চড়া করের চাপে টেলিকম খাত; বাড়তি খরচের বোঝা ভোক্তার কাঁধে
২৮ বছর বয়সি রাইড শেয়ারিং চালক হাসান মাহমুদ যখন প্রতি সপ্তাহে মোবাইলে ব্যালেন্স রিচার্জ করেন, তখন তিনি সম্পূরক শুল্ক, ভ্যাট কিংবা স্পেকট্রাম ফি নিয়ে খুব একটা মাথা ঘামান না। হাসানের কাছে শুধু এটুকুই মনে হয়, মোবাইল ইন্টারনেটের দাম দিন দিন বাড়ছে, আর এর গতিও মাঝে মাঝে ধীর হয়ে যাচ্ছে।
তিনি যা জানেন না, তা হলো—মোবাইল সেবায় তার ব্যয় করা প্রতি ১০০ টাকার মধ্যে প্রায় ৫৫ টাকাই কর ও ফি হিসেবে সরাসরি সরকারের কোষাগারে চলে যায়। এই বিশাল করের বোঝা একদিকে যেমন তার জীবিকায় টান ফেলছে, অন্যদিকে কমিয়ে দিচ্ছে অপারেটরদের মুনাফাও। ফলে তারা নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ ও সেবার মানোন্নয়নে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ করতে পারছে না।
খাতসংশ্লিষ্ট নির্বাহী ও বিশ্লেষকরা বলছেন, বৈশ্বিক গড় ও প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশে টেলিকম খাতের ওপর করের বোঝা অনেক বেশি। এ কারণে অপারেটররা এখন মূল টেলিকম সেবা থেকে সরে এসে অন্যান্য ডিজিটাল সেবায় বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে।
মোবাইল সেবার ওপর বর্তমানে ২০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক রয়েছে। সাধারণত তামাকজাত পণ্যের মতো যেসব পণ্যের ব্যবহার সরকার নিরুৎসাহিত করতে চায়, সেগুলোর ওপরই এমন কর আরোপ করা হয়। এর ফলে অন্যান্য শিল্পের তুলনায় টেলিকম খাত বেশ অসুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে করপোরেট করের চাপ—পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত অপারেটরদের জন্য ৪০ শতাংশ ও অ-তালিকাভুক্ত অপারেটরদের জন্য ৪৫ শতাংশ। সম্পূরক শুল্ক, ভ্যাট, রাজস্ব ভাগাভাগি ফি, স্পেকট্রাম চার্জ ও লাইসেন্স ফি মিলিয়ে অপারেটরদের মোট আয়ের প্রায় ৫৫ শতাংশই চলে যায় কর ও ফি বাবদ।
এ খাতের হিসাবমতে, ভারতে টেলিকম অপারেটরদের ওপর মোট করের বোঝা প্রায় ৩৫ শতাংশ এবং পাকিস্তানে তা ২৯ শতাংশ।
এ খাতের একজন জ্যেষ্ঠ নির্বাহী বলেন, 'এই করের বোঝা শুধু অপারেটরদের ওপরই পড়ে না। বাড়তি খরচ, সেবার মানোন্নয়নে ধীরগতি এবং সেবার মানের তারতম্যের মাধ্যমে ভোক্তারাও এর মাশুল দিচ্ছেন।'
অধিকাংশ অপারেটরের কাছে মুনাফা এখনও অধরা
উচ্চ করের প্রভাব পুরো খাত জুড়েই দৃশ্যমান। গ্রামীণফোনই একমাত্র অপারেটর যারা তুলনামূলক টেকসই মুনাফা করতে পারছে। অন্যরা কয়েক দশক ধরে ব্যবসা পরিচালনা করেও মুনাফা করতে হিমশিম খাচ্ছে।
ভয়েস কল থেকে আয় থমকে রয়েছে, স্পেকট্রাম ব্যয় এখনো চড়া এবং বিনিয়োগের বিপরীতে রিটার্ন কমছে। এমন পরিস্থিতিতে অপারেটররা কৌশলগত পছন্দের চেয়ে বরং প্রয়োজনের তাগিদেই নিজেদেরকে ডিজিটাল সেবাদাতা হিসেবে নতুন করে সাজাচ্ছে।
