জনপ্রশাসন সংস্কার থমকে, গুরুত্বপূর্ণ অনেক সুপারিশের বিপরীতে হাঁটছে সরকার
ছাত্র-জনতার আন্দোলনে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর দেশে প্রশাসনিক সংস্কারের বিষয়টি জোরালোভাবে আলোচনায় এলেও বর্তমানে তা কার্যত থমকে আছে। এমনকি জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের দেওয়া একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশের বিপরীত পদক্ষেপও নিতে দেখা গেছে অন্তর্বর্তী সরকারকে।
অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রশাসনিক সংস্কারের লক্ষ্যে ২০২৪ সালের ৩ অক্টোবর জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়। জনমুখী, জবাবদিহিমূলক, দক্ষ ও নিরপেক্ষ জনপ্রশাসন গড়ে তোলার লক্ষ্যে আবদুল মুয়ীদ চৌধুরীর নেতৃত্বে কমিশনটি গঠিত হয়।
৪৫টি বৈঠকের মাধ্যমে কমিশন অতীতের জনপ্রশাসন সংস্কার উদ্যোগ, পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর সাম্প্রতিক সংস্কার অভিজ্ঞতা, দেশের বিভিন্ন পর্যায়ের নাগরিক, রাজনৈতিক দল এবং সরকারি কর্মকর্তাদের মতামত নিয়ে একটি সুপারিশমালা প্রস্তুত করে।
গত ৫ ফেব্রুয়ারি কমিশন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার কাছে তাদের প্রতিবেদন জমা দেয়। এতে ১৪টি ভাগে ২০০টির বেশি সুপারিশ রয়েছে, যেগুলো স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদে বাস্তবায়নের প্রস্তাব দেওয়া হয়।
সুপারিশে বলা হয়, সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়া কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীকে যেন ওএসডি (অফিসার অন স্পেশাল ডিউটি) করা না হয়। একই সঙ্গে চাকরির বয়স ২৫ বছর পূর্ণ হলে সরকার যে কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠাতে পারে—পাবলিক সার্ভিস অ্যাক্ট-২০১৮–এর এই ধারাটি বাতিলেরও সুপারিশ করে কমিশন। তবে এসব সুপারিশের বিপরীতে অন্তর্বর্তী সরকারের গত ১৭ মাসে জনপ্রশাসনে রেকর্ডসংখ্যক ওএসডি ও বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর ঘটনা ঘটেছে।
বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রশাসনিক কারণে বিভিন্ন পদে প্রায় ৩০০ কর্মকর্তাকে ওএসডি করা হয়েছে, যাদের মধ্যে ১৪ জন সচিবও রয়েছেন। একই সময়ে একসঙ্গে ৯ জন সচিবসহ প্রায় ১৫০ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে। পাশাপাশি এই সময়ে সিনিয়র সচিব ও সচিব পদে রেকর্ডসংখ্যক চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিয়েছে সরকার। বর্তমানে ৭৩ জন সচিবের মধ্যে ২০ জনই চুক্তিভিত্তিক নিয়োগপ্রাপ্ত।
সংস্কারে নেই অগ্রগতি
সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন জমা দেওয়ার ১০ মাস পেরিয়ে গেলেও সুপারিশ বাস্তবায়নের অগ্রগতি খুবই সামান্য। বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে কমিশনের সুপারিশের বিপরীতমুখী পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বিশেষ করে নিয়োগ, বদলি, পদায়ন ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে বর্তমান সরকার আগের সরকারের পথই অনুসরণ করছে বলে জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞদের মত। এ কারণে জনপ্রশাসনে দীর্ঘদিনের স্থবিরতা ও অস্থিরতা কাটাতে পারেনি সরকার।
জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন মন্ত্রণালয়ের সংখ্যা কমানোর সুপারিশ করেছিল। বর্তমানে দেশে ৪৩টি মন্ত্রণালয় ও ৬১টি বিভাগ রয়েছে। কমিশন তাদের প্রতিবেদনে মন্ত্রণালয়ের সংখ্যা কমিয়ে ২৫টি এবং বিভাগের সংখ্যা ৪০টিতে নামিয়ে আনার প্রস্তাব দেয়। সরকার ইতোমধ্যে অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড একীভূত করেছে। পাশাপাশি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগ ও সুরক্ষা সেবা বিভাগ একীভূত করা হয়েছে। তবে মন্ত্রণালয়ের সংখ্যা কমানোর বিষয়ে এখনো কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। একই সঙ্গে সমপ্রকৃতির মন্ত্রণালয়গুলোকে পাঁচটি গুচ্ছে ভাগ করার কমিশনের প্রস্তাবও বাস্তবায়ন হয়নি।
এ বিষয়ে জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক অতিরিক্ত সচিব ফিরোজ মিঞা দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড–কে বলেন, "জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন দেখে মনে হয়েছে, কমিশনের সদস্যদের মধ্যে বর্তমান জনপ্রশাসন ও দেশের চাহিদা সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণার ঘাটতি রয়েছে। জনপ্রশাসন সংক্রান্ত বিধি-বিধান ও আইন সম্পর্কেও তারা যথেষ্ট অবগত নন। এ কারণে প্রতিবেদনে অনেক অসংগতি, অপ্রয়োজনীয় ও হাস্যকর সুপারিশ এসেছে।"
