শিক্ষার্থীর মুখ চেপে ধরার ছবি ‘এআইয়ে তৈরি’: ডিএমপির দাবি নাকচ ফটোগ্রাফারদের, মেটাডেটাও বলছে আসল

রমনা বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মাসুদ আলমের ডান হাত দিয়ে আন্দোলনরত একজন বুয়েট শিক্ষার্থীর মুখ চেপে ধরার আলোচিত ছবিটি 'এআই দিয়ে তৈরি' বলে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) দাবিকে নাকচ করে দিয়েছেন ফটোগ্রাফার ও মেটাডেটা বিশ্লেষকরা। তারা নিশ্চিত করেছেন, ছবিটি গত বুধবার ঢাকায় বিক্ষোভের সময়ই তোলা হয়েছে।
ডিএমপি বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় তাদের অনলাইন নিউজ পোর্টাল 'ডিএমপি নিউজ'-এ পোস্ট করা এক বিবৃতিতে বলে, ছবিটি বিভ্রান্তিকর এবং এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি করা হয়েছে। একই সময়ে ডিএমপি তাদের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজেও এ সংক্রান্ত একটি পোস্ট শেয়ার করে, যা বিভিন্ন মহলে সমালোচনার জন্ম দেয়।
যোগাযোগ করা হলে ডিএমপির মিডিয়া বিভাগের ডিসি তালেবুর রহমান দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, 'ছবিতে যেভাবে একজন পুলিশ কর্মকর্তাকে একজন ছাত্রের মুখ চেপে ধরতে দেখা গেছে, তেমন কোনো ঘটনা ঘটেনি।'

বিবৃতিতে ডিএমপি বলেছে, 'সম্প্রতি ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের রমনা বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার মোঃ মাসুদ আলমকে নিয়ে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি এক ছাত্রের মুখ চেপে ধরার একটি ছবি বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে যা ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের দৃষ্টিগোচর হয়েছে।
'কে বা কারা সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যমূলকভাবে উক্ত ছবিটি তৈরি করে জনমনে অহেতুক বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করেছে।'
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, 'ছবিটি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে বুঝা যায় তা সম্পূর্ণ এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি এবং বাস্তবতা বিবর্জিত। একজন দায়িত্বশীল পুলিশ কর্মকর্তাকে নিয়ে জনমনে বিভ্রান্তি তৈরির উদ্দেশ্যে তৈরি ছবি ও তা প্রচারের সাথে জড়িতদের এহেন কর্মকাণ্ডের তীব্র প্রতিবাদ ও নিন্দা জানায় ডিএমপি। একইসাথে এ ধরনের মিথ্যা প্রচারনায় বিভ্রান্ত না হওয়ার জন্য ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের পক্ষ থেকে সর্বসাধারণকে অনুরোধ করা হলো।'
বুধবারের বিক্ষোভের প্রেক্ষাপটে এই বিবৃতিটি দেওয়া হয়। সেদিন তিন দফা দাবি আদায়ের জন্য প্রধান উপদেষ্টার সরকারি বাসভবন যমুনার দিকে মিছিল নিয়ে যাওয়ার সময় প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মিন্টো রোডে ইন্টারকন্টিনেন্টাল ঢাকার সামনে থেকে ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ লাঠিচার্জ, টিয়ারস গ্যাস, সাউন্ড গ্রেনেড ও জলকামান ব্যবহার করে।

ঘটনাটি দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের ফটোসাংবাদিক রাজিব ধরও ক্যামেরাবন্দী করেছেন। তার ছবিতে দেখা যায়, যমুনার দিকে মিছিলরত প্রকৌশল শিক্ষার্থীদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ জলকামান ব্যবহার করার সময় হাতাহাতির এক পর্যায়ে একজন পুলিশ কর্মকর্তা এক বিক্ষোভকারীর মুখ চেপে ধরছেন।
ডিএমপির বিবৃতিটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দিলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সাইফুল আলম চৌধুরী তার ফেসবুক হ্যান্ডেলে ছবিটি যাচাই করার জন্য ব্যবহৃত টুলগুলোর ছবি শেয়ার করেন।
ওই পোস্টে তিনি লিখেছেন, 'পুলিশ কোন সফটওয়্যার দিয়ে, মেটাডেটা এনালাইসিস করেছে, কি দেখে মনে হলো ছবিটা এআই জেনারেটরেড - তার কোনো ব্যাখ্যা নাই। এআই জেনারেটেড ছবি কী না তার সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ হলো মেটাডেটা এনালাইসিস করা। আমার জানা মতে, পুলিশের মধ্যে এ ধরনের এনালিস্ট নেই।'