নাগরিক সংগঠন ভয়েস ফর রিফর্ম-এর আহ্বায়ক ফাহিম মাশরুর বলেন, বর্তমান কর কাঠামোতে কানেক্টিভিটির বিষয়টি উপেক্ষিত হয়েছে।
তিনি প্রশ্ন রাখেন, 'ইন্টারনেট ও ভয়েস কল এখন মানুষের মৌলিক প্রয়োজন। তাহলে এগুলোর ওপর কেন ২০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক থাকবে? সম্পূরক শুল্ক তো সাধারণত তামাকের মতো ক্ষতিকর পণ্যে আরোপ করা হয়, নিত্যপ্রয়োজনীয় সেবায় নয়।'
তিনি আরও বলেন, প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশে ইন্টারনেট ব্যবহারের হার এখনো কম, অথচ টেলিকম খাতে করের হার অনেক বেশি। 'করের বোঝা শেষপর্যন্ত গ্রাহকের ওপরই বর্তায়। এতে সাধারণ মানুষ ভোগান্তিতে পড়েন এবং উন্নত নেটওয়ার্ক তৈরির জন্য বিনিয়োগ করার মতো যথেষ্ট অর্থও সেবাদাতাদের হাতে থাকে না।'
নিয়ন্ত্রক সংস্থা চাপের কথা স্বীকার করলেও মিলছে না স্বস্তি
বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) কর্মকর্তারা এই চাপের বিষয়টি স্বীকার করেন। তারা জানান, প্রতি বাজেটের আগেই জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআর) কর কমানোর প্রস্তাব পাঠানো হয়। কিন্তু দেশের কর-জিডিপি অনুপাত কম—এই কারণ দেখিয়ে কর্তৃপক্ষ বরাবরই কোনো ছাড় দিতে অনীহা প্রকাশ করে আসছে।
ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের সচিব আবদুন নাসের খান টিবিএসকে বলেন, তার মেয়াদে বিষয়টি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে পর্যালোচনা করা হয়নি। তবে তিনি স্বীকার করেন, এই চাপ শিল্প ও গ্রাহক—উভয়েরই ক্ষতি করছে।
সচিব বলেন, 'বিশাল করের বোঝা একদিকে শিল্পকে পিছিয়ে দিচ্ছে, তেমনি গ্রাহকদেরও ভোগান্তিতে ফেলছে। কোম্পানিগুলো এবং বিটিআরসি যৌথভাবে এ বিষয়ে উদ্যোগ নিতে পারে। সেবা সহজীকরণ ও গ্রাহকদের সাস্থ কথা বিবেচনা করে আমরা প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেব।'
সমস্যার মূলে চড়া করহার
জিএসএমএ ইন্টেলিজেন্স-এর তথ্যানুসারে, বাংলাদেশে মোবাইল অপারেটরদের ওপর করপোরেট করের হার ৪৫ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। বিশ্বের অনেক দেশে সাধারণত ক্ষতিকর পণ্যের ওপর এই পর্যায়ের চড়া কর আরোপ করা হয়।
তুলনামূলক হিসাবে দেখা যায়, ভারতে এই করহার ৩৫ শতাংশ, পাকিস্তানে ২৯ শতাংশ ও শ্রীলঙ্কায় ২৮ শতাংশ। ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়ায় এ হার ২০ শতাংশের কাছাকাছি। অন্যদিকে ব্রুনেইতে করপোরেট কর মাত্র ১৯ শতাংশ।