পাশাপাশি কমিশনের সুপারিশের ফলে আন্তঃক্যাডার দ্বন্দ্ব আরও বেড়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, জনস্বার্থভিত্তিক সুপারিশের চেয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট সুপারিশ বেশি থাকায় এগুলো বাস্তবায়নে জনপ্রশাসনের ভেতরে আগ্রহ তৈরি হবে না—এটাই স্বাভাবিক।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, "অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়ে দক্ষ ও নিরপেক্ষ ব্যক্তিদের নিয়োগ দিতে পারেনি। যাদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, তাদের মধ্যে যেমন দক্ষতার ঘাটতি রয়েছে, তেমনি অনেকেই অতীতে বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতার সঙ্গে কাজ করেছেন। এমনকি অবসরের পর এনজিওতে কাজ করেছেন—এমন ব্যক্তিরাও শীর্ষ পদে এসেছেন।"
"অনেক ক্ষেত্রেই নিয়োগ হয়েছে ব্যক্তিগত পছন্দের ভিত্তিতে। ফলে শীর্ষ নেতৃত্বের এই দুর্বলতার কারণে জনপ্রশাসনে বর্তমানে নাজুক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে," যোগ করেন তিনি।
জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের অগ্রগতি বিষয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, "সরকারের মধ্যে সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়নের আগ্রহ কম। দু-একটি বিষয়ে উপদেষ্টা পরিষদ থেকে বাস্তবায়নের নির্দেশনা এসেছে। বাকি সুপারিশগুলোর ক্ষেত্রে তেমন কোনো নির্দেশনা আসেনি।"
তিনি আরও বলেন, "মুয়ীদ চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের বেশিরভাগ সুপারিশই জনপ্রশাসনের কর্মকর্তারা যথাযথ মনে করছেন না।"
প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সেক্রেটারি বিভিন্ন সময়ে সংস্কার প্রস্তাবের বাস্তবায়ন নিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেছেন। সর্বশেষ গত ১১ সেপ্টেম্বর রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে অনুষ্ঠিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি জানান, বিভিন্ন সংস্কার কমিশনের দেওয়া সুপারিশের মধ্যে অর্ধশতাধিক প্রস্তাব বাস্তবায়ন হয়েছে। সরকার যাওয়ার আগে বেশিরভাগ সুপারিশ বাস্তবায়ন হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
তবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মন্ত্রণালয়, বিভাগ, অধিদপ্তর, পরিদপ্তর ও মাঠ পর্যায়ের দপ্তরগুলোর সাংগঠনিক কাঠামো ও জনবল কাঠামো সংস্কারের প্রস্তাব বাস্তবায়ন হয়নি। মন্ত্রণালয়গুলোর ওয়েবসাইট ডায়নামিক করার প্রস্তাবও কার্যকর হয়নি। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগকে ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয় থেকে আলাদা করে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাবও বাস্তবায়ন হয়নি।
জেলা কমিশনারকে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে সিআর প্রকৃতির মামলা নেওয়ার ক্ষমতা দেওয়ার প্রস্তাব, উপজেলা পর্যায়ে ম্যাজিস্ট্রেট কোর্ট স্থাপন, উপজেলা জননিরাপত্তা অফিসার ও পৃথক ইমিগ্রেশন অফিসার নিয়োগের প্রস্তাবও বাস্তবায়িত হয়নি।
বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (বিসিএস) পুনর্গঠন ও ক্যাডার সংখ্যা কমানো, বিসিএস হিসাব ও বিসিএস নিরীক্ষা ক্যাডার একীভূতকরণ, এলজিইডি ও জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর পুনর্গঠন, বিসিএস সাধারণ তথ্যের সাব-ক্যাডার একীভূতকরণ, বিসিএস ট্রেড ক্যাডার কাস্টমস ও শুল্ক ক্যাডারের সঙ্গে একীভূতকরণ—এসব প্রস্তাবও বাস্তবায়িত হয়নি।
আইসিটি কর্মকর্তাদের তথ্য সার্ভিসে অন্তর্ভুক্তকরণ, বাংলাদেশ বন ও পরিবেশ সার্ভিস গঠন, বিসিএস খাদ্য ও সমবায় ক্যাডার প্রশাসনিক সার্ভিসের সঙ্গে একীভূতকরণ, বিসিএস ডাক সার্ভিস বিলুপ্তকরণের প্রস্তাবও কার্যকর হয়নি।
পাবলিক সার্ভিস কমিশন পুনর্গঠন করে তিনটি কমিশন গঠনের প্রস্তাব এবং উপসচিব থেকে অতিরিক্ত সচিব পর্যন্ত পদে মেধাবী ও দক্ষ কর্মকর্তাদের নিয়ে সুপিরিয়র এক্সিকিউটিভ সার্ভিস গঠনের সুপারিশও বাস্তবায়িত হয়নি।
তবে নাগরিক পরিষেবার ডিজিটাল রূপান্তর বিষয়ে কিছু অগ্রগতি হয়েছে। আগের সরকারের সময় থেকেই 'ডিজিটাল বাংলাদেশ' কার্যক্রম চলছিল। বর্তমান সরকারও অনলাইনে আয়কর রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক করেছে, ভূমি খাতের অনেক সেবা অনলাইনে সরবরাহ করছে, জন্মনিবন্ধন, এনআইডি ও পাসপোর্টের আবেদন অনলাইনে নেওয়া হচ্ছে।
কমিশন পাসপোর্ট প্রদানের জন্য পুলিশ ভেরিফিকেশন বাতিলের সুপারিশ করেছিল। সরকার এটি বাস্তবায়ন করেছে, ফলে এখন পাসপোর্টের জন্য পুলিশ ভেরিফিকেশন প্রয়োজন হচ্ছে না।
