওয়ায় এবং ওসি তাদের সঙ্গে খারাপ আচরণ করায় পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়েছিল বলে উল্লেখ করেন তিনি। মাহদী অভিযোগ করেন, ওসি তাদের বলেছিলেন— 'আন্দোলন করেছে বলে কী হয়েছে, সে তো একসময় ছাত্রলীগ ছিল।'
ওসির উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় প্রসঙ্গে তিনি বলেন, 'ওসির সাথে প্রথমে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করি, কিন্তু ওসি আমাদের গুরুত্ব না দেওয়ায় উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় হয়।'
তিনি বলেন, শায়েস্তাগঞ্জ থানায় কিন্তু এটাই প্রথম ঘটনা নয়, এরকম আরও ঘটনা ঘটেছে।
এ ব্যাপারে শায়েস্তাগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল কালাম বলেন, ছাত্রলীগের কমিটিতে নাম থাকায় নয়নকে আটক করা হয়েছিল। তবে আন্দোলনে অংশগ্রহণের বিষয়ে তথ্যপ্রমাণ পাওয়ায় পরে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
এদিকে, মাহদী হাসানকে কারণ দর্শানো নোটিশ প্রদান করেছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন।
শনিবার দুপুরে মাহদীকে এ নোটিশ প্রদান করা হয়। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ফেসবুক পেজ সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
মাহদীকে দেওয়া বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের শোকজ নোটিশে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত তাকে সংগঠনের সকল প্রকার সাংগঠনিক কার্যক্রম থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের দপ্তর সম্পাদক শাহাদাত হোসেন সাক্ষরিত এ নোটিশে বলা হয়, ২ জানুয়ারি হবিগঞ্জ জেলার শায়েস্তাগঞ্জ থানায় মাহদী হাসানের কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত বক্তব্য গণমাধ্যমে প্রচারিত হয়। ওই বক্তব্যগুলো বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আদর্শের সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং জনপরিসরে সংগঠনের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করেছে বলে কেন্দ্রীয় কমিটি মনে করে।
এর প্রেক্ষিতে শনিবার কারণ দর্শানোর নোটিশে মাহদী হাসানকে তার বক্তব্য প্রদানের কারণ সম্পর্কে সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি, তার বিরুদ্ধে কেন স্থায়ী সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে না, সে বিষয়ে লিখিত জবাব আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে কেন্দ্রীয় সভাপতি রিফাত রশিদ বরাবর দপ্তরের মাধ্যমে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
উল্লেখ্য, গত ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় বানিয়াচং থানায় হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। সে সময় এসআই সন্তোষ চৌধুরীকে পিটিয়ে হত্যা করা হয় এবং তার মরদেহ একটি গাছে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছিল। ওই দিনই বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষে গুলিতে ৯ জন নিহত হন। এই হত্যাকাণ্ড নিয়ে ২০২৫ সালের জুলাই মাসে বিবিসি বাংলা একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল, যেখানে ওই কর্মকর্তাকে পরিকল্পিতভাবে লক্ষ্যবস্তু করার অভিযোগ তোলা হয়। তবে পরে প্রতিবেদনটি প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছিল।