করপোরেট কর ছাড়াও রিচার্জের ওপর গ্রাহকদের ২০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক ও ভ্যাট দিতে হয়। এর বাইরে অপারেটরদের দিতে হয় ন্যূনতম টার্নওভার কর, রাজস্ব ভাগাভাগি ফি, স্পেকট্রাম চার্জ, লাইসেন্স ফি, সামাজিক দায়বদ্ধতা তহবিল (এসওএফ) অনুদান, কাস্টমস ডিউটি ও বিভিন্ন স্থানীয় কর।
সব মিলিয়ে বাংলাদেশে টেলিকম খাতের আয়ের প্রায় ৫৫ শতাংশই চলে যায় বিভিন্ন কর ও সরকারি ফিতে। অথচ এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে এই গড় হার মাত্র ২৪ শতাংশ এবং বিশ্বজুড়ে প্রায় ২২ শতাংশ। এমনকি সাব-সাহারান আফ্রিকার দেশগুলোতেও এই হার (প্রায় ৩৫ শতাংশ) বাংলাদেশের তুলনায় অনেক কম।
অ্যাসোসিয়েশন অভ মোবাইল টেলিকম অপারেটরস অব বাংলাদেশের (অ্যামটব) মহাসচিব মোহাম্মদ জুলিফিকার বলেন, এমন বহুস্তরের কর কাঠামো টেকসই নয়।
তিনি বলেন, 'এটি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে গভীর অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে, শিল্পকে দুর্বল করেছে এবং বিনিয়োগের বিপরীতে রিটার্ন কমিয়ে দিয়েছে।' তিনি জরুরি ভিত্তিতে সম্পূরক শুল্ক, স্পেকট্রামের ওপর ভ্যাট, সিম ট্যাক্স ও ন্যূনতম টার্নওভার কর পর্যালোচনার দাবি জানান। তিনি উল্লেখ করেন, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এ ধরনের করের বোঝা বিরল।
বাংলালিংক: ২৬ বছর পরও শুধুই টিকে থাকার লড়াই
এই চাপের সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রভাব দেখা যায় বাংলালিংকের ওপর। কার্যক্রম শুরুর ২৬ বছর পেরিয়ে গেলেও অপারেটরটি এখনো কোনো বছরে মুনাফার মুখ দেখেনি। ২২ শতাংশ বাজার হিস্যা এবং প্রায় ৪ কোটি গ্রাহক থাকা সত্ত্বেও গত অর্থবছরে বাংলালিংক ৩৩১ কোটি টাকা লোকসান গুনেছে।
এমনকি লোকসানের সময়ও অতিরিক্ত ২ শতাংশ টার্নওভার কর দিতে হওয়ায় প্রতিষ্ঠানটির নগদ প্রবাহ আরও সংকুচিত হয়েছে। টানা লোকসানের কারণে অপারেটরটি এখন বিনিয়োগের ক্ষেত্রে অতি সতর্কতা অবলম্বন করতে বাধ্য হচ্ছে। কর, তরঙ্গ ও লাইসেন্স ফি পরিশোধের পর নেটওয়ার্ক উন্নয়নের সুযোগ তাদের জন্য খুবই সীমিত।
রবি: প্রবৃদ্ধি থাকলেও মুনাফা নগণ্য
১৯৯৭ সালে যাত্রা শুরু করার পর মুনাফার মুখ দেখতে রবির সময় লেগেছে ২১ বছর। প্রায় ৭ কোটি গ্রাহক নিয়ে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম এই অপারেটর গত বছর ৯ হাজার ৯৫০ কোটি টাকার টার্নওভার করলেও তাদের মুনাফার ছিল মোট আয়ের মাত্র ৭ শতাংশ।
ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং ডিজিটাল ও এন্টারপ্রাইজ সেবায় প্রবৃদ্ধি কিছুটা সহায়ক হলেও, করের চাপে গুরুত্বপূর্ণ খাতে রবির বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে সমন্বিত নেটওয়ার্ক ব্যবস্থাপনা, ফাইবার ব্যাকহল সম্প্রসারণ ও ফোর-জি সেবার মানোন্নয়ন।