সাইফুল আরও লিখেছেন, 'পুলিশের দাবির পর ছবিটার একটা গ্রামার দেখেই মনে হয়েছে এই ছবি এআই জেনারেটেড নয়। এআই ছবিতে যদি একাধিক হাত থাকে তাহলে হাতগুলো একসাথে ৯০ এবং ১২০ ডিগ্রি এঙ্গেলে থাকতে পারে না। সেজন্য ছয়টা টুলস দিয়ে পরীক্ষা করলাম। ফলাফল ছবিটা রিয়েল।'
টিবিএসও তাদের নিজেদের তোলা ছবির মেটাডেটা পরীক্ষা করে দেখেছে। তাতে দেখা যায়, ছবিটি ক্রিয়েটর রাজিব ধর এবং এটি তোলা হয়েছে ২০২৫ সালের ২৭ আগস্ট দুপুর ২টা ৫০ মিনিটে। ফ্যাক্ট-চেকিং ও তথ্য যাচাইকারী প্রতিষ্ঠান রিউমর স্ক্যানারও ছবিটি যাচাই করে গত রাতে জানিয়েছে, এটি এআই ব্যবহার করে তৈরি করা হয়নি।
টিবিএস-এর সাথে আলাপকালে রাজিব ছবিটি তোলার মুহূর্তের ঘটনা বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, 'ঘটনাটি মুহূর্তের মধ্যে ঘটে যায়।'

রাজিব বলেন, তিনি ইন্টারকন্টিনেন্টালের পাশে অবস্থান করছিলেন। পুলিশ ও শিক্ষার্থীরা ছিলেন হোটেলের উল্টো দিকে মিন্টো রোডের শহীদ আবু সায়েদ ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন সেন্টারের পার্কিংয়ের বাইরে।
'পুলিশ তখন সবে একটা জলকামান ছুড়েছে। অন্য বিক্ষোভকারীদের মতো ওই যুবকও দৌড়ে সরে যাচ্ছিলেন। মনে হলো একজন পুলিশ তাকে থামানোর চেষ্টা করেন। তখনই ওই পুলিশ তার মুখে চেপে ধরে তাকে মাটিতে ফেলে দেন।'
রাজিবের পাশাপাশি আরও বেশ কয়েকজন ফটোসাংবাদিক ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন—মানবজমিন ও নিউ এজ থেকে একজন করে, বাংলাদেশ প্রতিদিনের জয়িতা ও এবং দ্য ডেইলি স্টারের অর্কিড চাকমা।
জয়িতা টিবিএসকে বলেন, তিনিও একই মুহূর্তের ছবি তুলেছেন।
তিনি বলেন, 'পুলিশ জলকামান ব্যবহার শুরু করার পর আমি একটা ধস্তাধস্তি দেখতে পাই। কয়েকজন পুলিশ লাঠি নিয়ে এগিয়ে আসছিলেন। একজন পুলিশ কর্মকর্তা এক যুবককে জাপটে ধরেন। আমি দ্রুত একটা ছবি তুলি। এরপর দেখি, এ ঘটনা ঘটার সময় তার বন্ধুরা এগিয়ে আসছেন।'

দ্য ডেইলি স্টারের ফটোসাংবাদিক অর্কিড চাকমাও বলেন, 'চোখের পলকে' ঘটনাটি ঘটার সময় তিনি একটি ছবি তুলেছিলেন। তবে ঠিক কী কারণে পরিস্থিতি ওই পর্যায়ে গিয়েছিল, তা তিনি দেখেননি।
যার ছবি তোলা হয়েছে, সেই বুয়েট শিক্ষার্থী রাফিদ খানের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি টিবিএস বলেন, 'আলোচিত ছবিটি কোনভাবেই আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স দিয়ে তৈরি করা নয়। ঘটনাটি আমার সাথে ঘটেছে।'
তার মুখ চেপে ধরা পুলিশ কর্মকর্তার বিষয়ে রাফিদ বলেন, 'পুলিশ পেছন থেকে' তাকে 'ধাক্কা দিয়ে আমাকে মাটিতে ফেলে দেওয়ার মুহূর্তেই' ঘটনাটি ঘটে।
রাফিদ আরও বলেন, 'মাটিতে ফেলার পরে আমার সাথে আসলে খুবই অপেশাদার আচরণ করা হয়েছে। আমাকে তারা বুট দিয়ে লাথি মেরেছে। পিটাইছে। এমনকি একজন সদস্য হেলমেট দিয়ে আমার মাথায় আঘাত করছেন।'
ঘটনাটি ক্যামেরাবন্দী করে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত ছবিগুলোর বিষয়ে টিবিএস ডিসি তালেবুরকে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন, 'এ বিষয়টি আমার জানা নেই।'