৬ বিলিয়ন ডলারের ৩১টি নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ক্ষুণ্ন: টিআইবি
প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগমূল্যের ৩১টি অননুমোদিত (আনসলিসিটেড) নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিলের অন্তর্বর্তী সরকারের সিদ্ধান্তে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটি সতর্ক করেছে, এই সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের পরিচ্ছন্ন জ্বালানি খাতে রূপান্তরের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে বিনিয়োগকারীদের আস্থাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
আজ বুধবার (২৪ ডিসেম্বর) রাজধানীর ধানমন্ডিতে টিআইবির কার্যালয়ে আয়োজিত 'নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন: সুশাসনের চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের উপায়' শীর্ষক গবেষণা এক সংবাদ সম্মেলনে তুলে ধরা হয়। যেখানে বক্তারা বলেন, এই প্রকল্পগুলো বাতিলের মাধ্যমে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে একটি "নেতিবাচক বার্তা" গেছে। এমন এক সময়ে এই বার্তা দেওয়া হলো, যখন নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে দেশের জন্য স্থিতিশীল ও পূর্বানুমেয় বিনিয়োগ পরিবেশ অত্যন্ত জরুরি।
গবেষণা প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করেন টিআইবির এনার্জি গভর্ন্যান্স কো-অর্ডিনেটর নেওয়াজুল মওলা ও সহকারী কো-অর্ডিনেটর আশনা ইসলাম। সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান।
দুর্নীতিবিরোধী এই সংস্থার মতে, জাতীয় পরিকল্পনার কেন্দ্রবিন্দুতে এখনো নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে স্থান দিতে ব্যর্থ হওয়ায় বাংলাদেশের এ খাতের অগ্রগতি থমকে আছে। বারবার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও দেশের বিপুল নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্ভাবনার বড় অংশ এখনো অব্যবহৃত রয়ে গেছে বলে মন্তব্য করেছে টিআইবি।
ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, আধুনিক গ্রিডে সংযুক্তি ও পর্যাপ্ত কারিগরি প্রস্তুতি ছাড়া সাধারণ ভোক্তাদের কাছে নবায়নযোগ্য জ্বালানি সুবিধাজনক কিংবা আর্থিকভাবে টেকসই হয়ে ওঠে না। তিনি বিনিয়োগকারীদের জন্য স্পষ্ট ও পূর্বানুমেয় পথনির্দেশনা নিশ্চিত করতে নীতিগত স্থিতিশীলতা ও ধারাবাহিকতার ওপর গুরুত্ব দেন।
স্বতন্ত্র বা বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদকদের (আইপিপি) জন্য জমি অধিগ্রহণকে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করেছে টিআইবি। সংস্থাটির মতে, জমি নিশ্চিত করতে জটিলতা—প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘ বিলম্ব ঘটাচ্ছে, এবং ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে।
এ ছাড়া স্মার্ট গ্রিড ব্যবস্থার অভাব, পর্যাপ্ত সাবস্টেশন না থাকা এবং দুর্বল বিদ্যুৎ বিতরণ অবকাঠামোকে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ (রুফটপ সোলার) স্থাপনে আবাসিক ভোক্তাদের নিরুৎসাহিত হওয়ার প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে সংস্থাটি।
নবায়নযোগ্য প্রকল্পে প্রয়োজনীয় কারিগরি সরঞ্জাম অনুমোদনের ক্ষেত্রেও অব্যবস্থাপনার অভিযোগ করেছে টিআইবি। সংস্থাটির মতে, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও দীর্ঘসূত্রতা অগ্রগতিকে মন্থর করছে এবং বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করছে। পাশাপাশি পরিবেশগত ছাড়পত্র নিতে নথি জালিয়াতির অভিযোগের ঘটনাও তুলে ধরে টিআইবি, যেখানে অনিয়ম চিহ্নিত হলেও কর্তৃপক্ষ কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি বলে অভিযোগ করা হয়।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পের অনুমোদন ও বাস্তবায়নের পুরো প্রক্রিয়ায় শক্তিশালী তদারকি, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়েছে টিআইবি। সংস্থাটি সতর্ক করে বলেছে, বিশ্বাসযোগ্য সুশাসন সংস্কার ছাড়া বাংলাদেশ নবায়নযোগ্য জ্বালানির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে।
টিআইবি সরকারকে নীতিগত ধারাবাহিকতা বজায় রাখা, জ্বালানি অবকাঠামো আধুনিকায়ন, ন্যায্য নিয়ন্ত্রক চর্চা নিশ্চিত করা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধারে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানায়।