কোম্পানি সচিব মোহাম্মদ সাহেদ আলম বলেন, কর ও তরঙ্গের দাম পরিশোধের পর নেটওয়ার্ক আপগ্রেড বা নতুন প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করার মতো পুঁজি খুব সামান্যই অবশিষ্ট থাকে।
গ্রামীণফোন: মুনাফায় থাকলেও চাপে আছে
বাজারের ৪৬ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে শীর্ষ অপারেটর গ্রামীণফোন। ২০২৪ সালে প্রতিষ্ঠানটি ১৫ হাজার ৮৪৫ কোটি টাকা টার্নওভার ও ৩ হাজার ৬৩০ কোটি টাকা মুনাফা করেছে, যা ২০২০ সালের মুনাফার তুলনায় কিছুটা কম। ওই বছর তাদের কর-পরবর্তী মুনাফা ছিল ৩ হাজার ৭১৮ কোটি টাকা।
আর্থিক ভিত্তি মজবুত হওয়া সত্ত্বেও করের চাপে ২০২৪ সালে তাদের পুনঃবিনিয়োগের পরিমাণ ছিল মাত্র ১ হাজার ৮৩০ কোটি টাকা। বিশ্লেষকরা বচলেন, ইন্টারনেটের ক্রমবর্ধমান চাহিদার তুলনায় এই বিনিয়োগ অপর্যাপ্ত।
মূল টেলিকম সেবার বাইরে ঝুঁকতে বাধ্য হচ্ছে অপারেটররা
ক্রমবর্ধমান চাপের মুখে অপারেটররা প্রথাগত টেলিকম সেবার গণ্ডি পেরিয়ে ব্যবসার পরিধি বাড়াচ্ছে।
গ্রামীণফোন তাদের মাইজিপি অ্যাপের পরিধি বাড়াচ্ছে, যেখানে কনটেন্ট, বিল পেমেন্ট ও নানা ডিজিটাল সেবা মিলছে। পাশাপাশি তারা ক্লাউড, আইওটি ও সাইবার নিরাপত্তার মতো করপোরেট সেবা জোরদার করছে। অন্যদিকে রবি মনোযোগ দিচ্ছে এন্টারপ্রাইজ সল্যুশন, স্মার্ট মিটারিং, ফ্লিট ম্যানেজমেন্ট ও স্মার্ট সিটি প্রকল্পের দিকে। এছাড়া শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতেও তারা ডিজিটাল অংশীদারিত্ব গড়ে তুলছে।
বাংলালিংক নিজেদের একটি ডিজিটাল লাইফস্টাইল ব্র্যান্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করছে। তারা তাদের মাইবিএল অ্যাপ, ফিনটেক পার্টনারশিপ, ডেটা অ্যানালিটিকস ও ওটিটি প্ল্যাটফর্ম টফি-র ওপর নির্ভর করছে, যা ব্যবহারকারীদের মধ্যে বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছে।
সেবার মান ও ভবিষ্যৎ প্রযুক্তির জন্য ঝুঁকি
ফাহিম মাশরুর সতর্ক করে বলেন, পর্যাপ্ত তহবিল না থাকলে ফোর-জি সেবার মানোন্নয়ন এবং ভবিষ্যতে ফাইভ-জি প্রযুক্তি চালু করার বিষয়টি দীর্ঘমেয়াদি বিলম্বের মুখে পড়তে পারে।
'এই কর কাঠামো কেবল অপারেটরদেরই ক্ষতি করছে না, বরং পুরো ডিজিটাল ইকোসিস্টেমকেই ক্ষতিগ্রস্ত করছে,' বলেন তিনি।
অ্যামটব মহাসচিব জুলফিকার বলেন, টেকসই প্রবৃদ্ধির জন্য আন্তর্জাতিক মানদণ্ড মেনে ধাপে ধাপে কর ও ফি যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনা প্রয়োজন। পাশাপাশি তরঙ্গের দাম ও নবায়ন খরচও পর্যালোচনা করা দরকার।
তিনি বলেন, 'বিনিয়োগবান্ধব নীতি পরিবেশ ছাড়া ব্যাপকভাবে ফাইভ-জি সেবা চালুর আশা করা অবাস্তব।'
